ভারত- দক্ষিণ আফ্রিকা মৈত্রী বন্ধন

দক্ষিণ আফ্রিকার রাষ্ট্রপতি ডঃ সিরিল রামাফোসা প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির আমন্ত্রণে সরকারীভাবে ভারত সফর করে গেলেন। তিনি এবছরের সাধারণতন্ত্র দিবস উদযাপনের অঙ্গ হিসেবে নতুন দিল্লির রাজপথে আয়োজিত  মুল অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি রূপে উপস্থিত ছিলেন। রামাফোসার সঙ্গে এসেছিলেন তাঁর স্ত্রী ডঃ শেপো মৎশেপে, ৯ জন মন্ত্রী ও সরকারী আধিকারিক সহ একটি উচ্চ স্তরীয় প্রতিনিধিদল ও ৫০ সদস্যের একটি ব্যবসায়িক প্রতিনিধিদল। দক্ষিণ আফ্রিকার রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর ডঃ সিরিল রামাফোসার এটি ছিল প্রথম নতুন দিল্লি সফর। গণতান্ত্রিক দক্ষিণ আফ্রিকার প্রথম রাষ্ট্র প্রধান ডঃ নেলসন মন্ডেলার পর রামাফোসা হলেন সে দেশের দ্বিতীয় রাষ্ট্রপ্রধান যিনি সাধারণতন্ত্র দিবসের মূল অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি রূপে উপস্থিত থাকলেন।

রাষ্ট্রপতি রামাফোসাকে রাষ্ট্রপতি ভবনে আনুষ্ঠানিক অভ্যর্থনা জানানো হয়। রাষ্ট্রপতি রাম নাথ কোবিন্দ সফররত রাষ্ট্রপতির সম্মানে ভোজসভার আয়োজন করেন। রামাফোসা সস্ত্রীক রাজঘাটে গিয়ে জাতির জনক মহাত্মা গান্ধীর সমাধি স্থলে পুষ্পার্ঘ নিবেদন করেন। এর পর তিনি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে পারস্পরিক স্বার্থ জড়িত বিভিন্ন দ্বিপাক্ষিক, আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক বিষয়ে আলাপ আলোচনা করেন। শ্রী মোদি রামাফোসার সম্মানে মধ্যাহ্নভোজের আয়োজন করেন।

শ্রী মোদি ও রামাফোসা ভারত-দক্ষিণ আফ্রিকা ব্যবসায়ী মঞ্চের সভায় ভাষণ দেন। সফররত রাষ্ট্রপ্রধান, ভারত-ব্রাজিল-দক্ষিণ আফ্রিকা কাঠামোর পঞ্চদশতম বার্ষিকীতে আন্তর্জাতিক বিষয়ক ভারতীয় পরিষদ আয়োজিত গান্ধী-ম্যান্ডেলা মুক্তি বক্তৃতা দেন।

রাষ্ট্রপতি রামাফোসা তাঁর স্ত্রীকে সঙ্গে নিয়ে নতুন দিল্লির রাজপথে আয়োজিত এ বছরের সাধারণতন্ত্র দিবস উদযাপনের মূল অনুষ্ঠানে সেনা বাহিনীর কুচকাওয়াজ ও বর্ণাঢ্য সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান প্রত্যক্ষ করেন। দিনের শেষে দেশে ফিরে যাবার আগে তিনি আমাদের রাষ্ট্রপতি রাম  নাথ কোবিন্দ আয়োজিত একটি অনুষ্ঠানে অংশ নেন।

ভারত ও দক্ষিণ আফ্রিকার মধ্যে ১৯৯৭ সাল থেকে ঘনিষ্ঠ বহুমুখী কৌশলগত অংশীদারিত্ব বিদ্যমান। বিগত দিনগুলিতে দুটি দেশের মধ্যে সরকারী পর্যায়ে একাধিক উচ্চ স্তরীয় সফর বিনিময় হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি জোহানেসবার্গে ব্রিক্স দেশ গোষ্ঠীর শিখর সম্মেলনে যোগ দিতে দক্ষিণ আফ্রিকা যান। প্রায় ১৫ লাখ জন্ম সূত্রে ভারতীয় ওই দেশে বাস করছেন। দেড় শতাধিক ভারতীয় কোম্পানী ওই দেশে বিনিয়োগ করেছে। এতে প্রায় ২০ হাজার স্থানীয় মানুষের কর্ম সংস্থান হয়েছে। দেশটি ভারতের শীর্ষ পাঁচটি বাণিজ্যিক অংশীদার দেশের অন্যতম। দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যের পরিমাণ ক্রমাগত বৃদ্ধি পেয়ে ২০১৮-১৯’এ দাঁড়িয়েছে প্রায় এগারোশো কোটি মার্কিন ডলার।

ভারত ও দক্ষিণ আফ্রিকা বিভিন্ন আন্তর্জাতিক বিষয়ে অভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করে; এবং একাধিক আন্তর্জাতিক মঞ্চে, যেমন রাষ্ট্রসংঘ, ব্রিক্স, জি-২০, কমনওয়েলথ ও ইবসা’তে  ঘনিষ্ঠ সহযোগিতার ভিত্তিতে ভূমিকা পালন করছে।

দক্ষিণ আফ্রিকায় বর্ণবৈষম্যবাদী সরকারের সময় থেকেই ওই দেশের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক  রয়েছে। সে দেশে একটি রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে ডঃ নেলসন মন্ডেলার আফ্রিকী জাতীয় কংগ্রেসকে ভারতই প্রথম স্বীকৃতি দেয়। নতুন দিল্লি বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মঞ্চে দক্ষিণ আফ্রিকার সংখ্যাগরিষ্ঠ অশ্বেতকায় মানুষের স্বার্থের কথা তুলে ধরে ও বর্ণবৈষম্যবাদের অবসানের আহ্বান জানায়।

এর পর গত শতাব্দীর ৯০’এর দশকে বর্ণবৈষম্যবাদের অবসানের পর দক্ষিণ আফ্রিকার নতুন রাষ্ট্রপতি ফ্রেডরিক ডি ক্লার্কের সরকারের সঙ্গে নতুন দিল্লি পূর্ণাংগ কূটনৈতিক সম্পর্ক  স্থাপন করে। ওই দেশের ক্রিকেট দলকে ভারত এক দিনের আন্তর্জাতিক ক্রিকেট খেলার আমন্ত্রণ জানায়। ডঃ নেলসন মন্ডেলা ভারত ভ্রমণে আসেন। তাঁকে ভারতের সর্বোচ্চ অসামরিক পুরস্কার ভারত রত্ন ছাড়াও গান্ধী শান্তি পুরস্কারে সম্মানিত করা হয়। সেই থেকে নতুন দিল্লি বিভিন্ন কারিগরী ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা প্রকল্পের মাধ্যমে দক্ষিণ আফ্রিকার উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে যাচ্ছে।

দক্ষিণ আফ্রিকার রাষ্ট্রপতির সদ্য সমাপ্ত নতুন দিল্লি সফরে দুটি দেশের মধ্যে মৈত্রী বন্ধন উত্তরোত্তর মজবুত হয়ে উঠবে বলেই সকল মহলের প্রত্যাশা। (মূল রচনাঃ-কৌশিক রায় )