ট্রাম্প-কিম দ্বিতীয় শিখর বৈঠক

মার্কিন রাষ্ট্রপতি ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং উত্তর কোরিয়ার চেয়ারম্যান কিন জং-উন হ্যাননে দ্বিতীয় শিখর বৈঠকে মিলিত হলেন। তবে সিঙ্গাপুরে বৈঠকের মত নয়, যৌথ বিবৃতি জারী না করেই হ্যানয় বৈঠক সমাপ্ত হয়েছে। যদিও উভয় নেতা আন্তরিকতা বজায় রাখেন বলেই মনে হচ্ছে।

সিঙ্গাপুরে প্রথম বৈঠকের পর নেতারা চারটি গুরুত্বপূর্ন ঘোষণার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেন; সেগুলি হল শান্তি এবং সমৃদ্ধির জন্য নতুন সম্পর্ক গড়ে তোলা; স্থায়ী এবং স্থিতিশীল শান্তি ব্যবস্থা নির্মাণ করা, কোরিয় উপদ্বীপে সম্পূর্ণ পারমাণবিক নিরস্ত্রীকরণ এবং যুদ্ধ বন্ধী বিনিময়।

এর ব্যাখ্যা ভিন্ন ভিন্ন হতে পারে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র উত্তর কোরিয়ার পরমাণু নিরস্ত্রীকরণের কথা বলছে অথচ পিয়ং ইয়ং চায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র দক্ষিণ কোরিয়া থেকে কেবল  ৩০,০০০ সেনাই প্রত্যাহার করবে না-ঐ অঞ্চলে কোনো পরমাণু অস্ত্র বা ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র মোতায়েন থাকলে তাও সরিয়ে নিতে হবে-অন্য কথায় দক্ষিণ কোরিয়া এবং জাপানে তাদের সহযোগীদের সঙ্গে সম্প্রসারিত প্রতিরোধ। শ্রী ট্রাম্প সিঙ্গাপুর বা হ্যানয়ে এই সব পরামর্শের বিষয়ে কোনো প্রতিশ্রুতি দেন নি।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র চায় উত্তর কোরিয়ায় একটি সম্পূর্ণ এবং পরীক্ষাযোগ্য পারমাণবিক নিরস্ত্রীকরণ। উত্তর কোরিয়া ২০১৮র মে মাসে পাঙ্গে-রি পরমাণু স্থল তুলে দিয়ে সেই দাবী আংশিকভাবে মেনে নেয় এবং আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষমদের আমন্ত্রণ জানায়। তবে খবরে প্রকাশ পরমাণু ভান্ডার বৃদ্ধির জন্য তারা ফিসাইল সামগ্রির প্রক্রিয়াকরণ অব্যাহত রেখেছে।

কিম চান রাষ্ট্রসংঘের শাস্তি ব্যবস্থা প্রত্যাহার এবং কোরিয়া উপদ্বীপে ১৯৫০এর দশকে শুরু হওয়া শত্রুতার অবসান। রাশিয়া সহ নিরাপত্তা পরিষদের অন্যান্য সদস্যের সম্মতিতে পিয়ং ইয়ং এর ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপিত হয়, কিন্তু অধিক গুরুত্বপূর্ণ হল ১৯৬৩ সাল থেকে উত্তর কোরিয়ার সামরিক সহযোগী চীনও এতে সামিল হয়। তবে, চীন সমুদ্র অথবা সীমান্ত পথে উত্তর কোরিয়ায় অত্যাবশ্যক সামগ্রী সরবরাহ করে এই নিষেধাজ্ঞা  লঙ্ঘন করে বলে অভিযোগ করা হয়েছে।

নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের বিষয়ে কোনো রকম মতৈক্য ছাড়াই হ্যানয় বৈঠক শেষ হয় কারণ ট্রাম্প উত্তর কোরিয়ার পরমাণু নিরস্ত্রীকরণের সঙ্গে বিষয়টিকে যুক্ত করেন।

ট্রাম্প বা কিম কেউই অস্থায়ী সংঘর্ষ বিরতি চুক্তি সমাপ্ত করার প্রশ্নে কোনো আনুষ্ঠানিক  ঘোষণা

করেন নি।  এতে বোঝা যায় অদূর ভবিষ্যতে দুটি দেশের মধ্যে ঘরোয়া সম্পর্ক অব্যাহত থাকবে। তাদের মধ্যে একান্ত প্রয়োজনীয় রাজনৈতিক বিশ্বাস গড়ে তোলার লক্ষ্যে এটি একান্ত আবশ্যক। যাইহোক, সিঙ্গাপুর শিখর বৈঠকের আগে উত্তর কোরিয়া তিনজন মার্কিন নাগরিককে মুক্তি দেয় সদিচ্ছার  মনোভাব দেখিয়ে।

উত্তর কোরিয়ার সংবাদ মাধ্যমগুলি জানিয়েছে যে উভয়ে অবিশ্বাস, ভুলবোঝাবুঝি এবং শত্রুতা কাটিয়ে উঠেছে এবং অব্যাহত আলোচনার আহ্বান জানাচ্ছে। ট্রাম্প আলোচনা স্থল থেকে বিস্মিতভাবে চলে গেলেও কিম আরো একদিন সেখানে ছিল, এথেকে বোঝা যায়  যে কিম অধিক নিশ্চিন্ত ছিলেন। সিঙ্গাপুর বৈঠক অপেক্ষা হ্যানয়ে কিমকেই অধিক দৃঢ় বলে মনে হয়।

আগে যেখানে পূর্ণ পারমাণবিক নিরস্ত্রীকরণের কথা বলা হচ্ছিল এখন তা থেকে সরে এসে উত্তর কোরিয়ার নতুন পারমাণবিক অস্ত্র বা ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা না করার কথা বলা হচ্ছে।

সম্পর্ক স্বাভাবিক করার উপায় হিসেবে উত্তর কোরিয়ার ভীয়েতনামের অর্থনীতির মডেল  অনুসরণ করার এবং বিশ্বায়ণ প্রক্রিয়ায় যোগদানের বিষয়ে আশা করা হয়েছিল। তবে উত্তর কোরিয়াকে একটি অর্থনৈতিক শক্তি হিসেবে রুপান্তরের বিষয়ে ট্রাম্পের পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হয় নি।

কোরিয়া যুদ্ধের ৬০ তম বার্ষিকী উৎসবে প্রথমে তিনজন সাংসদকে পাঠিয়ে এবং পরে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী ভি কে সিংকে পিয়ং ইয়ং এ পাঠিয়ে ভারত তাদের আগ্রহ দেখিয়েছে। নতুন দিল্লীর উদ্বেগের বিষয় হল পিয়ং ইয়ং এবং ইসলামাবাদের মধ্যে পরমাণু এবং ক্ষেপণাস্ত্র বিস্তারের সম্পর্ক ছিন্ন করা, কোরিয় উপদ্বীপে শান্তি এবং স্থিতিশীলতা নিয়ে আসা এবং পিয়ং ইয়ং এর সঙ্গে পারস্পরিক স্বার্থের সম্পর্ক গড়ে তোলা। তবে এতে আরো কিছু দিন সময় লাগবে বলে মনে হচ্ছে।(মূল রচনাঃ অধ্যাপক শ্রীকান্ত কোন্ডাপল্লী)