ভারত – মরক্কো সম্পর্ক

উত্তর আফ্রিকার সঙ্গে ভারতের সম্পর্কে ঘনিষ্ঠতা বৃদ্ধির অঙ্গ হিসেবে পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজ মরক্কো সফরে গেলেন। ভারতের কোনও পররাষ্ট্রমন্ত্রীর এই প্রথম মরক্কো সফর। পরিবর্তিত ভূ- রাজনৈতিক পরিস্থিতির প্রেক্ষিতে মরক্কোর সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক কৌশলগত অংশীদারিত্ব মজবুত করার লক্ষ্যেই  ছিল শ্রীমতী স্বরাজের এই সফর। আফ্রীকি দেশগুলির সামনে সন্ত্রাসবাদের বিপদ সহ যে বিভিন্ন চ্যালেঞ্জ রয়েছে, সেগুলির মোকাবিলার প্রশ্নে পারস্পরিক সহযোগিতা বৃদ্ধির ক্ষেত্রে মরক্কো এক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।

এই অঞ্চলে  আফ্রিকী সিংহ নামে সুপরিচিত মরক্কো সন্ত্রাসবাদ সহ যাবতীয় চরমপন্থী কার্যকলাপ নিয়ন্ত্রণে এক অতি সক্রিয় উদ্যোগ নিয়েছে। সন্ত্রাসবাদের মোকাবিলায় মরক্কো একটি বহুপাক্ষিক নীতিকৌশল রচনার ওপর জোর দিয়ে আসছে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি মরক্কোর এই ভুমিকাকে স্বীকৃতি দিয়েই ২০১৫’র আগস্টে তাঁর সংযুক্ত আরব আমীরশাহী- UAE সফরের সময় দিল্লি- UAE- মরক্কো এই তিনটি দেশের জোটকে নতুন দিল্লির ‘পূবে সক্রিয় হও’ নীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ বলে বর্ণনা করেছিলেন। রাষ্ট্রসংঘে প্রধানত মরক্কোর উদ্যোগের কারণেই  সংঘবদ্ধভাবে সন্ত্রাসবাদ দমনের উদ্দেশ্যে সন্ত্রাসবাদ বিরোধী মৈত্রী গোষ্ঠী গঠিত হয়, ভারত যার এক সক্রিয় সদস্য দেশ। এ ছাড়া ধর্মীয় মৌলবাদী ভাবাদর্শের প্রভাব প্রতিরোধে এই দেশ ইসলাম ধর্মের যে একটি উদারনৈতিক চিন্তাধারা অনুসরণ তা এক তাৎপর্যপূর্ণ ইংগিত বহন করছে।

মরক্কোর রাজা ষষ্ঠ মহম্মদ ও প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে একটি কৌশলগত অংশীদারিত্বের স্তরে উন্নীত করার প্রয়োজনের ওপর জোর দেন। উভয় দেশের জনগণের বর্ধিত আশা আকাঙ্ক্ষা পূরণের সুযোগ সৃষ্টির লক্ষ্যে দুটি দেশের বিদেশমন্ত্রী স্তরে বিভিন্ন যৌথ প্রকল্প নিয়ে আলোচনার জন্য একটি কর্ম সমিতি গঠনে দুই নেতা একমত হন।

ভারত- মরক্কো কৌশলগত অংশীদারিত্বকে মজবুত করার লক্ষ্যে মরক্কোর রাজধানী রাবাতে  পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজ ও সে দেশের বিদেশমন্ত্রী নাসের বৌরিতার মধ্যে প্রতিনিধি পর্যায়ে আলোচনার পর চারটি সমঝোতা স্মারকপত্র –MOU  স্বাক্ষর করা হয়। এগুলির মধ্যে আছে সন্ত্রাসদমন বিষয়ক একটি যৌথ কর্মী গোষ্ঠী গঠন, গৃহ নির্মাণ সহযোগিতা, ব্যবসায়িক ভিসা জারি সংক্রান্ত সহযোগিতা ও যুব বিষয়ে সহযোগিতা। পররাষ্ট্রমন্ত্রী  মরক্কোর প্রধানমন্ত্রী সাডেদাইন ওথমানি’র সঙ্গে বৈঠকে মিলিত হন। শ্রীমতী স্বরাজ, মরক্কোর রাজা ষষ্ঠ মহম্মদ’কে লেখা প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির একটি চিঠি সে দেশের বিদেশ মন্ত্রীর হাতে তুলে দেন।

শ্রীমতী স্বরাজ মরক্কোর কর্তৃপক্ষের সঙ্গে প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা, সন্ত্রাসদমন বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সহ দ্বিপাক্ষিক স্বার্থ জড়িত নানা বিষয়ে সহযোগিতা মজবুত করার পন্থা পদ্ধতি নিয়ে আলোচনা করেন। তিনি রাবাতে ভারতীয় সম্প্রদায়ের একটি সভায় ভাষণ দেন; এবং দুটি দেশের মধ্যে যুগ প্রাচীন  সাংস্কৃতিক সম্পর্ককে ক্রমশ অধিক মজবুত করার লক্ষ্যে উপযুক্ত ভূমিকা পালনের জন্য তাঁদের আহ্বান জানান।

অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে দুটি দেশের মধ্যে সহযোগিতা বৃদ্ধির বিপুল সম্ভাবনা রয়েছে। খনিজ সম্পদ ও রাসায়নিক পণ্য ক্ষেত্রে মরক্কো  ভারতের সামনে এক বিশাল বাজার হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে। ভারত থেকে ওই দেশে রপ্তানি পণ্যের মধ্যে আছে সুতো, সিনথেটিক ফাইবার, পরিবহণ উপকরণ, ওষুধ, কৃষি সরমজাম, মশলা ও রাসায়নিক পণ্য ।

সামগ্রিক বিষয়টি বিবেচনা করলে দেখা যাচ্ছে, পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজের মরক্কো সফর দ্বিপাক্ষিক সহযোগিতা ক্ষেত্রে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করল। পররাষ্ট্রমন্ত্রীর মরক্কো সফরে সমগ্র উত্তর আফ্রিকা অঞ্চলের সঙ্গে সম্পর্ক আরও নিবিড় করার লক্ষ্যে ভারতের আন্তরিক আগ্রহেরও স্পষ্ট প্রতিফলন ঘটল। (মূল রচনাঃ-ডঃ মীনা সিং রায়)