কৌশল সুস্পষ্ট করার প্রয়োজন চীনের

চীনের সাম্প্রতিক বিদেশ নীতি সম্পর্কিত পদক্ষেপ বিভিন্নভাবে তাদের সীমাবদ্ধতা ও অস্বচ্ছতাকে সামনে এনেছে। ‘বেল্ট  অ্যান্ড রোড প্রয়াস’-এর বিষয়ে শ্রীলঙ্কা বা মালয়েশিয়ার মত চীনের শরীক দেশের ক্রমবর্ধমান উদ্বেগ ও দ্বিধা বিনিয়োগ ও যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে তোলার ক্ষেত্রে চীনের দ্বিচারীতাকে স্পষ্ট করেছে; এবং অন্যদিকে চীন-মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বাণিজ্য যুদ্ধ চীনের অর্থনীতিকে করেছে যথেষ্ট দুর্বল ও তাদের কাঠামোগত সীমাবদ্ধতাকে সামনে নিয়ে এসেছে।

এছাড়াও, চীন যেখানে সেদেশে উইঘুর সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের নেতাদের সন্ত্রাসবাদী অ্যাখ্যা দিতে কোনো সুযোগই হাতছাড়া করে নি, সেখানে তারাই আন্তর্জাতিকভাবে চিহ্নিত জঙ্গী মাসুদ আজহারকে সন্ত্রাসবাদী বলতে অস্বীকার করে ভারত ও বৃহত্তম আন্তর্জাতিক  সম্প্রদায়ের সিদ্ধান্তকে মেনে নেয় নি। আজহার ২৬/১১র জঙ্গী হানার অন্যতম মূল ষড়যন্ত্রকারী এবং সাম্প্রতিক পুলওয়ামা জঙ্গী হামলায় সেই জঙ্গী সংগঠন দায়ও স্বীকার করেছে। এই সব বিষয় একসঙ্গে দেখলে এটা পরিস্কার হয় যে, ভারত সহ তার প্রতিবেশীদের উদ্বেগের বিষয়টিকে চীন আমলই দিতে চায় না।  চীনের বিদেশ নীতি কীভাবে আন্তর্জাতিক স্তরে স্বীকৃত নিয়মকানুনের বিরুদ্ধাচরণ করে চলেছে তাও এই সব বিষয় থেকে পরিস্কার হয়।

রাষ্ট্রপতি শি চিংফিং-এর অন্যতম কর্মসূচী চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডোরের ক্রমবর্ধমান অনিশ্চিত পরিস্থিতি পাক-অধিকৃত কাশ্মীরের মধ্যে দিয়েই গিয়েছে। এখানেই রয়েছে আর একটি বিষয়; এই অর্থনৈতিক করিডোর আসলে  চীন-পাকিস্তান সহযোগিতার অঙ্গ এবং বন্ধুত্বপূর্ণ প্রকল্প হিসেবে আখ্যা দিয়ে চীন সেখানে দুই দেশের মধ্যে রেল, সড়ক ও জ্বালানী করিডোর বানাতে সম্মত হয়েছে যা আদতে পাক-অধিকৃত কাশ্মীরের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে। ইসলামাবাদ ইতিমধ্যেই কয়েকশো কোটি ডলার ঋণ নিয়েছে এবং এর ফলে পাকিস্তানের অর্থনীতি ক্রমেই ঋণ জর্জরিত হয়ে পড়েছে। একই ধরণের উদ্বেগের সম্মুখীন এশিয়ার আরও কয়েকটি দেশ। চীনের ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড’ প্রকল্পের সামনে রয়েছে এক শক্তিশালী আদর্শগত চ্যালেঞ্জ যা আসলে তৈরি হয়েছে এই বিষয়ে স্বচ্ছতা ও বহুপাক্ষিক আলোচনার অভাবের কারণেই।

দক্ষিণ চীন সাগর সমস্যা চীনের সামনে আরও একটি চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। ভারত-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের মার্কিন কম্যান্ডার অ্যাডমিরাল ফিল ডেভিডসন বলেন দক্ষিণ চীন সমুদ্রে চীন সামরিক সম্ভার বাড়াচ্ছে  এবং পূর্ব চীন সমুদ্র অঞ্চলে তার দাবিগুলি আরও জোরদার করে চলেছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ঐ অঞ্চলে চীনকে বে-আইনি কাজকর্ম ও আগ্রাসনী মনোভাব ছাড়ার আহ্বান করেছে কেননা এই মনোভাব কেবলমাত্র সমস্যাই সৃষ্টি করবে তা নয় একই সঙ্গে ঐ অঞ্চলের বিভিন্ন দেশের  সার্বভৌমত্বকেও ক্ষুণ্ণ করবে।

চীনের ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড’-এর প্রতি ইঙ্গিত করে অ্যাডমিরাল ডেভিডসন বলেন, “পেইচিং স্বল্প মেয়াদে সহজেই অর্থ দিচ্ছে, তবে এর সঙ্গে  অস্থিতিশীল ঋণ, স্বচ্ছতা হ্রাস, বাজার অর্থনীতির ওপর নিষেধাজ্ঞা এবং প্রাকৃতিক সম্পদ নিয়ন্ত্রণের সম্ভাব্য ক্ষতির মত বিষয় লুকিয়ে রয়েছে”।

দক্ষিণ চীন সমুদ্রে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র জাহাজ চালাবার বিষয়ে তার স্বাধীনতা প্রত্যাশা করে। স্বাধীনভাবে জাহজ চলাচলের জন্য ওয়াশিংটন ঐ অঞ্চলে তার সহযোগী দেশগুলির সাহায্যের আহ্বান জানিয়েছে।

এই বিষয়ে সম্ভাব্য প্রভাবগুলির কথা মাথায় রেখেই জাপান ও ভারতের মত দেশগুলির সঙ্গে  চীন সম্পর্ক স্থাপনের চেষ্টা করছে। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সঙ্গে উহানে রাষ্ট্রপতি শি চিংফিং-এর গতবছরের শীর্ষ বৈঠক তারই প্রতিফলন। ডোকলাম পরবর্তি সময়ে ভারত-সহযোগিতা বৃদ্ধি পেয়েছে। গত ডিসেম্বরে চীনের বিদেশ মন্ত্রী ওয়াং ই-র ভারত সফর দুই দেশের মধ্যে সাংস্কৃতিক সম্পর্ক মজবুত করার দিশায় এক পদক্ষেপ।

চীন-ভারত সম্পর্কের ক্ষেত্রে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কাঁটা হল রাষ্ট্র সঙ্ঘে পাকিস্তান ভিত্তিক ও পাকিস্তানের মদতপুষ্ট সন্ত্রাসবাদী নেটওয়ার্ককে নিষিদ্ধ করার বিষয়ে ভারতের প্রস্তাবে চীনের বারবার বাধা প্রদান এবং  ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা উদ্বেগকে সমর্থন করার বিষয়ে চীনের প্রস্তাব কতটা ত্রুটিযুক্ত তা এটি প্রতিফলিত করে।

কিন্তু উল্লেখযোগ্যভাবে, সম্প্রতি চীন রাষ্ট্র সঙ্ঘ নিরাপত্তা পরিষদে পুলওয়ামা জঙ্গী হামলার বিষয়ে কঠোর ভাষায় নিন্দা করার প্রস্তাবে অন্য দেশের  সঙ্গে একযোগে স্বাক্ষর করেছে। পুলওয়ামায় ঘৃণ্য ও বর্বরোচিত আত্মঘাতী হামলায় জয়েশ-এ মহম্মদ জঙ্গী গোষ্ঠীর নামও পেইচিং নিয়েছে।

বিশেষ করে যখন তারা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদী বাণিজ্য যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েছে এবং একই সঙ্গে  ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড প্রয়াসেও বিশ্বাসযোগ্যতা হারাচ্ছে, সেই আবহে নতুন দিল্লীর সঙ্গে সম্পর্কের যে উন্নতি হয়েছে সেটিকে নষ্ট করার চীনের পক্ষে বিচক্ষণতার কাজ হবে না।

[মূল রচনা- সানা হাশমি]