ভেনেজুয়েলায় গভীরতর সংকট

অনেকদিন থেকেই ভেনেজুয়েলা রাজনৈতিক অশান্তি, হিংসা, মূদ্রাস্ফিতি এবং খাদ্য সংকটে জর্জরিত। গত কয়েক বছরে তিন মিলিয়ন মানুষ দেশ ছেড়ে চলে গেছেন। এদের মধ্যে কলোম্বিয়া এক মিলিয়নকে আশ্রয় দিয়েছে। পেরু, ইকুয়েডোর, আর্জেন্টিনা, চিলি সকলেই ভেনেজুয়েলার শরনার্থীদের আশ্রয় দিয়েছে। ল্যাটিন আমেরিকার শরানার্থী সংক্রান্ত নমনীয় নীতির ফলেই এটা সম্ভব হয়েছে। বিশ্বের বৃহত্তম তেল সংরক্ষণের এই দেশ ভেনেজুয়েলার রপ্তানীর ৯৮ শতাংশ আসে তেল থেকে এবং দেশের জি ডি পির ৫০ শতাংশ হল এই পরিমান।

বিশ্বের অনেক নেতা বিরোধী নেতা খুয়ান গেইডোসের স্বঘোষিত সরকারকে স্বীকৃতি দানের ঘোষণা করায় ভেনেজুয়েলার রাজনৈতিক সংকট এখন জটিল অবস্থায় পৌঁছেছে। রাষ্ট্রপতি নিকোলাস মাদুরোর সামনে এখন তাঁর রাষ্ট্রপতিত্ব রক্ষা করাই দুস্কর হয়ে পড়েছে। এমনকি প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি হুগো চাভেজ আমেরিকার শত্রুতা এবং নিষেধাজ্ঞার সম্মুখিন। তবে ন্যয় বিচারের লক্ষ্যে তাঁর গৃহীত ব্যবস্থার জন্য ভেনেজুয়েলার সংখ্যা গরিষ্ঠদের তাঁর প্রতি সমর্থন রয়েছে।

বুশ প্রশাসনের সময় থেকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বলিভারিয়ান বিদ্রোহ দমনের চেষ্টা করে আসছে। ২০০২ সালে এক অভ্যুত্থান হবার উপক্রম হয়, কিন্তু জন সমর্থনের ফলে চাভেজ সরকার পুনঃ প্রতিষ্ঠিত হয়। মার্কিন প্রশাসন ধারাবাহিকভাবে মাদুরো সরকারের স্থিতিশীলতা ক্ষুন্ন করার চেষ্টা চালিয়ে এসেছে। প্রাক্তন মার্কিন বিদেশ মন্ত্রী রেক্স টিলারসন এক সামরিক অভ্যুত্থানের সম্ভাবনার কথা বলেছিলেন। জাতীয় সভায় মাদুরোর বিরুদ্ধে মহা অভিযোগের ডাক দেওয়া হয় এবং মানব সংকটের অবসানে বল প্রয়োগের চেষ্টা চালানো হয়। এই ধরণের হস্তক্ষেপের ফলে দেশের মেরুকরণ হয়। তবে বিদেশী মধ্যস্ততা গ্রহণযোগ্য নয়।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট আগের মতই ল্যাটিন আমেরিকার রাজনীতিতে হস্তক্ষেপ করে আসছে। এসবের মধ্যে রয়েছে ১৯৫৪ সালে গুয়েতেমালায় জাকোবো আর্বেঞ্জ সরকারের বিরুদ্ধে সি আই এ সমর্থিত অভ্যুত্থান থেকে নিয়ে ১৯৬২ সালে কিউবার ক্ষেপনাস্ত্র সংকট, ১৯৬৫তে ডোমিনিকান রিপাবলিকে সামরিক হস্তক্ষেপ এবং ১৯৭৩ সালে চিলিতে সাল্ভাডোর এ্যালেন্ডে সরকারের বিরুদ্ধে সামরিক অভ্যুত্থান ইত্যাদি।

ভেনেজুয়েলার রাষ্ট্রপতি মাদুরো গতবছর দ্বিতীয় বারের জন্য পুনরায় নির্বাচিত হন। তাঁর প্রতিপক্ষ খুয়ান গুয়াইডো গত সপ্তাহে নিজেকে কার্যকরী রাষ্ট্রপতি হিসেবে ঘোষণার পর প্রচন্ড চাপের মুখে রয়েছেন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ল্যাটিন আমেরিকার বহু দেশ সহ বিভিন্ন সরকার বর্তমানে শ্রী গুয়াইডোকে রাষ্ট্রপতি হিসেবে সমর্থন করছে। ইওরোপীয় শক্তিগুলিও রাষ্ট্রপতি মাদুরোকে সতর্ক করে দিয়ে বলেছে যে তাঁকে নির্বাচন করাতে হবে না হলে, তারা সরকারীভাবে বিরোধীদের নেতৃত্বের দাবীর প্রতি স্বীকৃতি দেবে। ব্রিটেন এবং ফ্রান্স আরো স্পষ্ট অবস্থান নিয়েছে। তবে, ভেনেজুয়েলা নতুন করে নির্বাচনের দাবী খারিজ করে দিয়েছে। তবে, বিদেশ মন্ত্রী জর্জ এ্যারিয়েজ চাপ সৃষ্টির নীতি মানতে অস্বীকার করেছেন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ভেনেজুয়েলাকে সাবধান করে জানিয়েছে যে সমস্ত বিকল্প তাদের সামনে রয়েছে।

রাশিয়া মাদুরো প্রশাসনের প্রতি সমর্থন জানিয়েছে। মস্কো বলেছে যে বিরোধী নেতার প্রতি বিদেশী সমর্থন আন্তর্জাতিক আইনের পরিপন্থি। চীন, ম্যাক্সিকো এবং তুরস্ক মাদুরোর প্রতি সমর্থন ব্যক্ত করেছে।

ভারত নীতিগতভাবে অন্য দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে বরবরের মতই হস্তক্ষেপ না করার অবস্থান নিয়েছে। দক্ষিণ আমেরিকার দেশগুলির মধ্যে ভেনেজুয়েলার সঙ্গে নতুন দিল্লীর  সম্পর্ক অত্যন্ত ভালো। ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রক বলেছে নতুন দিল্লী মনে করে কোনো রকম হিংসা ছাড়া গঠনমূলক আলোচনার মাধ্যমে ভেনেজুয়েলাকে রাজনৈতিক সমাধান খুঁজে বার করতে হবে। ভারত মনে করে শান্তি, গণতন্ত্র এবং নিরাপত্তা ভেনেজুয়েলার জনগণের সমৃদ্ধি এবং অগ্রগতির পক্ষে সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

ভারত তাদের জোট নিরপেক্ষ এবং হস্তান্তর বিরোধী নীতি অনুযায়ী তাদের অবস্থান নিয়েছে। ভারত শাসন পরিবর্তনের পক্ষপাতি নয়। ভেনেজুয়েলার জনগণকেই তাদের সর্বোত্তম জাতীয় স্বার্থে এই সংকটের নিরসন করতে হবে।  (মূল রচনাঃ অ্যাশ নারায়ণ রায়)