পাকিস্তানের নিছক দায়সারা প্রচেষ্টা

পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান পুলওয়ামা সন্ত্রাসবাদী আক্রমণের  পিছনে ইসলামাবাদের হাত থাকার অভিযোগ অবশেষে অস্বীকার করার একটা ক্ষীণ চেষ্টা করলেন। ভারতীয় নিরাপত্তা কর্মীদের ওপর ওই বর্বরোচিত হামলার ঘটনার, তাও আবার এক সপ্তাহ পর পাক প্রধানমন্ত্রীর এই প্রচেষ্টা আন্তর্জাতিক মহলের কাছে অত্যন্ত সংগত কারণেই নিছক দায়সারা বলেই প্রমাণিত হল।

সন্ত্রাসবাদ যে পাকিস্তানের রাষ্ট্রনীতিরই  অঙ্গ, আন্তর্জাতিক মহল ইতিমধ্যেই  তার সংশয়াতীয় প্রমাণ পেয়েছে। বিশ্ব নেতৃবর্গের মধ্যে মার্কিন রাষ্ট্রপতি ডোনাল্ড ট্রাম্প হলেন প্রথম নেতা যিনি  এই বর্বরোচিত হামলার নিন্দা করলেন। পি-৫ ভুক্ত দেশগুলিও এর নিন্দা করল। তবে চীন তার নিজস্ব কৌশলগত স্বার্থেই এই হামলায় জড়িত জঙ্গি গোষ্ঠী- জয়েশ-এ-মহম্মদ-JeM’এর নাম উল্লেখ করা থেকে বিরত থাকল।

ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রক পুলওয়ামা সন্ত্রাসবাদী আক্রমণের ঘটনা প্রসঙ্গে পাক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের বক্তব্যের কড়া জবাব দিল।

নতুন দিল্লি বলেছে, ভারতীয় নিরাপত্তা বাহিনীর ওপর এই হামলাকে সন্ত্রাসবাদী আক্রমণ  হিসেবে স্বীকার করা তো দূরের কথা,  মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধের এই ঘটনার নিন্দা  বা শহীদদের পরিবারবর্গের প্রতি মর্মবেদনা ব্যক্ত করতে পাক প্রধানমন্ত্রীর অনীহা সমগ্র বিশ্ববাসী প্রত্যক্ষ করল।  তবে পাক প্রধানমন্ত্রীর এই আচরণে ভারত যে আদৌ বিস্মিত নয়,  নতুন দিল্লি তা জানিয়ে দিল। কারণ, সন্ত্রাসবাদী তৎপরতা ও ইসলামাবাদের মধ্যে যোগসূত্রের অভিযোগ পাকিস্তান এ পর্যন্ত বরাবরই অস্বীকার করে আসছে। জঙ্গি গোষ্ঠী- জয়েশ-এ-মহম্মদ এই হামলার জন্য দায়ী বলে দাবি করলেও পাকিস্তান তাতে কোনও গুরুত্বই দেয় নি। ভারত বলেছে, উপযুক্ত প্রমাণ দিলে এই ঘটনার তদন্ত করা হবে বলে ইমরান খানের প্রস্তাবটিও অন্তঃসারশূন্য। ২০০৮’এর ২৬’এ নভেম্বরের মুম্বাই জঙ্গি হামলার বিষয়ে সন্দেহাতীত  প্রমাণ দেওয়া  সত্বেও এ পর্যন্ত এই মামলার কোনই অগ্রগতি হয় নি। পাঠানকোট বিমানঘাঁটি আক্রমণের ঘটনাটিও অনুরূপ উদাহরণ।

ইমরান খান তাঁর দেশকে একটি নতুন পাকিস্তান হিসেবে গড়ে তোলার সংকল্প ব্যক্ত করলেও তাঁর সরকারের মন্ত্রীদেরই দেখা যাচ্ছে হাফিজ সঈদের মত সন্ত্রাসবাদীদের সঙ্গে একই মঞ্চে, যাকে রাষ্ট্রসংঘ নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে।

পাক প্রধানমন্ত্রী ভারতের সঙ্গে আলোচনার আহ্বান জানিয়ে সন্ত্রাসবাদের বিষয়ে কথা বলার জন্য আগ্রহ ব্যক্ত করেছেন, অপরদিকে তার জবাবে একমাত্র সন্ত্রাস ও হিংসা মুক্ত পরিবেশেই এই আলোচনা সম্ভব বলে ভারত বার বার তার অবস্থান স্পষ্ট করেছে। পাকিস্তান নিজেই সন্ত্রাসবাদের শিকার বলে সহানুভূতি আদায়ের চেষ্টা করলেও আসলে দেশটি যে সন্ত্রাসবাদের আশ্রয়স্থল, তা আন্তর্জাতিক মহলের কাছে সুবিদিত।

ভারতের আগামী সাধারণ নির্বাচন ও পুলওয়ামা জঙ্গি হামলার মধ্যে যোগসূত্র আবিষ্কার করে পাক প্রধানমন্ত্রীর কটাক্ষকে নতুন দিল্লি দুর্ভাগ্যজনক আখ্যা দিয়ে বলেছে, ভারতের গণতন্ত্র সারা বিশ্বের সামনে এক উজ্জ্বল উদাহরণ স্বরূপ,যার মূল্য পাকিস্তানের  কখনই বোধগম্য হবে না।

অপরদিকে পাকিস্তানের গণতন্ত্রের যে কোনও মজবুত ভিত্তি নেই,তার প্রমাণ বার বার পাওয়া গেছে।  দেশটির আত্মপ্রকাশের পর এ পর্যন্ত অর্ধেকেরও বেশি সময়  সামরিক শাসনের আওতায় থেকেছে। পররাষ্ট্র ও প্রতিরক্ষা নীতিতে রাজনৈতিক নেতৃত্বের কোনও নিয়ন্ত্রণ নেই। ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক নির্ধারণেও দেশটির রাজনৈতিক কর্তৃপক্ষ সামরিক কর্তৃপক্ষের প্রভাব কখনই কাটিয়ে উঠতে পারে নি। কাজেই ইমরানের খানের কর্তব্য, ভারতকে উপদেশ দেবার আগে নিজের দেশের পরিস্থিতি বিশ্লেষণ।

এদিকে সর্বশেষ ঘটনাক্রমে ফ্রান্স ও ব্রিটেনের নেতৃত্বে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় জয়েশ-এ-মহম্মদ-JeM’এর প্রধান মাসুদ আজাহারকে আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদী হিসেবে  ঘোষণার জন্য রাষ্ট্রসংঘ সাধারণ সভায় একটি প্রস্তাব উত্থাপনের লক্ষ্যে উদ্যোগ নিয়েছে।  পাকিস্তানের ঘনিষ্ঠ দেশ সৌদি আরবও যে কোনও দেশের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসবাদকে ব্যবহার করার নীতি ত্যাগ করতে সকল রাষ্ট্রশক্তির প্রতি আহ্বান জানিয়েছে।

আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে আর বিভ্রান্ত না করে পাকিস্তানকে পুলওয়ামা সন্ত্রাসবাদী হামলায় জড়িতদের খুঁজে বের করতে ও সে দেশের ভূখণ্ড থেকে পরিচালিত সব জঙ্গি গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে অবিলম্বে বিশ্বাসযোগ্য ও নির্ণায়ক ব্যবস্থা নিতে হবে। এবং তা হলেই দেশটি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের আস্থা ফিরে পাবার আশা করতে পারবে। (মূল রচনাঃ- কৌশিক রায়)