ভারত-ইউরোপীয় সঙ্ঘ সম্পর্ক ঊর্ধ্বাভিমুখী

ভারত-ইউরোপের সম্পর্কগুলি বহুত্ববাদী ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধে সমৃদ্ধ। উচ্চাকাঙ্ক্ষী জনসংখ্যার ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক সহযোগিতা বিশ্বের সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী অংশীদারিত্ব প্রদান করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।

২০১৮ সালের এপ্রিলে প্রথম নর্ডিক সম্মেলনে  প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর অংশগ্রহণ ছিল এর প্রমাণ। তিনি সুইডেন, ফিনল্যান্ড, ডেনমার্ক এবং আইসল্যান্ডের নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেন।  ২০১৮র মার্চ মাসে ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাকরঁ ভারত সফর করেন এবং বাণিজ্য, বিনিয়োগ, প্রতিরক্ষা, নিরাপত্তা এবং ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলের দেশগুলির মধ্যে সামরিক সহযোগিতা ও বিভিন্ন অঞ্চলের মধ্যে সম্পর্কগুলি উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানো সম্পর্কিত ইউরোপীয় সঙ্ঘ প্রকাশিত একটি নীতিমালা নির্ধারিত করেন।  এই গুরুত্বপূর্ণ নীতি ঘোষণা, সম্পর্কের ভিত্তিকে  আরও মজবুত করার দিশায় এগিয়ে যায়।

বিশ্বব্যাংক এবং আন্তর্জাতিক অর্থ তহবিলের  ভারতের উচ্চ বিকাশ হারের  ইঙ্গিত এবং বিশ্বব্যাংকের ‘ইজ অফ ডুয়িং বিজনেস ইন্ডেক্স’  বা সহজতর উপায়ে ব্যবসা করার সূচীতে ভারতের র‍্যাঙ্ক অনেক ওপরে উঠে আসায়, ইতিমধ্যেই ইউরোপীয় ব্যবসায়ীরা ভারতের দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ করেছে। একই সময়ে, ইউরোপের ব্যবসায় ভারতও একটি বড় বিনিয়োগকারী হয়ে উঠেছে। ইউরোপীয় সঙ্ঘ ও গ্রেট ব্রিটেনে ভারতের রপ্তানির পরিমান ৫ হাজার ৩৬২ কোটি ডলার (মোট ব্যবসার ১৭.৬৪ শতাংশ) এবং ২০১৭-১৮ অর্থ বছরে ৪ হাজার ৭৮৭ কোটি  ডলার (মোট ব্যবসার ১০.২৮ শতাংশ) এর মাধ্যমে ভারতের বৃহত্তম বাণিজ্য অংশীদারদের মধ্যে অন্যতম হয়ে উঠেছে ইউরোপীয় সঙ্ঘ। দীর্ঘমেয়াদী অংশীদার হিসেবে, ইউরোপীয় সঙ্ঘ-ভারত কৌশলগত অংশীদারিত্বের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে এবং এই অংশীদারিত্ব ২০০৪ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়  এবং ইউরোপীয় সঙ্ঘ-ভারত শীর্ষ সম্মেলন-২০১৩ সালের মার্চ মাসে ব্রাসেলসে অনুষ্ঠিত ১৩তম সংস্করণটি একটি অসাধারণ মঞ্চ  হিসাবে প্রকাশ পেয়েছে।

ভারত একটি জ্ঞানভিত্তিক সমাজের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে যার লক্ষ্য ২০২৫ সালের মধ্যে পাঁচ ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি গড়ে তোলা। বাণিজ্য, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি, জ্বালানি, পরিবেশ ও আইসিটি, ডিজিটাল যোগাযোগ ও নতুন প্রযুক্তিগুলিতে ভারত ও ইউরোপের মধ্যে শক্তিশালী অর্থনৈতিক সহযোগিতার জন্য  নিঃসন্দেহে ভাল। উন্নয়ন ও ব্যাপকভাবে নতুন আইসিটি পরিষেবা ও নেটওয়ার্ক, গবেষণা ও উন্নয়ন এবং উদ্ভাবন, নেটওয়ার্ক নিরাপত্তা, স্পেকট্রাম ব্যবস্থাপনা, ক্ষমতা উন্নয়ন এবং পাশাপাশি বিশ্বব্যাপী মানক এবং ভারতের টেলিযোগাযোগ সহযোগিতায় প্রযুক্তিগত সহযোগিতা ভারত ও ইউরোপের মধ্যে সহযোগিতার জন্য প্রচুর সুযোগ রয়েছে। এই অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়নের উপর এবং বিশ্বব্যাপী চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় শক্তিশালী প্রভাব ফেলতে পারে।

ভারতের সাথে ইউরোপের উন্নয়ন সহযোগিতা শিক্ষা, স্বাস্থ্য, জল এবং নিকাশী সহ একটি সফল ট্র্যাক রেকর্ড সহ কয়েক দশক ধরে বিস্তৃত হয়েছে। দূষণমুক্ত শক্তি, মজবুত উন্নয়ন এবং জলবায়ু সম্পর্কিত উদ্যোগের ক্ষেত্রে শক্তিশালী সহযোগিতায়  দুই অংশীদারদের সাথে পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তনে জড়িত থাকার আরও বেশি কর্মসূচি নিয়ে ভারত ও ইউরোপীয় সঙ্ঘ কাজ করছে।

প্রথম ইউরোপীয় সংঘ-ভারত প্রতিযোগিতা সপ্তাহ এই মাসে দিল্লিতে অনুষ্ঠিত হয়েছিল।  এটি বিভিন্ন বিষয় পরিচালনা ও প্রয়োগের ক্ষেত্রে কৃষি-রাসায়নিক ক্ষেত্র এবং অনলাইন প্ল্যাটফর্মগুলিতে প্রাসঙ্গিক বাজার একত্রিত করা  সহ প্রতিযোগিতার নীতি ও আইনের ক্ষেত্রে কৌশলগত অংশীদারিত্বকে মজবুত করার সুযোগকে তুলে ধরে।

ভারত ও ইউরোপীয় সঙ্ঘ ২০০৭ সালে চালু হওয়া বহু প্রতীক্ষিত অবাধ বাণিজ্য  চুক্তি  সহ আরও ঘনিষ্ঠ ভারত-ইউরোপীয় সঙ্ঘ কর্মসূচির পথে বেশ কিছু বাধাও রয়েছে।  পণ্য ও পরিষেবায় বাণিজ্য বৃদ্ধি ও  বিনিয়োগ বৃদ্ধি করাই এর লক্ষ্য।  একটি সর্বাত্মক চুক্তি রূপায়নের ক্ষেত্রে ‘ব্রেক্সিট’ সম্পর্কিত অনিশ্চয়তার মধ্যে সামান্যই অগ্রগতি হয়েছে, এবং ইউরোপীয় সঙ্ঘ  বাণিজ্য ও বিনিয়োগে পারস্পরিক স্বার্থে একটি “সুষম, উচ্চাভিলাষী এবং পারস্পরিক উপকারী” চুক্তির লক্ষ্যে  ব্রেক্সিট পরবর্তী   BTIA পুনর্নির্মাণের কথা ভাবতে পারে।   ভারতের বিভিন্ন তথ্যের স্থানীয়করণের দিশায় অগ্রগতির ক্ষেত্রে  ইউরোপীয় সঙ্ঘের কিছু অসুবিধা রয়েছে।   ভারত ইউরোপীয় গোপনীয়তা আইন অধ্যয়ন করছে।

এই বাধাগুলি যদি দূর হয়ে যায়, তাহলে ইউরোপের সাথে ভারতের সম্পর্ক ২১ শতকের এক নির্ণায়ক বিষয় হয়ে উঠবে।

[মূল রচনাঃ নিবেদিতা মুখার্জী]