ভারতে কন্যাশিশুদের ক্ষমতায়ন

সাড়ে চার বছরের স্বল্প সময়ে ভারত কন্যা শিশুদের বিরুদ্ধে সামাজিক বৈষম্য    কাটিয়ে উঠেছে এবং উল্লেখযোগ্যভাবে সাফল্য লাভ করেছে। শিশু লিঙ্গের অনুপাত হ্রাস পাওয়ার প্রেক্ষিতে সময় মত ‘বেটি বাঁচাও বেটি পড়াও’ চালানো হয়। ভারত ২২শে জানুয়ারী এই অভিযানের চতুর্থ বার্ষিকী উদ্‌যাপন করছে। সামাজিক পরিবর্তন এবং পরিসংখ্যান থেকে কন্যা সন্তানের অনুকূল এক পরিমন্ডলের সুনির্দিষ্ট ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। ০-৬ বয়সের শিশু লিঙ্গের অনুপাতে উন্নতির খবর এবং সেই সঙ্গে স্কুলে তাদের ভর্তি হবার অপেক্ষাকৃত উন্নত অনুপাত নিঃসন্দেহে এই সন্তোষজনক অবস্থার আভাষ দেয়। খুব কম সময়ের মধ্যে এই অভিযান সমগ্র দেশে ছড়িয়ে পড়ার বিষয়টিও উল্লখ করার মত। এটি শুধু সরকারী অভিযান না থেকে দেশের মানুষ স্বতস্ফুর্তভাবে এতে অংশ গ্রহণ করেছে এটা নিঃসন্দেহে ইতিবাচক দিক। গর্ভাবস্থার বর্ধিত নথিভুক্তিকরণ, প্রাতিষ্ঠানিক প্রসব এবং উন্নততর স্বাস্থ্য পরিচর্যার সম্প্রসারণ এর অর্জিত ফল। বিদ্যালয়ে ব্যাপক হারে শৌচাগার নির্মাণ এই অভিযানকে আরো এগিয়ে নিয়ে গেছে।

২০১১ সালের আদম সুমারিতে ভয়ংকর প্রবণতা সামনে আসে। জাতীয় শিশু লিঙ্গ অনুপাত ৯১৮তে নেমে গিয়েছিল।  পাঁচ দশক আগে ১৯৬১ সালের জনগণনায় শিশু লিঙ্গের অনুপাত দেখানো হয় ৯৭৬। হরিয়ানা সহ কিছু কিছু রাজ্যে এই প্রবনতা ছিল ভয়াবহ। বস্তুত পক্ষে হরিয়ানায় ০ থেকে ৬ বছরের ক্ষেত্রে প্রতি ১০০০ ছেলের তুলনায় কন্যা সন্তানের অনুপাত ছিল মাত্র ৮৩০জন। সুতরং জন আন্দোলনের প্রয়োজন ছিল এই সামাজিক ব্যধির মোকাবিলার জন্য।

হরিয়ানায় এখন এই প্রবনতা বিপরীতমুখী কারণ স্বাস্থ্য এবং পরিবার কল্যাণ মন্ত্রকের পরিসংখ্যান অনুযায়ী এখানে প্রতি ১০০০ জন ছেলের অনুপাতে মেয়েদের সংখ্যা ৯২৯ বলে জানানো হয়েছে। রাজস্থানও অনেকটা হরিয়ানার মতই, এখানে ২০১১তে শিশু লিঙ্গের অনুপাত ছিল ৮৮৮। বর্তমানে রাজ্যের ১৪টি মধ্যে  এই অভিযানের জন্য ১০ নির্বাচিত জেলায় লিঙ্গ অনুপাতের অনেক উন্নতি হয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ২০১৫র ২২শে জানুয়ারী হরিয়ানার পানিপথ থেকে বেটি বাঁচাও বেটি পড়াও অভিযান শুরু করেন। খুব শীঘ্রই এটি সামাজিকভাবে গ্রহণযোগ্য হয়ে ওঠে। সমাজের বিভিন্ন ক্ষেত্রের বিশিষ্ট  ব্যক্তিরা সোচ্চার হন। সরকার জন সচেতনতা অভিযান চালায়। নাগরিক সমাজ এই আন্দোলনে যোগ দেয়। সোস্যাল মিডিয়ায় সদ্যজাত কন্যার সঙ্গে সেলফি শেয়ার করা এখন ফ্যাশনে দাঁড়িয়েছে।

বেটি বাঁচাও বেটি পড়াও অভিযানে তিনটি মন্ত্রক যুক্ত-মহিলা এবং শিশু, স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ, এবং মানব সম্পদ উন্নয়ন। এথেকেও বোঝা যায় যে সরকার এই অভিযানের প্রতি কতটা গুরুত্ব দেয়। প্রথমে এই কর্মসূচি ১০০টি জেলায় চালু করা হয়, তারপর ৬১টি জেলা এর সঙ্গে যুক্ত করা হয়। রেকর্ড থেকে দেখা যাচ্ছে যে শিশু লিঙ্গের অনুপাত ১৬১টির মধ্যে ১০৪টি জেলায় উন্নত হয়েছে। ২০১৮র মার্চের মধ্যে দেশের ৬৪০টি জেলায় এই অভিযান সম্প্রসারিত হয়েছে।

সরকার অতিরিক্ত উৎসাহ দানের মাধ্যমে এই কর্মসূচিকে সহায়তা করেছে।  আর একটি প্রকল্প সুকন্যা সমৃদ্ধি যোজনায় সরকার আর্থিক নিরাপত্তার ব্যবস্থা করেছে কন্যা সন্তানদের জন্য। এতে মেয়েদের লেখা পড়া এবং বিয়ের জন্য আর্থিক সহায়তা দিয়ে থাকে। এই কর্মসূচির আওতায় ১০ বছর পর্যন্ত মেয়েদের জন্য সুদের হার অধিক এবং আয়কর মুক্ত সেভিংস এ্যাকাউন্ট খোলার সংস্থান রয়েছে। কেবল মাত্র ২৫০টাকায় যেকোনো রাষ্ট্রায়ত্ব ব্যংক বা ডাকঘরে এ্যাকাউট খোলা যায়। বছরে সর্বাধিক দেড় লক্ষ টাকা জমা করা যায়।  এটি খুবই সফল বলে প্রমাণিত হয়েছে , জমার পরিমাণ ২৫,৯৮০ কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে এবং এ্যাকাউন্ট ধারকের সংখ্যা ১.৪ কোটির বেশি।

সরকারের উচিত এই দুটি অভিযানের জন্য আর্থিক সহায়তা আরো বাড়ানো। এছাড়াও, গ্রামীণ এলাকায় প্রশিক্ষণ প্রাপ্ত আরো অধিক স্বাস্থ্য পরিচর্যা পেশাদারদের দ্রুত নিয়োগের ব্যবস্থা করা সরকারের অবশ্য কর্তব্য।(মূল রচনাঃ মনীশ আনন্দ)