তীর্থকেন্দ্র পর্যটনকে তুলে ধরছে ভারত ও নেপাল

ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী এই বছরে যখন নেপাল সফরে গিয়েছিলেন, দুই দেশের মধ্যে যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতি ছাড়াও দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য ও আর্থিক সহযোগিতা বাড়ানোর পন্থা পদ্ধতি নিয়েও আলোচনা হয়েছিল এবং একই সঙ্গে নতুন দিল্লী ও কাটমান্ডু, ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক সম্পর্ক আরও মজবুত করার প্রয়োজনের ওপরেও জোর দিয়েছিল। এই মাসের প্রথম দিকে, উত্তর প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্য নাথ নেপালের জনকপুরে এক উৎসবে যোগ দিয়েছিলেন। পুরাণ মতে এখানেই ভগবান রামের পত্নী সীতার জন্ম হয়েছিল বলে উল্লেখ রয়েছে। উৎসবটি ছিল ‘বিবাহ পঞ্চমী’ উৎসব। ভারত ও নেপাল থেকে হাজার হাজার ভক্ত এই উৎসবে যোগ দেন। এই বছরের মে মাসে শ্রী মোদী জনকপুরের ঐতিহাসিক মন্দিরে যান। উল্লেখ্য, এটিই ছিল কোনো ভারতীয় প্রধানমন্ত্রীর প্রথম ঐ মন্দির সফর। সফরের পরে দর্শনার্থীদের জন্য লেখার খাতায় তিনি লেখেন যে, তাঁর কাছে এটি একটি স্মরণীয় অভিজ্ঞতা। এই তীর্থস্থলটি ভারত ও নেপালের  জনগণের হৃদয়ে এক বিশেষ স্থান দখল করে আছে।

ভারত ও নেপালের মধ্যে বহুবিধ সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সম্পর্ক রয়েছে। দুই দেশের জনগণের মধ্যে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হওয়া ছাড়াও, দুই দেশের মানুষজনের রয়েছে একই ভাষা যেমন নেপালী, হিন্দি, মৈথিলী, ভোজপুরি, অওধি এবং বহু স্থানীয় কথ্য ভাষা, পরম্পরা, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক আচার। ভৌগলিক ও সাংস্কৃতিক ঘনিষ্ঠতা দুই দেশের মধ্যে দ্বিপক্ষিক সম্পর্ককে দিয়েছে এক অনন্য বৈশিষ্ট্য যার শিকড় বহু গভীর পর্যন্ত বিস্তৃত।

প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী তাঁর সফরে নেপালের পার্বত্য মুস্তং জেলার ঐতিহাসিক মুক্তিনাথ মন্দিরেও যান এবং কাটমান্ডুর বিশ্ব প্রসিদ্ধ পশুপতি নাথ মন্দিরেও তাঁর শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। ভারত থেকে হাজার হাজার  পর্যটক নেপালে প্রতিবছরই গিয়ে থাকেন এবং পশুপতি নাথ মন্দির তাদের পর্যটনের এক আবশ্যিক গন্তব্য। আবার অন্যদিকে, নেপাল থেকেও বহু সংখ্যক পর্যটক উত্তরাখন্ডের বদ্রীনাথ ও কেদারনাথ মন্দির ও ভারতের অন্য ধর্মীয় স্থল যেমন বারাণসী, হরিদ্বার, বোধগয়া ও ঋষিকেশ ভ্রমনে আসেন। অনেকে তো আবার দূর প্রান্তে গুজরাটের দ্বারকা বা  ওড়িশাতে পুরীর ভগবান জগন্নাথ দেবের মন্দির দেখতেও চলে আসেন। এছাড়াও দুই দেশেই রয়েছে হিন্দু ধর্মের সঙ্গে সম্পর্কিত বহু তীর্থস্থল। ভগবান বুদ্ধের জন্ম ও তাঁর জীবন তথা বোধিলাভের সঙ্গে যুক্ত দুই দেশের মধ্যে রয়েছে বৌদ্ধ পর্যটন সার্কিট যা অবশ্যই এক গুরুত্বপূর্ণ স্থান করে নিয়েছে। ফল স্বরূপ দুই দেশই তীর্থ সম্পর্কিত পর্যটনকে ব্যাপকভাবে তুলে ধরতে চাইছে।

ভগবান বুদ্ধের জন্ম হয়েছিল নেপালের লুম্বিনিতে এবং তিনি  ভারতে বোধি লাভ করেন ও তাঁর বাণী ও বার্তা শুধু ভারত ও নেপালেই নয়, ছড়িয়ে দিয়েছিলেন দক্ষিণ এশিয়া ও তারও বাইরে। বৌদ্ধ সার্কিট একবার রূপায়িত হয়ে গেলে তা  ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক পর্যটনকে সমগ্র দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলে ছড়িয়ে দিতে পারবে। ফলে, থাইল্যান্ড, জাপান, কোরিয়া ও অন্য দেশ থেকে ভারত ও নেপালে পর্যটকদের আগমন বাড়বে।

এই সময়ে দুই দেশের জনগণের মধ্যে সাংস্কৃতিক সৌসাদৃশ্যই পেয়েছে গতি। এই বিষয়ে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর নেপাল সফরকালে নেপালের প্রধানমন্ত্রী কে পি শর্মা ওলির সঙ্গে জনকপুর–অযোধ্যা বাস পরিষেবার উদ্বোধনের মাধ্যমে যৌথভাবে সূচনা করেছেন রামায়ন সার্কিট। রামায়ন সার্কিটে নেপালের জনকপুর থেকে উত্তর প্রদেশের অযোধ্যার মধ্যে যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়েছে। এছাড়াও বিহার, পশ্চিমবঙ্গ, ছত্তিশগড়,তেলেঙ্গানা, কর্নাটক, মহারাষ্ট্র ও তামিলনাড়ু সহ ভারতের ১৫টিরও বেশি রাজ্যের সঙ্গেও যোগাযোগ পরিষেবা গড়ে তোলা হবে। এই সব জায়গাগুলির কোনো না কোনোভাবে রামায়নের বিভিন্ন পর্বের সঙ্গে সম্পর্ক রয়েছে।

জনকপুর-অযোধ্যা বাস পরিষেবা উদ্বোধন করে, ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী আরও দুটি সার্কিট, ভারত ও নেপালে বৌদ্ধ ও জৈন পর্যটনকে তুলে ধরারও কথাও ঘোষণা করেছেন। এর ফলে তীর্থযাত্রা কেন্দ্রিক সুবিধার চাহিদা বাড়বে যা  আদতে দুই দেশের জনগণের জন্য বাড়াবে কর্মসংস্থান তৈরির সুযোগ ও ব্যবসা। হিসাব বলছে যে দুই দেশের, এর মাধ্যমে পর্যটন ক্ষেত্রেই আয় বাড়াবে প্রায় ১০০ কোটি ডলার। ভারত ইতিমধ্যেই এক জোরালো পর্যটন নীতি গ্রহণ করেছে। নেপালও যদি এই নীতি গ্রহণ করে তবে ধর্মীয় পর্যটনে আসা পর্যটকরা ব্যাপকভাবে উপকৃত হবেন।

ভারত ধর্মীয় পর্যটনের প্রয়োজনীয় পরিকাঠমো গড়ে তোলার পথে। আকাশ, রেল ও সড়ক পথে ভারতের প্রধান প্রধান তীর্থস্থানগুলিকে নেপালের তীর্থস্থানগুলির যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে তোলা গেম চেঞ্জার হয়ে উঠতে পারে। ভারত এই কারণে নেপালে  সড়ক ও রেল নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার দিশায় কাজ করছে আর ভারতের প্রধান প্রধান শহরগুলির সঙ্গে নেপালের যোগাযোগ তো ইতিমধ্যেই রয়েছে।

[মূল রচনা- রত্তন সালদি]