২০১৮য় মহাকাশে ভারতের সাফল্য

ভারতীয় মহাকাশ বিজ্ঞান ইতিহাসে ২০১৮ সালকে অন্যতম বিশেষ বছর হিসেবে অভিহিত করা যেতে পারে। ৬০-এর দশকে মহাকাশ বিজ্ঞানে দেশের সীমিত পরিস্থিতি থেকে মিশন মোডে ১০৪টি কৃত্রিম উপগ্রহ উৎক্ষেপনের জন্য ভারতীয় মহাকাশ গবেষণা সংস্থা ও দেশকে অনেকটা পথ পাড়ি দিতে হয়েছে। ২০১৮তে ভারতীয় মহাকাশ গবেষণা সংস্থা যেসব উৎক্ষেপণগুলি করেছে তার মধ্যে রয়েছে কার্টোস্যাট সিরিজের দূর সংবেদী ভূ-পর্যবেক্ষণ কৃত্রিম উপগ্রহ, GSAT-6A যোগাযোগ কৃত্রিম উপগ্রহ এবং  IRNSS মহাকাশ ক্ষেত্রে যোগ দিতে ৮টি নেভিগেশন কৃত্রিম উপগ্রহ, যোগাযোগের জন্য GSAT-29, ভূ-পর্যবেক্ষণের জন্য HysIS এবং ফ্রান্সের Ariane-5 উপগ্রহ উৎক্ষেপণ যানের মাধ্যমে GSAT-11 মিশন।

ভারতীয় মহাকাশ গবেষণা সংস্থার সাম্প্রতিক উৎক্ষেপণটি ছিল  GSAT-7A কৃত্রিম উপগ্রহ। ১৯-এ ডিসেম্বর অন্ধ্র প্রদেশের সতীশ ধাওয়ান মহাকাশ কেন্দ্র থেকে GSLV- F11 থেকে এই কৃত্রিম উপগ্রহ মহাকাশে পাঠানো হয়। ২০১৮য়  কৃত্রিম উপগ্রহ তৈরির কাজে বেসরকারি সংস্থাকে সুযোগ দেওয়া সহ আরও কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রয়াস চোখে পড়ে। ইউ আর রাও কৃত্রিম উপগ্রহ কেন্দ্র বিভিন্ন বিক্রেতাদের সঙ্গে কাজ করার চুক্তি করেছে যা  উপগ্রহ নির্মান, সংযোজন ও পরীক্ষণে সহায়ক হয়ে উঠেছে। এই সংস্থাটি ২৭টি কৃত্রিম উপগ্রহ নির্মাণ করবে এবং এগুলি ২০২৩ সালের আগেই উৎক্ষেপণ করা হবে। এগুলির মধ্যে ৭টি যোগাযোগ উপগ্রহ, ১২টি ভূ-পর্যবেক্ষণ, ৫টি নেভিগেশন ও ৩টি বিজ্ঞান উপগ্রহ।

২০১৮ সালকে এই কারণেও স্মরণ করা হবে যে এই বছরে ভারতীয় মহাকাশ গবেষণা সংস্থা ২৫০টি বিদেশী কৃত্রিম উপগ্রহকে কক্ষপথে স্থাপন করার মাধ্যমে মোট ২৬৯টি বিদেশী কৃত্রিম উপগ্রহ উৎক্ষেপণ করে এক নতুন মাইল ফলক অতিক্রম করেছে। মানুষকে নিয়ে ‘গগনযান’ মিশন তথা সবথেকে ভারী রকেট চালু করা, লিথিয়াম আয়ন ব্যাটারী প্রযুক্তি, রকেট ও কৃত্রিম উপগ্রহে নতুন প্রযুক্তি অন্তর্ভুক্ত করা এবং ভারতীয় তথ্য রিলে উপগ্রহ ব্যবস্থাপনা (IRDSS)রও অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।

ভারতীয় বিমান বাহিনীকে কৌশলগত সহায়তার পাশাপাশি ভারতীয় মহাকাশ গবেষণা সংস্থা ১৯শে ডিসেম্বর এক নেটওয়ার্ক-কেন্দ্রিক অভিযানগুলিকে আরও মজবুত করতে বিশেষ করে দেশের বিমান বাহিনীর জন্য তৈরি করা একটি সামরিক যোগাযোগ কৃত্রিম উপগ্রহ  GSAT-7A চালু করেছে। এই উপগ্রহটি ভারতীয় বিমান বাহিনীকে বিভিন্ন স্থল র‍্যাডার স্টেশন, স্থল বিমান ঘাঁটি এবং মহাকাশ নিয়ন্ত্রিত প্রাথমিক সতর্কবার্তা ও নিয়ন্ত্রণ বিমানের (AWACS) সঙ্গে সংযোগ স্থাপনে সক্ষম করেছে। এটি মানব বিহীন যান চালনাতেও সহায়তা করতে পারে। ভারতীয় নৌ-বাহিনী ও বিমান বাহিনীর জন্য বিশেষ করে নির্মিত এই উপগ্রহগুলি উৎক্ষেপণের ফলে সাধারণ নাগরিকের জন্য  তথা সামরিক কারণে কার্টোস্যাট সিরিজের দূর-সংবেদী উপগ্রহগুলিকে সঠিক কক্ষপথে স্থাপন করার ক্ষেত্রে ভারত পরিশেষে সাফল্য অর্জন করেছে।

২০১৮ সালে প্রস্তাবিত মানুষকে মহাকাশে পাঠানোর সঙ্গে সংযুক্ত ও সংযুক্ত নয় এমন পরিকাঠামো উন্নয়নের অনুমোদনও দেখা যাচ্ছে। ভারতীয় তথ্য রিলে ব্যবস্থাপনা কৃত্রিম উপগ্রহ  বা IDRSS ভূ-সমলয় কক্ষপথে স্থাপন করা হবে যা ঐ উপগ্রহকে যোগাযোগে তৈরি করতে সক্ষম করে তুলবে এবং স্থল কেন্দ্রগুলির ওপর নির্ভরতা কমাবে। ভারতীয় মহাকাশ গবেষণা সংস্থার চেয়ারম্যান ডক্টর কে সিভান জানান যে, এর মধ্যে দুটি IDRSS উপগ্রহ থাকবে এবং এগুলির একটিকে পরের বছরে উৎক্ষেপণ করা হবে।

প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী স্বাধীনতা দিবসে ঘোষণা করেছিলেন যে ২০২২ সালের মধ্যে ভারত যখন তাঁর স্বাধীনতার ৭৫ বছর পূর্ণ করবে, একজন ভারতীয় দেশের পতাকা নিয়ে মহাকাশে যাবেন। প্রধানমন্ত্রী মোদীর নেতৃত্ব এবং ভারতের মহাকাশ মিশনকে এক নবতর উচ্চতা প্রদান করার বিষয়ে তাঁর অঙ্গীকার নিঃসন্দেহে উল্লেখযোগ্য। ভারতীয় মহাকাশ বিজ্ঞানীরা শুধু অদূর ভবিষ্যতের জন্য নির্ধারিত মহাকাশ মিশনেরই নেতৃত্ব দিচ্ছেন তা নয়, তাঁরা মহাকাশ ডিজাইন ক্ষেত্রেও  অসাধারণ কাজ করছেন। সাম্প্রতিক সময়কালে নতুন ও ক্ষুদ্র কৃত্রিম উপগ্রহ ডিজাইন (CubeSats)-এর ধারণাও এই ভারত থেকেই উদ্ভূত হয়েছে।

২০১৯ এর দিকে সবাই অধীর আগ্রহে তাকিয়ে রয়েছে, কেননা ভারতীয় মহাকাশ গবেষণা সংস্থা জানুয়ারি মাসে তাদের দ্বিতীয় চন্দ্রযান পাঠাতে চলেছে। আরও একটি যে গুরুত্বপূর্ণ মিশন তারা হাতে নিয়েছে তা হল ভারতীয় তথ্য রিলে ব্যবস্থাপনার দুটি কৃত্রিম উপগ্রহ বা  IDRSSও সম্ভবত মহাকাশে পাঠানো হবে। এগুলি ভারতের দূর সংবেদী/ভূ-পর্যবেক্ষণ কৃত্রিম উপগ্রহের সঙ্গে এবং ভূ-সমলয় কৃত্রিম উপগ্রহ উৎক্ষেপণ যান মার্ক-III ( GSLV Mk-III)-এর মাধ্যমে ২০২২ সালে তিন ভারতীয় মহাকাশচারীকে মহাকাশে পাঠানোর যে পরিকল্পনা করা হয়েছে সেই যানের সঙ্গেও নিরবচ্ছিন্নভাবে যোগাযোগ রেখে চলবে।

[মূল রচনাঃ যোগেশ সুদ]