ন্যূনতম সার্বজনীন আয়

সার্বজনীন ন্যূনতম আয় ইউ বি আই প্রসঙ্গটি নিয়ে ভারতে অর্থনৈতিক পরীক্ষা নিরীক্ষা চলছে। এখন প্রশ্ন হল আগামী বছরগুলিতে এই সুবিধা দেশের সব মানুষকেই দেওয়া হবে না কি নিদির্ষ্ট কিছু মানুষকে। মূলতঃ ইউ বি আই এক জনকল্যাণমূলক ব্যবস্থা যার আওতায় জনসাধারণের জীবন যাত্রার একটি ন্যূনতম মান সুনিশ্চিত করতে সকল নাগরিককে রাষ্ট্র ভর্তুকি সহায়তা দেবে। ইউ বি আই ধারণাটি প্রথম ব্যক্ত করেন ব্রিটেনের চিন্তাবিদ স্যার টমাস মুর। পরে এই ধারণাটি জনপ্রিয়তা লাভ করে মার্কিন বিপ্লবী ও চিন্তাবিদ টমাস পেইনের হাত ধরে।

উল্লেখ করা যেতে পারে তেলেঙ্গনা সরকার গতবছর কৃষক বন্ধু নামে একটি যোজনা চালু করে যাতে জমির মালিকানা অনুযায়ী সব কৃষকের জন্য একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ আয় বরাদ্দ করা হবে। ইতিমধ্যে সিকিম সরকারও ঐ রাজ্যের প্রতিটি পরিবারের জন্য ন্যূনতম সার্বজনীন আয়ের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। এর পর আসে ওড়িষা রাজ্যের প্রসঙ্গ, এখানকার সরকারও রাজ্যের সমস্ত গরীব কৃষকদের এই সুবিধার আওতায় আনা হবে বলে জানিয়েছে।

দেশের ১.৩ বিলিয়ন মানুষের সকলকে যদি এই সুবিধা দিতে হয় তবে স্বাভাবিকভাবেই প্রয়োজন হবে বিশাল অংকের অর্থের যা ভারতীয় অর্থ ব্যবস্থার এই সময়ে  সংস্থান করা প্রায় অসম্বব। উল্লেখ্য দেশের আসন্ন সাধারণ নির্বাচনের ঠিক আগেই সরকার এবং বিরোধী পক্ষ উভয়েই বিভিন্ন ভাবে এই সুবিধার প্রতিশ্রতি দিচ্ছে।

ভারতের ক্ষেত্রে ইউ বি আইএর ধারণাটি প্রথম  উল্লেখ করেন প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদ অরবিন্দ সুব্রাহ্মনিয়ান ২০১৬-১৭র অর্থনৈতিক সমীক্ষা রিপোর্টে। প্রসঙ্গত উল্লখ করা যায়, এই অর্থনৈতিক সমীক্ষা রিপোর্ট সরকার প্রতিবছর সাধারণ বাজেটের প্রাক্কালে প্রকাশ করে থাকে যাতে আগামী বছরে দেশের অর্থনৈতিক হাল হকিকত তুলে ধরা হয়। এই বিষয়ে তাঁর আরেকটি পরামর্শ হল দেশের ধনী দরিদ্র নির্বিশেষে সব প্রাপ্ত বয়স্ক এবং শিশুর জন্য একটি অভিন্ন নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ সহায়তা ব্যবস্থা।

সুব্রাহ্মনিয়ান তার অর্থনৈতিক সমীক্ষার পর ‘অস্থায়ী ন্যূনতম সার্বজনীন গ্রামীণ আয়’ শীর্ষক পত্র যৌথভাবে রচনা করেছেন। তাঁদের বক্তব্য হল দেশের প্রতিটি পরিবারকে মাসিক ১৫০০টাকার ন্যূনতম আয়ের সংস্থান করার জন্য দেশকে তার জি ডি পির ১.৩ শতাংশ ব্যয় করতে হবে।

ভারতই প্রথম এই ধরণের পদক্ষেপের কথা চিন্তা করে নি। অন্যান্য দেশও সম্প্রতি এই ধারণা নিয়ে পরীক্ষা নিরীক্ষা চালিয়েছে। কৌতুক শিল্পী বেপে গ্রিলোর নেতৃত্বে ইতালীতে এই ধারণা আসে, তখন তাকে বলা হয় নাগরিকদের আয় যা ন্যূনতম সার্বজনীন আয়ের তুলনায় অপেক্ষাকৃত কম নমনীয় সংস্করণ। এতে সংস্থান রাখা হয়, যে সব ইতালীয় পরিবারের বার্ষিক আয়  ৯,৩৬০ ইওরোর কম তারাই এই সুবিধা পাবে।

ফিনল্যান্ডও তিন বছর আগে অনুরূপ পরীক্ষা চালায়, তবে ব্যর্থ বলে গত বছর তারা এটি বর্জন করেছে। এই ব্যর্থতার কারণ হল সেখানে আগে থেকেই উচ্চ মানের নিঃশুল্ক শিক্ষা, স্বাস্থ্য পরিচর্যা, আবাসন এবং বেকার ভাতার ব্যবস্থা রয়েছে। এটি অপ্রয়োজনীয় বলে মনে হয়েছে।

১৯৬০এর দশকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ক্যানাডায় কল্যাণমূলক ব্যবস্থা নিয়ে তুমুল বিতর্ক দেখা যায়, সেখানে অন্যান্য বিষয়ের সঙ্গে ন্যূনতম আয় নিয়েও কথা হয় এবং তা জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। তখন  মার্কিন রাষ্ট্রপতি নিক্সন ১৯৬৯এ নেতী বাচক আয় করেরও প্রস্তাব করেন, অর্থাৎ দরিদ্র নাগরিকদের মাসিক ভর্তুকি দেওয়া হবে। বিলে চার জনের প্রতি পরিবারকে বছরে ১৬০০ ডলারের গ্যারান্টি দিতে চাওয়া হয়।

গবেষকরা দেখেছেন ন্যূনতম আয় নিশ্চয়তার ফলে ব্যক্তির কাজ করার ইচ্ছার ওপর কোনো প্রভাব পড়ে না এবং তদানিন্তন মার্কিন সরকারের পক্ষে এটা তেমন ব্যয় সাপেক্ষও নয়।

ইউ বি আই এর অনেক সুবিধা থাকলেও বাস্তবিক চ্যালেঞ্জও কম নয়। ইউ বি আই এর সাফল্যের জন্য একটি স্বচ্ছ এবং নিরাপদ আর্থিক ব্যবস্থা খুব গুরুত্বপুর্ণ যেখানে সকলের প্রবেশাধিকার রয়েছে। অন্যভাবে বলা যায়, বিতরণ প্রণালীর দক্ষতার ওপর ইউ বি আই এর সাফল্য নির্ভর করে। (মূল রচনাঃ জয়ন্ত রায় চৌধুরী)