ভারতীয় সাধারণতন্ত্রের উজ্জ্বল অগ্রগতি

ভারত ৭০তম সাধারণতন্ত্র দিবস উদযাপন করছে যা আদতে প্রজাতন্ত্রের পরীক্ষা, সমস্যা ও উত্সাহের উপর এক স্বতঃস্ফূর্ত আত্মানুসন্ধানের দিন। মহাত্মা গান্ধীর অনবদ্য নেতৃত্বে দীর্ঘ  স্বাধীনতা সংগ্রামের পর ভারত এক স্বাধীন দেশ হিসেবে জন্ম নেওয়ার পর বহু সমস্যার সম্মুখীন হয়েছিল। ১৯৫০ সালে ভারতে প্রজাতন্ত্র ঘোষিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সমগ্র এশিয়া ও আফ্রিকার মধ্যে ঔপনিবেশিকতার ভাঙন শুরু হয়। দারিদ্র্য, নিরক্ষরতা, রোগ, পরিকাঠামোর অভাব এবং সামাজিক কলঙ্কগুলি ছিল দেশের সামনে এক চ্যালেঞ্জ। এটা নিঃসন্দেহে এক গর্বের বিষয় যে, বছরের পর বছর ধরে, বিশেষ করে সাম্প্রতিক কয়েক বছরে দেশের মধ্যে এক  বিশাল রূপান্তরণ ঘটেছে যা দেশকে কাঙ্খিত স্পন্দনশীল গণতন্ত্র ও মজবুত অর্থনীতি সমৃদ্ধ দেশের তালিকায় প্রাধান্য বিস্তার করতে সাহায্য করেছে।

আজ, ভারত একটি স্থিতিশীল দেশ এবং বিশ্বের দ্রুততম  এগিয়ে চলা অর্থনীতির দেশ হিসাবে উঠে এসেছে। গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলিতে নিয়মিত পঞ্চায়েত নির্বাচন থেকে সংসদীয় নির্বাচন দেশ ও জনগণের গণতান্ত্রিক মনোভাবেরই প্রতিফলন। ভারতের বিপুল অর্থনৈতিক সম্ভাবনা দেশ ও জনগণের সার্বিক উন্নয়নের জন্য ব্যাপক সুযোগ এনে দিয়েছে। ২০১৪-১৫ থেকে ২০১৭-১৮  অর্থবছরে মোট অভ্যন্তরীণ উৎপাদন বা জিডিপি বৃদ্ধির গড় ৭.৩ শতাংশ হয়েছে যা বিশ্বের প্রথম সারির অর্থনীতিগুলির মধ্যে দ্রুততম। আন্তর্জাতিক অর্থ তহবিলের সর্বশেষ ইঙ্গিতে ২০১৯-২০ সালে এই বৃদ্ধি ৭.৫ শতাংশ হতে পারে বলে জানানো হয়েছে যা আসলে এক মজবুত অর্থনীতির কথাই প্রমাণ করে। উল্লেখযোগ্য বিষয় হল, নিম্ন মুদ্রাস্ফীতি, চলতি অ্যাকাউন্টের ব্যালেন্স বৃদ্ধি এবং জিডিপি অনুপাতে রাজস্ব ঘাটতি উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পাওয়ার প্রেক্ষাপটে এই বৃদ্ধি হয়েছে। পণ্য ও পরিষেবা কর বা জিএসটির প্রবর্তন ব্যাঙ্কগুলির অনুৎপাদক সম্পদ বা নন-পার্ফর্মিং অ্যাসেট সম্পর্কিত  সমস্যাগুলি নিরসনে সহায়ক হয়েছে। প্রত্যক্ষে বৈদেশিক বিনিয়োগ বা এফডিআই-এর আরও উদারীকরণ অর্থনৈতিক সংস্কারে গতি সঞ্চার করেছে। তথাপি, ২০১৮র জানুয়ারির হিসাব অনুযায়ী দেশের বিদেশী মুদ্রা সঞ্চয় দাঁড়িয়েছে প্রায় ৪১ হাজার ৪০০ কোটি মার্কিন ডলারে।

সহজে ব্যবসা করার বিষয়ে ২০১৯ সালের বিশ্ব ব্যাঙ্কের রিপোর্টে  ভারতের বিশ্বাসযোগ্যতার নিরিখে ভারতের অবস্থান অনেক ওপরে উঠে আসায় দেশ ব্যবসায়ী  এবং শিল্পপতিদের জন্য একটি আকর্ষণীয় গন্তব্য হিসাবে তুলে ধরেছে। এই নিয়ে পরপর দ্বিতীয়বার ভারতকে সহজে ব্যবসা করার এক অন্যতম গন্তব্যস্থল হিসাবে স্বীকৃতি দেওয়া হল।

এই  পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে বছরের পর বছর ধরে ভারত জাতীয় গ্রামীণ কর্মসংস্থান সুনিশ্চিত প্রকল্প, দিন দয়াল অন্ত্যোদয় যোজনা, জাতীয় গ্রামীণ তথা শহরাঞ্চলীয় জীবনযাত্রার মিশন, জাতীয় সামাজিক সহায়তা কর্মসূচী, প্রধানমন্ত্রী জনধন যোজনা, প্রধানমন্ত্রী  জীবন জ্যোতি বিমা যোজনা, অটল পেনশন যোজনা ইত্যাদি কর্মসূচির মাধ্যমে দেশ মোট জনসংখ্যার ৭৮ শতাংশকে দারিদ্র্যসীমার উপরে তুলে আনতে সক্ষম হয়েছে। মুদ্রা যোজনাটির মাধ্যমে দেশের তরুণদের ক্ষুদ্র ব্যবসা প্রয়াসকে তুলে ধরতে চেয়েছে। একইভাবে প্রধানমন্ত্রীর কর্মসংস্থান সৃষ্টি কর্মসূচী, অসংগঠিত শ্রমিকদের সামাজিক নিরাপত্তা, ক্রেডিট গ্যারান্টি ফান্ডগুলি আয় এবং জীবিকা নির্বাহের লক্ষ্যে তৈরি করা হয়েছে। প্রতিদিন যাদের ১.৯ ডলার বা তার কম আয় রয়েছে তাদের চরম দারিদ্র্যের সজ্ঞার অন্তর্ভুক্ত করে ব্রুকিংস ইনস্টিটিউট তাদের সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখিয়েছে যে ২০২২এর মধ্যে ৩ শতাংশেরও কম ভারতীয় দরিদ্র হিসেবে বিবেচিত হবেন এবং ২০৩০ সালের মধ্যে চরম দারিদ্র্যের অবসান ঘটবে।

জাতীয় গ্রামীণ পানীয় জল কর্মসূচী, জাতীয় নদী সংরক্ষণ কর্মসূচী, প্রধানমন্ত্রী  উজ্জ্বলা যোজনা, শ্যামা প্রসাদ মুখার্জি রার্বান মিশন (এস পি এম আর এম), সকলের জন্য আবাসন, ডিজিটাল ইন্ডিয়া, আয়ুষ্মান ভারত স্বাস্থ্য সুরক্ষা প্রকল্প প্রভৃতির মাধ্যমে, প্রান্তিক তথা দরিদ্র মানুষের মান উন্নয়নে প্রয়াস নেওয়া  হয়েছে। ২০১৬র মে মাসে চালু করা উজ্জ্বলা প্রকল্পের মাধ্যমে উপযুক্ত পরিবারের নারীর নামে রান্নার গ্যাস সংযোগের জন্য আর্থিক সহায়তা প্রদান করা হয়েছে।

নির্দিষ্ট কিছু উদ্দেশ্য ও দিশা দেশকে তার স্বপ্ন সাকার করার পথে এগিয়ে চলতে সক্ষম করেছে। দেশ ও জনগণের স্বার্থে এই বৃদ্ধি এবং উন্নয়নের গতি অবরোধ না করে তা অব্যাহত রাখাই উচিত।

[মূল রচনা – ডক্টর রূপা নারায়ণ দাস]