GSAT-7A: বাহিনীর শক্তি বাড়াবে

 

অন্ধ্রপ্রদেশের শ্রী হরিকোটা থেকে সামরিক যোগাযোগ কৃত্রিম উপগ্রহ GSAT-7Aর সফল উৎক্ষেপনের ফলে ভারতীয় বিমান বাহিনীতে যুক্ত হয়ে গেল নতুন মহাকাশ ভিত্তিক মাত্রা। এই কৃত্রিম উপগ্রহ ভারতীয় বিমান বাহিনীর  হাতে থাকা অত্যাধুনিক ক্ষেপনাস্ত্র, বিমান, ড্রোন এবং স্থলভাগে উপস্থিত বিভিন্ন কেন্দ্রের সঙ্গে একটি কেন্দ্রীয় নেটওয়ার্ক নির্মাণ করবে। এই কৃত্রিম উপগ্রহ ভারতীয় বিমান বাহিনীর বর্তমান র‍্যাডার বা সেনাবাহিনীর বিভিন্ন কেন্দ্রের যোগাযোগ ব্যবস্থাপনার  অন্তর্ভুক্ত এলাকার পরিধি অনেকগুণ বৃদ্ধি করবে। দৃশ্যমান নয় এবং প্রত্যন্ত প্রান্তে যেখানে ভূমি পরিকাঠামো ও সংকেত বা সিগনাল পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে সেখানেও এই কৃত্রিম উপগ্রহ কাজ করবে ফলে সেই সব কেন্দ্রগুলিও উল্লেখযোগ্য তথ্য প্রাপ্তির তালিকায় ঢুকে পড়বে। প্রতিরক্ষা বিষয়ক বিশ্লেষকগণ মনে করছেন যে  GSAT-7A ভারতীয় বিমান বাহিনীর শক্তি অনেক গুণ বাড়িয়ে দেবে। তারা মনে করছেন যে নেটওয়ার্ক কেন্দ্রিক যুদ্ধে এই ধরণের ব্যবস্থাপনাগুলি সম্পূর্ণ নেটওয়ার্ক কেন্দ্রীভূত ব্যবস্থাপনা গড়ে তুলতে সক্ষম হয়ে উঠবে। এই প্রেক্ষিতে এই প্রয়াস নিঃসন্দেহে ভারতীয় বিমান বাহিনীতে এক বিশেষ মূল্য সংযোজন বলা যেতেই পারে।

একথাটি অবশ্যই অনস্বীকার্য যে,বর্তমান আন্তর্জাতিক পরিস্থিতিতে, ভবিষ্যত সামরিক অভিযানগুলিতে মহাকাশ একটি গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ হয়ে উঠছে। মহাকাশ ব্যবস্থাপনা ভিত্তিক তথ্য আধিপত্য এই প্রজন্মের অন্যতম চাবিকাঠি হয়ে উঠবে এবং একই সঙ্গে এটি ভবিষত যুদ্ধের পরিণাম স্থির করবে। মহাকাশ-ভিত্তিক ব্যবস্থাপনার সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হল এটি তার পরিধিকে বিশ্বব্যাপী করে তোলে ও যোগাযোগ স্থাপন করে এবং ফলস্বরূপ  প্রতিরক্ষা বাহিনীকে তাদের বিভিন্ন মিশন সফল করে তোলার ক্ষেত্রে তা কার্যকরী ভূমিকা গ্রহণ করতে সহায়তা করে। আদতে, কৃত্রিম উপগ্রহ ব্যবস্থাপনা ভৌগলিক ভাবে ভিন্ন স্থানে থাকা লক্ষ্যবস্তু, সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী ও কার্যনির্বাহীর মধ্যে সেই নির্দিষ্ট সময়েই বা রিয়েল টাইমে যোগাযোগ গড়ে তুলতে সক্ষম করে। উল্লেখ্য,আন্তর্জাতিক আইনি কাঠামো মহাকাশকে শান্তিপূর্ণ উদ্দেশ্যে ব্যবহার করার কথাই বলে। এই আইনের সঙ্গে সঙ্গতি রেখেই সমস্ত মহাকাশ ব্যবহারকারী রাষ্ট্র এই বিষয়ে তাদের জাতীয় নিরাপত্তার উদ্বেগগুলির উপর ভিত্তি করে সতর্কতার সঙ্গে সহযোগিতা ও মহাকাশের শান্তিপূর্ণ ব্যবহারের ওপরেই গুরুত্ব আরোপ করে থাকে।

জাতীয় নীতি অনুযায়ী অন্য কোনো দেশের ভূখন্ডের বিষয়ে ভারতের কোনো স্বার্থ নেই এবং তারা শুধু নিজের দেশের সীমানা ও সীমান্তকে সুরক্ষিত রাখতেই সচেষ্ট। তবে ভারত তার সীমান্ত বরাবর অঞ্চলের পরিস্থিতি এবং ভারত মহাসাগর অঞ্চল সহ সমীপবর্তী দেশগুলির পরিস্থিতির বিষয়ে উদাসীন থাকতে পারে না। একারণেই ভারতীয় বিমান বাহিনীর জন্য একটি নির্দিষ্ট ও বিশেষ কৃত্রিম উপগ্রহের খুবই প্রয়োজন ছিল।  GSAT-7A শুধুমাত্র সমস্ত বিমানের সঙ্গেই সংযুক্ত হবে তা নয়, এটি ভারতীয় বিমান বাহিনীর নেটওয়ার্ক-কেন্দ্রিক যুদ্ধক্ষেত্রের সক্ষম তা আরও বাড়াবে এবং বিশ্বব্যাপী ভারতীয় বিমান বাহিনীর কাজকর্মকে আরও উন্নত করে তুলবে। শুধু তাই নয়, এটি বিমান বাহিনীর বর্তমান স্থলভাগে অবস্থিত নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্রগুলিকে মহাকাশ-নিয়ন্ত্রিত সামরিক মানববিহীন বিমান ব্যবস্থায় উন্নীত করবে ও এই ক্ষেত্রকে আরও মজবুত করবে।

GSAT-7A সদর্থেই ভারতীয় বিমান বাহিনীর আয়ুধশালায় বহু প্রতীক্ষিত শক্তি জুগিয়েছে। এক সুসংহত পদক্ষেপের ফলে এটি সেনাবাহিনী ও নৌ-বাহিনীর প্রয়োজন মাফিক বিমান ব্যবহারকেও সাহায্য করবে। GSAT-7Aর সফল উৎক্ষেপন, ভারতের মহাকাশ কর্মসূচীতে কৃত্রিম উপগ্রহ স্থাপনে দেশের আত্মনির্ভরতা অর্জনের ক্ষেত্রে এক মাইল ফলক হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। GSAT-7Aর উৎক্ষেপনের আগে ভারতীয় মহাকাশ গবেষণা সংস্থা ২০১৩র ২৯শে সেপ্টেম্বর মাসে ‘রুক্মিনী’ নামের একটি GSAT-7 কৃত্রিম উপগ্রহ উৎক্ষেপন করেছিল। এটি ছিল ভারতীয় নৌ-বাহিনীর জন্য। এই কৃত্রিম উপগ্রহ  ভারতীয় নৌ-বাহিনীকে ভারত মহাসাগর অঞ্চলের নিরীক্ষণে সহায়তা করছে কেননা এই কৃত্রিম উপগ্রহের ২০০০ নটিক্যাল মাইল অঞ্চল জুড়ে পাঠানো চিত্র ভারতীয় যুদ্ধ জাহাজ, সাবমেরিন বা ডুবো জাহাজ এবং সামুদ্রিক বিমানের বাস্তব সময়ের তথ্য প্রদান করে। ভারতীয় বিমান বাহিনী আগামী কয়েক বছরের মধ্যেই আরও একটি কৃত্রিম উপগ্রহ GSAT-7C পেতে পারে যা তাদের নেটওয়ার্ক–কেন্দ্রিক কাজকর্মকে আরও মজবুত করবে। এছাড়াও ভারতের রয়েছে পৃথিবীর ছবি পাঠানোর জন্য CartoSAT সিরিজের বেশ কয়েকটি উপগ্রহ, একটি RadarSAT ও একটি হাইপারস্পেকট্রাল উপগ্রহ যা দেশের সীমানা সুরক্ষিত রাখার তথ্য প্রদান করে আসছে। এছাড়াও দেশের আঞ্চলিক নেভিগেশন ব্যবস্থাপনা বা NAVIC কৃত্রিম উপগ্রহ যা ক্ষেপনাস্ত্রগুলির সুনির্দিষ্ট গতিপথ অর্জনে সহায়তা করে।

GSAT-7Aর সফল উৎক্ষেপনের মাধ্যমে ভারতীয় মহাকাশ গবেষণা সংস্থা এ সংক্রান্ত মিশন সম্পাদনে তাদের পেশাদারিত্ব প্রদর্শন করেছে। কোনো দেশের মহাকাশ মিশনের সঙ্গে সেই দেশের জাতীয়তাবাদের সংমিশ্রণ থাকেই এবং ভারতের জনগণের ভারতীয় মহাকাশ গবেষণা সংস্থার এই সাফল্যে গর্ব  অনুভব করা স্বাভাবিক। ভারতীয় মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নিরবচ্ছিন্নভাবে দেশের মহাকাশ গবেষণায় কাজ করে চলেছে এবং এর জন্য তাদের সাধুবাদ অবশ্যই প্রাপ্য। ভারতীয় মহাকাশ গবেষণা সংস্থা তাদের পেশাদারিত্বের জন্যই বিশ্বের প্রথম সারির মহাকাশ সংস্থাগুলির অন্যতম হয়ে উঠেছে ।

[মূল রচনাঃ উত্তম কুমার বিশ্বাস]