দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের জন্য ভারত-চীন সামাজিক ভিত্তি গড়ে তুলছে

প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এবং চীনের রাষ্ট্রপতি শি জিনপিং এপ্রিলে উহানে তাদের ঘরোয়া বৈঠকের সময় “উহান আদর্শ” সংক্রান্ত যে ঐকমত্যে পৌঁছোয় তাকে শক্তিশালী করে তুলতে চীনের বিদেশ মন্ত্রী ওয়াং ই ভারত সফর করে গেলেন। দুটি দেশের মধ্যে কৌশলগত যোগাযোগ বৃদ্ধির অংগ হিসেবে ওয়াং দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে জনগণের মধ্যে উচ্চ পর্যায়ে  এবং সাংস্কৃতিক বিনিময়ের নরম দিকটির প্রতি গুরুত্ব দিয়ে এক নতুন অধ্যায়ের সুত্রপাত করেন।

রাষ্ট্রের সভ্যতার নিরিখে ভারত এবং চীনের কাছে  নরম শক্তি অপরিচিত নয়। তবে পররাষ্ট্র মন্ত্রী সুষমা স্বরাজ যে দশটি স্তম্ভের কথা উল্লেখ করেন সেগুলি এগিয়ে নিতে এই সফর এক নতুন মোড় এনে দিয়েছে। এই স্তম্ভগুলি হল সাংস্কৃতিক সম্পর্ক বিনিময়, চলচিত্র এবং টি ভি অনুষ্ঠান, ক্রীড়া, পর্যটন, সংগ্রহালয় প্রশাসন, যুবাদের মধ্যে বিনিময়, সহযোগী শহরের মধ্যে যোগাযোগ, চিরাচরিত ওষুধপত্র, যোগ, এবং ভাষা শিক্ষার প্রসার। ভারত এই সব ব্যবস্থাকে ইতিবাচক এবং ফলপ্রসু বলে অভিহিত করেছে, যদিও সীমান্তে স্থিতিশীলতা এবং ক্রমবর্ধমান বাণিজ্য ঘাটতির মত কঠিন বিষয়গুলি উত্থাপিত হয় এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলি পরে তা নিয়ে আলোচনা করতে একমত হয়।

দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে এই সব বিষয়ের অধিকাংশই নতুন নয়। গত তিন দশকে ভারত এবং চীনের মধ্যে একাধিক সমঝোতা স্মারক পত্র স্বাক্ষরিত হয়েছে। এসবের মধ্যে রয়েছে ১০০০এর বেশি যুবা বিনিময়, বছরে ৩২টি শিক্ষা বৃত্তি, বন্ধুত্ব বর্ষ, বই মেলা, চলছিত্র বিতরণ, যোগ, গান্ধী কেন্দ্র, নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়, ক্রীড়া ইত্যাদি। ই-ভিসা সুবিধা চালু করা সত্বেও পর্যটন খুব বেশি বাড়ে নি, বছরে মাত্র ২,৪০,০০ চীনা পর্যটক ভারতে আসেন (মূলত বৌদ্ধ স্থলগুলিতে)। তুলনায় চীনে ভারতীয় পর্যটনের সংখ্যা বছরে ১.৪ মিলিয়ন।

তবে বর্তমান দফার আলোচনায়, যে ৪০টি ক্ষেত্রে আলোচনায় অগ্রগতি হয়েছে সেগুলিকে একটি নতুন আকার দেওয়া হয়েছে যাতে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে নতুন করে গুরুত্ব দেওয়া যায়।

সীমান্তে সাম্প্রতিক বিভ্রান্তি বিশেষ করে ২০১৭য় ডোকলাম অচলাবস্থা দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে লোকসান করেছে। চীনের তিনটি দ্বন্দ্ব যেমন প্রচার মাধ্যম, আইন এবং মনোবৈজ্ঞানিক দ্বন্দ্ব ভারতীয় পক্ষের অঙ্গীকারের ফাঁটল ধরাতে পারে নি। অন্যদিকে, চীনের অতিরিক্ত এবং নেতীবাচক প্রচার ভারতে কেবল নেতীবাচক দৃষ্টিভঙ্গী বৃদ্ধি করেছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে শুল্ক যুদ্ধে লিপ্ত কোনো দেশের পক্ষে ভারতের মতামত অবজ্ঞা করার কুফল হওয়াটাই স্বাভাবিক।

এই সময়কে অনুকূল বলে অভিহিত করে ভারতে ওয়াং এর মিশনকে তাঁরই ভাষায় উন্নততর সামঞ্জস্য বিধান বলে গণ্য করা যেতে পারে। অন্য সব কিছুর সাথে সাথে ব্রিক্স, শাংহাই সহযোগিতা সংগঠন, পূর্ব এশিয় শিখর সম্মেলন এবং প্রাচীন সভ্যতা মঞ্চের মত মঞ্চগুলিকে কাজে লাগাতে হবে।

এই সব প্রয়াস রুপায়িত হলে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের সামাজিক ভিত্তি তৈরি হবে। বর্তমানে চীনের জাতীয়তাবাদ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং জাপানের বিরুদ্ধে নির্দেশিত। ভারত এখনও র‍্যাডার স্ক্রীনে নেই এবং চীনের নেতৃত্বের ভারতকে বিচ্ছিন্ন না করার রাজনৈতিক কারণ আছে।

অনেক জটিল প্রশ্নের দ্রুত মিমাংসা সম্ভব নয় যেমন  অমিমাংসিত ভূখন্ডগত বিবাদ, সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধি, চীনের বেল্ট এবং রোড প্রয়াসে ভারতের যোগদান না করা ইত্যাদি। এসবের প্রেক্ষিতে মনে হয় নতুন দিল্লীর সঙ্গে পেইচিং এখন নরম শক্তির সম্প্রসারণে আগ্রহী। এবং এটাই এই দ্বন্দ্বের অবসানের একমাত্র পথ।

১৯৮৮ সালে রাজীব গান্ধীর পেইচিং সফরের পর দুটি দেশের মধ্যে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে এমনই এক সময় এসেছিল। চীন জোর দেয় যে বকেয়া ভূখন্ডগত বিবাদের মিমাংসা পরবর্তি প্রজন্ম করবে, দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের অন্য ক্ষেত্রগুলির অনুসন্ধান করা যেতেই পারে। তবে তিন দশকের বাণিজ্য সম্পর্কে ভারতের জন্য বাণিজ্য ঘাটতি বেড়েছে-গত দশকেই হয়েছে প্রায় ৬২৬ বিলিয়ন। নরম বিষয়গুলির ক্ষেত্রে সহযোগিতার বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে আগামী দিনগুলিতে কঠিন প্রশ্নগুলি সমাধানের প্রতিও পরিকাঠামোগত  দৃষ্টিভঙ্গী গ্রহণ করতে হবে।  ( মূল রচনাঃ অধ্যাপক শ্রীকান্ত কোন্ডাপল্লী)