উপ-আঞ্চলিক সহযোগিতায় বি বি আই এন এর সম্ভাবনা

অধিকাংশ দেশের ক্ষেত্রে অর্থনৈতিক সংহতি যেমন অগ্রাধিকার পাচ্ছে, সেই সঙ্গে একই অঞ্চলের বিভিন্ন দেশকে একটি অভিন্ন মঞ্চে নিয়ে এসে আঞ্চলিক সহযোগিতার মাধ্যমে ক্ষমতা বৃদ্ধির চেষ্টা করা হচ্ছে। দক্ষিণ এশিয়ায় এই সংযোগ সাধনের প্রয়াস ব্যর্থ হয়েছে কারণ এখানে সংযোগকে ভৌগলিক রাজনীতির দৃষ্টিতে দেখা হয়েছে। সমমনোভাপন্ন ভৌগলিক দিক থেকে নৈকট্য রয়েছে এবং যাদের উন্নয়নী অগ্রাধিকারও প্রায় একই রমক এমন উপ-আঞ্চলিক দেশগুলির মধ্যে সহযোগিতা ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে। এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ-ভুটান-ভারত-নেপাল ( বি বি আই এন) একটি উপ-আঞ্চলিক সহযোগিতার মঞ্চ হিসেবে গুরুত্ব পাচ্ছে। তবে, সার্ক সনদে সন্নিবেশিত উপ-আঞ্চলিক সহযোগিতার অংগ নয় এই বি বি আই এন, এবং এখানে পরিবহন সংযোগ এবং জ্বালানী গ্রিডের মাধ্যমে পূর্ব  দক্ষিণ এশিয়ায় রুপান্তরের কথা বলা হয়েছে।

বি বি আই এন এর চারটি সদস্য দেশই বর্তমান পরিবহন নেটওয়ার্কের বিষয়ে সহযোগিতা করতে সম্মত হয়। যদিও ভারত, নেপাল এবং বাংলাদেশ এই বি বি আই এন অনুমোদন করেছে কিন্তু ভুটান এখনও করে উঠতে পারে নি।  তবে থিম্পু অন্য তিনটি দেশকে সহযোগিতার বিষয়ে এগিয়ে যাবার সবুত সংকেত দিয়েছে এবং তাদের জাতীয় সংসদে পরিবেশ সংক্রান্ত যে প্রশ্ন উঠেছে তা নিরসনের পর এটি অনুমোদন করবে বলে জানিয়েছে। ভুটান পর্যবেক্ষক হিসবে বিভিন্ন বৈঠকে যোগ দিচ্ছে।

এই অঞ্চলের বিভিন্ন দেশের মধ্যে একাধিক দ্বিপাক্ষিক যোগাযোগ প্রকল্প রুপায়িত হচ্ছে। ভারত প্রতিবেশী দেশগুলিকে ঋণ দিচ্ছে সড়ক নেটওয়ার্ক বিকশিত করা, রেলের গেজ পরিবর্তন করা এবং ১৯৬৫র আগে যে সংযোগ নেটওয়ার্ক ছিল তা পুনপ্রতিষ্ঠিত করার জন্য। তারা নেপালের সঙ্গে ভারতীয় রেলের সংযোগ স্থাপন করতে রেল লাইন স্থাপন করছে এবং কাঠমন্ডুতে নিরবিচ্ছিন্ন সরবরাহ বজায় রাখতে পেট্রোলিয়াম পাইপ লাইন নির্মাণ করছে। ভারত এবং ভুটানের মধ্যে ইতিমধ্যেই সড়ক নেটওয়ার্ক রয়ছে। এই সংযোগ বৃদ্ধির উদ্যেশ্য হল বাণিজ্যিক সম্প্রসারণ এবং মানুষে মানুষে যোগাযোগ বৃদ্ধি করা। আসলে এই প্রস্তাবিত উপ-আঞ্চলিক পরিবহন নেটওয়ার্ক এশিয় মহাসড়ক এবং রেলওয়ে নেটওয়ার্কের সঙ্গে সংযোগ সাধন করবে যার ফলে সৃষ্টি হবে সুসংহত পরিবহন করিডোর। ভারতও কালাদান বহুমডেল বিশিষ্ট প্রকল্প এবং ত্রিপাক্ষিক মহাসড়ক নির্মান করছে যা ভারতের সঙ্গে মিয়ানমার ও থাইল্যান্ডের মধ্যে সংযোগ গড়ে তুলবে।

বি বি আই এন উপ-আঞ্চলিক নেটওয়ার্ক ভৌগলিক-রাজনৈতিক পালা বদলের সাক্ষী হতে পারে কারণ দক্ষিণ এশিয়ার অর্থনৈতিকভাবে সব চেয়ে প্রান্তিক অঞ্চলের মধ্যে যোগাযোগ সৃষ্টি করতে চলেছে এটি । ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে এখনো অনেক উন্নয়ন বাকী; নেপাল এবং ভুটান ভারতের উত্তর পূর্বাঞ্চলের রাজ্যগুলির মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের নিকটবর্তী বন্দরে প্রবেশ পেতে পারে। ঢাকা নেপাল ও ভুটানের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক উন্নয়নের জন্য সংযোগ নেটওয়ার্ক ব্যবহার করবে। প্রস্তাবিত রুটে সফল পরীক্ষামূলক পরিচালনা ইতিমধ্যেই সম্পূর্ণ হয়েছে।

তিনটি দেশ বৈদ্যুতিক বাণিজ্যের জন্য তাদের গ্রিডের মধ্যে সংযোগ সাধনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ভারত ও বাংলাদেশ আগে থেকেই বিদ্যুৎ লেনদেন করছে। ভারত বাংলাদেশের রামফল বিদ্যুৎ প্রকল্পে বিনিয়োগ করছে,  এছাড়াও  নেপাল ও ভুটানে জল বিদ্যুৎ প্রকল্প রয়েছে। এখন বাংলাদেশ ভুটানের জলবিদ্যুৎঅ ক্ষেত্রে বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নিয়েছে।  একই ভাবে  বাংলাদেশ নেপাল থেকে বিদ্যুৎ আমদানী করবে ভারতীয় গ্রিড ব্যবহার করে, এর ফলে এর ক্ষমতা আরো বৃদ্ধি পাবে। এই ধরণের উপ-আঞ্চলিক গ্রিড সংযোগের ফলে জ্বালানী নিরাপত্তা সুনিশ্চিত হয়।

বি বি আই এন আঞ্চলিক সহযোগিতার সফল হাতিয়ার হতে পারে। উপ-আঞ্চলিক সহযোগিতার জন্য  বহু মডেল বিশিষ্ট মোটর গাড়ি চুক্তি এবং সীমান্তে বাণিজ্যিক সুবিধা সহ পরিবহন সংযোগ খুবই জরুরী। মুক্ত বাণিজ্য, সম্প্রসারিত বাণিজ্যিক সুবিধা এবং শুল্ক বহির্ভুত প্রতিবন্ধকতা অপসারণ পূর্ব-দক্ষিণ উপ-অঞ্চলের অর্থনৈতিক রুপান্তরের দিশায় এক নতুন দিগন্তের সন্ধান দেবে  বলে আশা করা যায়।   ((মূল রচনাঃ ড.স্মৃতি পট্টনায়েক)