ভারত- সৌদি আরব সম্পর্ক এক নতুন উচ্চতায়

এ সপ্তাহে সৌদি আরবের যুবরাজ মুহম্মদ বিন-সালমান- বিন –আবদুল- আজিজ -আল –সৌদ’এর দু দিনের নতুন দিল্লি সফরে ভারতের সঙ্গে ওই দেশের সম্পর্কে এক নতুন মাত্রা সংযোজিত হল।

পদাধিকার বলে সৌদি আরবের মন্ত্রী পরিষদের উপসভাপতি এবং  প্রতিরক্ষা মন্ত্রী সৌদি যুবরাজের এই প্রথম ভারত সফরে তাঁর সঙ্গে আসেন কয়েকজন মন্ত্রী, সরকারী আধিকারিক ও একটি ব্যবসায়িক প্রতিনিধিদল।

এ দেশ সফর কালে সৌদি যুবরাজ প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে প্রতিনিধি পর্যায়ে পারস্পরিক স্বার্থ জড়িত বহু বিষয়ে আলোচনা করেন। তিনি পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজ ও  রাষ্ট্রপতি রাম নাথ কোবিন্দের সঙ্গেও দেখা  করেন। শ্রী মোদির সঙ্গে আলোচনার পর জারি করা একটি যৌথ বিবৃতিতে নতুন দিল্লি সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম ও কৌশলগত বিনিয়োগ ক্ষেত্রে সহযোগিতা বৃদ্ধির অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছে। সৌদি যুবরাজও সন্ত্রাস বিষয়ক তথ্য বিনিময় সহ যে কোনও ধরণের সন্ত্রাসবাদ দমনে তাঁর দেশের পক্ষ থেকে ভারতকে সক্রিয় সহযোগিতার আশ্বাস দেন।  দুটি দেশ সন্ত্রাসবাদে প্রশ্রয়দানকারী দেশগুলির ওপর চাপ সৃষ্টির বিষয়েও একমত হয়েছে।

দুই নেতা দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য সহযোগিতা বৃদ্ধির সম্ভাবনাও খতিয়ে দেখেন। সৌদি নেতা বলেন, কৃষি ও তেজঃশক্তি ক্ষেত্রে দুটি দেশের একটি অভিন্ন লক্ষ্য রয়েছে। তিনি বলেন, পেট্রো রসায়ন ক্ষেত্রেও বাণিজ্যিক সম্পর্ক বিগত দিনগুলিতে মজবুত হয়েছে। এবং তাঁর দেশ এই উৎপাদন ক্ষেত্রে ২০১৬ থেকে ভারতে ৪,৪০০ কোটি মার্কিন ডলার লগ্নী করেছে।

দুটি দেশের মধ্যে বিভিন্ন ক্ষেত্রে পাঁচটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। এগুলির মধ্যে আছে ২০১৫ সালে স্থাপিত ভারতের জাতীয় লগ্নী ও পরিকাঠামো তহবিলে বিনিয়োগ সংক্রান্ত একটি সমঝোতা স্মারকপত্র-মৌ, পর্যটন সহযোগিতা চুক্তি ও আবাসন ক্ষেত্রে সহযোগিতা চুক্তি। এ ছাড়া দুই পক্ষ, রাজনীতি, নিরাপত্তা ও অর্থনীতি সহ বিভিন্ন বিষয়ে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কে অগ্রগতি নিরীক্ষণ করতে একটি ‘কৌশলগত অংশীদারিত্ব পরিষদ’ গঠনে সম্মত হয়েছে।

২০০৬ সালে তৎকালীন সৌদি রাজা কিং আবদুল্লার ভারত সফরের সময় থেকে নতুন দিল্লি ও রিয়াদের মধ্যে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কে ঘনিষ্ঠতা বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০০৬’এর দিল্লি ঘোষণাপত্র ও ২০১০’এর রিয়াদ ঘোষণাপত্র দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে অধিক শক্তিশালী করেছে।

২০১৪’র মে মাস থেকে রাজা সালমান ও যুবরাজ মহম্মদ বিন সালমানের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির একাধিক বার সাক্ষাৎ হয়েছে। ২০১৬’র এপ্রিলে শ্রী মোদি  সৌদি আরব সফরে যান। ২০১৮’র নভেম্বরেও আর্জেন্টিনায় জি-২০ শিখর সম্মেলনের পাশাপাশি দুই নেতা বৈঠক করেন। দুটি দেশের মধ্যে নিয়মিত বৈঠক ও আলাপ আলোচনার কারণেই সম্পর্ক মজবুত হয়ে উঠছে। যুগপ্রাচীন ঘনিষ্ঠ সম্পর্কে আবদ্ধ ভারত ও সৌদি আরবের মধ্যে সাম্প্রতিক বছরগুলিতে তেজঃশক্তি নিরাপত্তা, বাণিজ্য ও বিনিয়োগ, পরিকাঠামো, প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা সহ বহু ক্ষেত্রে সহযোগিতা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। উল্লেখ্য, প্রায় ২৭ লাখ ভারতীয় সৌদি আরবে বসবাস করেন ও ওই দেশের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।

সৌদি যুবরাজ প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির অনুরোধে সাড়া দিয়ে ভারতের প্রতি শুভেচ্ছার নিদর্শন হিসেবে তাঁর দেশের বিভিন্ন জেলে বন্দী ৮৫০ জন ভারতীয় নাগরিকের মুক্তির আদেশ দিয়েছেন। ভারত থেকে হজ তীর্থযাত্রীদের জন্য কোটার আওতায় তীর্থযাত্রীদের জন্য সংখ্যা বাড়িয়ে দু লাখ ধার্য করা হল বলে সৌদি যুবরাজ ঘোষণা করেছেন। নতুন দিল্লিও সৌদি নাগরিকদের জন্য ই-ভিসার সুবিধা দানের সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

শ্রী মোদি ও মহম্মদ বিন সালমান এ মাসের ১৪ তারিখে জম্মু ও কাশ্মীরের পুলওয়ামায় নিরাপত্তা কর্মীদের ওপর সন্ত্রাসবাদী আক্রমণের ঘটনার কঠোর ভাষায় নিন্দা করেন।উভয় নেতা, ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে সর্বাত্মক আলোচনা প্রক্রিয়া আবার শুরু করার জন্য অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টির প্রয়োজনের বিষয়ে একমত হয়েছেন।

দুটি দেশের মধ্যে ক্রমবর্ধমান রাজনৈতিক যোগাযোগ ও কৌশলগত সহযোগিতার কারণে পশ্চিম এশিয়ায় সৌদি আরব ভারতের এক শীর্ষস্থানীয় অংশীদর দেশ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে। এই সব কারণেই প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি সৌদি আরবকে একবিংশ শতাব্দীর অন্যতম মূল্যবান সহযোগী দেশ হিসেবে অভিহিত করেছেন।

(মূল রচনা – ডঃ মুহম্মদ মুদাসসির কামার)