ভারত ও OIC, সম্পর্কে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা

এ সপ্তাহের শেষের দিকে ভারত এক ইতিহাস গড়লো।  একটি মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ না হওয়ায় ও কোনও মুসলিম নাগরিক, দেশটির সরকার বা রাষ্ট্রপ্রধান না থাকায়  ভারত ইসলামিক সহযোগিতা সংগঠন OIC’র সদস্য দেশ হতে পারে না বলে পাকিস্তানের যুক্তির অসারতা এই প্রথম নতুন দিল্লি প্রমাণ করতে পারল। ইসলামিক সহযোগিতা সংগঠন- OIC প্রতিষ্ঠার ৫০ বছর পর ভারতের কাছে এই সাফল্য এল। উল্লেখ করা যেতে পারে, ১৯৬৯ সালের সেপ্টেম্বরে  মরক্কোর রাবাতে OIC’র প্রথম বৈঠকে ভারত আমন্ত্রিত হওয়া সত্বেও শেষ পর্যন্ত পাকিস্তানের বিরোধিতার কারণে ফকরুদ্দীন আলি আহমেদের নেতৃত্বে ভারতীয় প্রতিনিধিদল ওই বৈঠকে অংশ নিতে পারেনি।

পাকিস্তানের আপত্তি সত্বেও শেষ পর্যন্ত ২০১৯’এর পয়লা মার্চ আবু ধাবিতে আয়োজিত OIC’র দু দিনের ৪৬-তম সম্মেলনের মূল অধিবেশনে সম্মানীয় অতিথি দেশ হিসেবে উপস্থিত থাকতে ভারতকে আমন্ত্রণ জানানো হল। ভারতকে এই সম্মেলন থেকে দূরে রাখতে পাক বিদেশমন্ত্রী, আবুধাবির যুবরাজ ও OIC’র বেশ কয়েকটি সদস্য দেশের নেতাদের শরণাপন্ন হলেও তাতে কোনও কাজ হয় নি, যা পাকিস্তানের ইসলামিক কূটনীতির এক বড় ধরনের ব্যর্থতারই প্রমাণ।

ভারতের প্রতিনিধি হিসেবে পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজ এই সম্মেলনে অংশ নিয়ে তাঁর ভাষণে ভারতকে বিশ্বের দ্বিতীয় সর্ববৃহৎ মুসলিম সম্প্রদায়  প্রধান  দেশ হিসেবে উল্লেখ করেন,  তাঁদের জন্য সরকারের বিভিন্ন কল্যাণমুলক নীতির পরিচয় দেন ও ইসলামিক সভ্যতা ও ইসলামিক দেশের সঙ্গে  ভারতের যুগপ্রাচীন ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের কথা বলেন। তিনি ভারতের উদারনৈতিক ও সহিষ্ণু সমাজের আদর্শ তুলে ধরেন। নতুন দিল্লিকে এই সম্মেলনে সম্মানীয় অতিথি দেশ হিসেবে উপস্থিত থাকতে আমন্ত্রণ জানাতে OIC কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্তকে শ্রীমতী স্বরাজ ঐতিহাসিক বলে অভিহিত করেন। পররাষ্ট্রমন্ত্রী তাঁর ভাষণে বলেন, স্বাধীনতা প্রাপ্তির পর ভারতের সঙ্গে মুসলিম দেশগুলির সম্পর্কে ঘনিষ্ঠতা ক্রমাগত বৃদ্ধি পেয়েছে; দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, মধ্য এশিয়া, পশ্চিম এশিয়া ও উত্তর আফ্রিকার  বিভিন্ন  মুসলিম দেশের সঙ্গে সরকারী স্তরে নিয়মিত যোগাযোগের মাধ্যমে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সম্পর্ক  ক্রমশ মজবুত হয়ে উঠছে।

সন্ত্রাসবাদকে মানব সভ্যতার সামনে এক সমূহ  বিপদ হিসেবে উল্লেখ করে শ্রীমতী স্বরাজ, যে কোনও ধরণের সন্ত্রাসবাদ ও চরম পন্থী ভাবাদর্শকে পরাস্ত করতে আন্তর্জাতিক স্তরে সংঘবদ্ধ লড়াইয়ের আহ্বান জানান। তিনি বলেন, প্রতিটি ধর্মই শান্তি, করুণা ও সৌভ্রাতৃত্বের বাণী প্রচারে মানব জাতিকে উদ্বুদ্ধ করে; আর  সে দিক থেকে বিচার করলে সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে সংগ্রামকে কখনই কোনও ধর্মের বিরুদ্ধে লড়াই বলে অভিহিত করা যায় না।

OIC সম্মেলনে অংশগ্রহণের জন্য ভারতের প্রতি আমন্ত্রণ এক দিকে যেমন পাকিস্তানের বক্তব্যের অসারতা প্রমাণ করেছে, অন্য দিকে তেমনই ইসলামিক দেশগুলির কাছে নতুন দিল্লির ক্রমবর্ধমান গুরুত্বই তুলে ধরছে। সংযুক্ত আরব আমীরশাহী, সৌদি আরব, কাতার, কুয়েত, ইরান, তুরস্ক, ইন্দোনেশিয়া ও মালয়েশিয়ার মত প্রধান প্রধান ইসলামিক দেশ পরিবর্তিত বিশ্ব পরিস্থিতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রাখতে তাদের অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক নীতিতে প্রয়োজনীয় পরিবর্তন নিয়ে আসছে; ভারতের সঙ্গে  বহুমুখী সম্পর্ক স্থাপন করেছে ও এই সম্পর্ক ক্রমশ অধিক মজবুত করেছে।

OIC’র আমন্ত্রণ গ্রহণ ও তাতে যোগদান করে ভারত বিশেষ কূটনৈতিক বিচক্ষণতার প্রমাণ রেখেছে। পাকিস্তানের মত দেশ এ পর্যন্ত ভারত সম্পর্কে বিকৃত তথ্য প্রচার করতে এই মঞ্চকে ব্যবহার করে এসেছে। এই প্রথম নতুন দিল্লি এই মঞ্চে সরাসরি তার বক্তব্য পেশ করার সুযোগ পেল; যা  সদস্য দেশগুলির কাছে  ভারত সম্পর্কে এখন এক নৈর্ব্যক্তিক মূল্যায়নের সুযোগ এনে দিল। OIC’র সম্মেলনে ভারতকে পর্যবেক্ষক হিসেবে আমন্ত্রণ এই আন্তর্জাতিক সংস্থায় নতুন দিল্লির পূর্ণাংগ সদস্য পদ লাভের পথ সুগম করল বলেই বিশেষজ্ঞ মহলের একাংশের ধারণা। (মূল রচনাঃ- ডঃ জাকির হুসেন)