ভারতের কৌশলগত ক্ষেত্রে ইওরোপের প্রতি নতুন অগ্রাধিকার

ইওরোপের প্রতি ভারতের নতুন গুরুত্বের অংগ হিসেবে পররাষ্ট্রমন্ত্রী শ্রীমতী সুষমা স্বরাজ বুলগেরিয়া এবং স্পেন সফর করেন। একে এই সব দেশের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক মজবুত করার প্রয়াস বলে দেখা যেতে পারে। সম্প্রতি রাষ্ট্রপতি রাম নাথ কোবিন্দ এবং প্রধান মন্ত্রী মোদি যথাক্রমে সোফিয়া এবং মাদ্রিদে সফর করেছেন। ভারতের কৌশলগত জাতীয় উপলব্ধির ক্ষেত্রে এটি সামগ্রিক ভারতীয় নীতিকৌশলের বিষয়ে নতুন করে অগ্রাধিকার স্থির করার প্রয়াস।

উল্লেখ করার বিষয় হল ইওরোপ, এশিয়া এবং ভূমধ্যসাগর অঞ্চলে বুলগেরিয়া এবং স্পেনের গুরুত্বপূর্ণ ভৌগলিক অবস্থান এবং তাদের নেটো সদস্যতার ফলেই এই সব দেশের সঙ্গে ভারতের বহুমুখি সম্পর্কের প্রতিফলন ঘটেছে। ইওরোপীয় সংঘের সদস্যপদ ভারতের মত অংশীদার দেশকে কেবলমাত্র ই ইউ বাজারেই প্রবেশাধিকারই দেয় না, এই সংগঠনের কূটনৈতিক উন্নয়ন, অর্থনৈতিক বিশেষজ্ঞ জ্ঞান এবং আধুনিক প্রযুক্তির সুবিধাও দিয়ে থাকে ।

বুলগেরিয়া এবং স্পেনের বিদেশ মন্ত্রীদের সঙ্গে শ্রীমতী স্বরাজের আলচনার বিষয়বস্তু ছিল মূলতঃ দ্বিপাক্ষিক অংশীদারিত্বে কৌশলগত এবং  অর্থনৈতিক স্তম্ভ সংযোজন। প্রবাসীদের উন্নয়নের প্রাতিষ্ঠানিক ভারতীয় দৃষ্টিভঙ্গীর অংগ হিসেবে পররাষ্ট্রমন্ত্রী এই সব দেশের ভারতীয় সম্প্রদায়ের সঙ্গেও আলোচনা করেন।

ভারত এবং ইওরোপের স্বার্থ বৃহত্তর আন্তর্জাতিক এবং দ্বিপাক্ষিক বিষয়ের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ। উভয়েই বহুপাক্ষিক এবং নিয়মভিত্তিক বিশ্ব ব্যবস্থার প্রতি সংকল্পবদ্ধ এবং সেটি তখনই প্রাসঙ্গিক যখন বিশ্বায়নের ব্যাখ্যা হচ্ছে নেতীবাচকভাবে এবং বিভিন্ন দেশ কেবল তাদের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে ভাবছে, সেই সঙ্গে নানান বাণিজ্যিক প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছে। সেই কারণেই বিশ্বায়নের সংরক্ষণ এবং বৃহত্তর আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের উন্নয়ন অভিন্ন লক্ষ্য হয়ে উঠেছে। এছাড়া, ভারতের ইতিবাচক অর্থনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গী এবং বিশ্ব মঞ্চে অধিক গঠনমূলক ভূমিকা পাওয়ার বাসনা, ট্রান্স আটলান্টিক জোটে রাষ্ট্রপতি ট্রাম্প-নেতৃত্বাধীন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ফাটল সৃষ্টির প্রয়াসের প্রেক্ষিতে ই ইউএর নতুন বিশ্বাসযোগ্য অংশীদার অন্বেষণের দ্বারা প্রতিপালিত হতে পারে।

অনুরুপভাবে, সন্ত্রাসবাদ, সাইবার নিরাপত্তা, অনুপ্রবেশ এবং জলবায়ু পরিবর্তনের মত চিরাচরিত এবং অচিরাচরিত নিরাপত্তা আশংকা যা উভয় পক্ষকে প্রতিকূলভাবে প্রভাবিত করে সে সব অব্যাহত রয়েছে, তাই এর সমাধানে আন্তর্জাতিক বহুপাক্ষিক দৃষ্টিভঙ্গীর প্রয়োজন। বুলগেরিয়া এবং স্পেন পুলওয়ামায় সাম্প্রতিক জঙ্গী আক্রমণের নিন্দা করেছে এবং রাষ্ট্রসঙ্ঘ নিরাপত্তা পরিষদে ভারতের সদস্যপদের প্রতি সমর্থন ব্যক্ত করেছে। সোফিয়া এবং মাদ্রিদের সঙ্গে ভারতের বর্তমান প্রতিরক্ষা এবং নিরাপত্তা সংক্রান্ত সমঝোতা স্মারকপত্রে এই কৌশলগত স্বার্থের সমন্বয় প্রতিফলিত হয়েছে।

২০১৫ সালে নেপালে ভূমিকম্পের সময় স্পেনের নাগরিকদের উদ্ধারে নতুন দিল্লীর ভূমিকার স্বীকৃতি হিসেবে শ্রীমতী স্বরাজকে সম্মানীয় গ্রান্ড ক্রস অফ অর্ডার অফ সিভিল মেরিট প্রদান করা হয়। এতে মানবিক সহায়তা এবং বিপর্যয় ত্রাণের ক্ষেত্রে দ্বিপাক্ষি সহযোগিতার পথ প্রশস্ত হয়েছে।

বুলগেরিয়া এবং স্পেনে   সাংস্কৃতিক অভিন্নতা, ইন্দোলজি এবং যোগের জনপ্রিয়তায় সাংস্কৃতিক সাজুয্য প্রতিফলিত হয়েছে যা দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ভীতকে আরো মজবুত করে। শ্রীমতী স্বরাজের আলোচনার মূল বিষয়ের মধ্যে ছিল পর্যটন, জনগণের মধ্যে সম্পর্ক গড়ে তুলতে সাংস্কৃতিক সংযোগ বাড়ানো।

স্পেন এবং বুলগেরিয়া  অসামরিক এবং সামরিক উভয় ক্ষেত্রে অভিনবত্ব এবং আধুনিক প্রযুক্তি উন্নয়নে বিশেষজ্ঞ। প্রধানমন্ত্রী মোদির ভারতীয় অর্থনীতিকে আধুনিকভাবে গড়ে তোলার এবং জ্ঞান ভিত্তিক সমাজ গঠনের লক্ষ্যের সঙ্গে এর যথেষ্ট মিল রয়েছে। তাই স্মার্ট সিটি, মেক ইন ইন্ডিয়া, স্বচ্ছ ভারত এবং সাগরমালার মত প্রকল্পে ইওরোপীয় কোম্পানীগুলি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে।

এই অংশীদারিত্বের সম্ভাবনা এবং গুরুত্ব অপরিসীম। শ্রীমতী সরাজের সফর ইওরোপীয় দেশগুলির সঙ্গে বর্তমান ভারতীয় কৌশলগত সম্পর্ককে আরো নিবিড় করবে এতে  সন্দেহের কোনো অবকাশ নেই।