আফগানিস্তান থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহার এবং দক্ষিণ এশিয়ায় এর প্রভাব

মার্কিন রাষ্ট্রপতি ডোনাল্ড ট্রাম্পের আফগানিস্তান থেকে অর্ধেকেরও বেশী মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের সাম্প্রতিক সিদ্ধান্ত কাবুল সরকারের কাছে এক বড় ধাক্কা। ডোনাল্ড ট্রাম্প নির্বাচনী প্রচারের সময় আফগানিস্তান থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের সপক্ষে জোর সওয়াল করেছিলেন। তবে ২০১৭’র আগস্টে  দক্ষিণ এশিয় নীতির ঘোষণায় ট্রাম্প তাঁর অবস্থান পরিবর্তন করে জানান, আফগানিস্তানে শান্তি প্রতিষ্ঠিত না হওয়া পর্যন্ত সেখানে মার্কিন সেনা থাকবে; মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সেনা প্রত্যাহারের কোনো পূর্ব নির্ধারিত সময়সীমা নির্দিষ্ট করবে না।

তিনি ভারতকেও আফগানিস্তানের বিষয়ে সক্রিয় অংশগ্রহণের আহ্বান জানান এবং পাকিস্তানকে সন্ত্রাসবাদে মদতদান এবং সন্ত্রাসবাদীদের নিরাপদ আশ্রয়স্থল প্রদান বন্ধ করতে বলেন এবং মদতদান বন্ধ না করলে পাকিস্তানকে কড়া মূল্য দিতে হবে বলেও সতর্ক করে দেন। এই ঘোষণার পর আফগানিস্তানে অতিরিক্ত চার হাজার মার্কিন সেনা মোতায়েন করা হয় এবং পাকিস্তানকে আর্থিক সহায়তা প্রদান বন্ধ করে সেদেশের ওপর চাপ সৃষ্টি করা হয়।

মার্কিন রাষ্ট্রপতির সাম্প্রতিক ঘোষণা থেকে স্পষ্ট যে তাঁর দক্ষিণ এশিয় নীতি শোচনীয়ভাবে ব্যর্থ হয়েছে। গত কয়েক মাসে ট্রাম্প প্রশাসন  আফগানিস্তানে ‘জয়’ ঘোষণা ক’রে তড়িঘড়ি সেই দেশ থেকে সেনা প্রত্যাহার করার ওপর জোর দিয়েছে। মার্কিন রাষ্ট্রপতি গত সেপ্টেম্বরে এই কাজের ভার ইরাক ও আফগানিস্তানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রাক্তন রাষ্ট্রদূত  জালমে খালিলজাদের ওপর অর্পণ করেন এবং তালিবানদের আলোচনার টেবিলে নিয়ে আসার জন্য তাঁকে ৬ মাস সময় দেন। সাম্প্রতিক ঘোষণা থেকে স্পষ্ট যে মার্কিন রাষ্ট্রপতি এই ৬ মাস সময়ও অপেক্ষা করতে প্রস্তুত নন।

এই ঘোষণার ফলে দক্ষিণ এশিয়া বিশেষ সংকটের সম্মুখীন হবে। ভারত, তালিবানদের আলোচনা প্রক্রিয়ায় নিয়ে আসার প্রয়াস থেকে সবসময়ই দূরত্ব বজায় রেখেছে। অন্যদিকে পাকিস্তান আফগান প্রশাসনে তালিবানদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার দাবি জানিয়েছে। এর মাধ্যমে পাকিস্তান আফগানিস্তানে তাদের কর্তৃত্বপূর্ণ ভূমিকা নিশ্চিত করতে চাইছে। অন্যদিকে চীনও আফগানিস্তানে সড়ক নির্মাণ প্রকল্প আরো জোরদার করতে পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক মজবুত করতে আগ্রহী। এদিকে রাশিয়া   সংশ্লিষ্ট অঞ্চলে দায়েশ জঙ্গি গোষ্ঠীর ক্রমবর্ধমান সক্রিয়তার মোকাবিলায় পাকিস্তানের সহায়তায় তালিবানদের কাছে পৌঁছতে চাইছে।

মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের পরে আফগানিস্তানের পুনর্গঠনের কাজে  যুক্ত ভারতীয় কর্মীদের নিরাপত্তার বিষয়টি আরো অনিশ্চিত হয়ে পড়ল। এই প্রেক্ষিতে ভারতকে উত্তরাঞ্চলীয় জোট সহ অন্যান্য স্থানীয় প্রভাবশালী শক্তিগুলির সঙ্গে সম্পর্ক আরো মজবুত করার বিষয়ে নতুনভাবে চিন্তাভাবনা করতে হবে। উল্লেখ্য, তালিবানরা গত কয়েকমাসে আফগানিস্তানে তাদের ক্ষমতা প্রসারিত করেছে। এই সিদ্ধান্তের ফলে তারা কাবুল সরকারের আরো জোরদারভাবে চ্যালেঞ্জ জানাবে এবং আফগান জনগণ ও নিরাপত্তা বাহিনীর ওপরে হামলা আরো বাড়বে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত, ভবিষ্যতে তালিবানদের কাজকর্মকে সমর্থনদান এবং সন্ত্রাসবাদী গোষ্ঠীগুলিকে ভারতের বিরুদ্ধে কাজে লাগাবার বিষয়ে পাকিস্তানের অভিপ্রায়ে মদত জোগাবে। অন্যদিকে রাশিয়া, চীন এবং ইরান নিজ স্বার্থে একে সমর্থন করবে। বিশেষ করে চীন মার্কিন সেনা সরে যাওয়ার পর সেই শূণ্য স্থানে নিজেদের আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টা করবে। এদিকে আফগান রাষ্ট্রপতি আশরফ গনি বলেছেন, কয়েক হাজার বিদেশী  পরামর্শদাতা আফগানিস্তানের নিরাপত্তা বিঘ্নিত করতে পারবে না।

এদিকে আফগানিস্তানের সেনা প্রত্যাহারের পাশাপাশি মার্কিন প্রতিরক্ষা মন্ত্রী জিম ম্যাটিসের পদত্যাগে মার্কিন সহযোগীরা আশঙ্কিত। সমস্ত দিক থেকেই এই সিদ্ধান্ত মার্কিন নেতৃত্ব এবং তাদের বিশ্বাসযোগ্যতার ওপর সুদূরপ্রসারী প্রতিকূল প্রভাব ফেলবে।

(মূল রচনা – অশোক সজ্জনহার )