ডায়েশের উত্থান পতন

প্রায় পাঁচ বছর আগে ২০১৪র জুন মাসে ডায়েশ (ইসলামিক রাষ্ট্র ইরাক এবং সিরিয়া বা আই এস) ইরাকে মসুল শহর দখল করার পর কুখ্যাত হয়ে ওঠে। মসুল ডায়েশের আঘাতের শিকার হয়, তাদের সদস্যরা শহরের দৈনন্দিন শাসনের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে নেয়।

এই জঙ্গী গোষ্ঠী দ্রুত সিরিয়ায় ছড়িয়ে পড়ে। ২০১৫র মে মাসে তারা ঐতিহাসিক পাল্মিরা শহর তছ্‌নছ্‌ করে দেয় এবং রাক্কা শহরকে স্বঘোষিত ঐস্লামিক খলিফাতন্ত্রের রাজধানী বলে ঘোষণা করে। ডায়েশ ইরাক-সিরিয়া সীমান্তের উভয় দিকে ৩০,০০০ বর্গ মাইল ভূখন্ডের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের দখলে নেয়। আত্মঘাতী বোমাবর্ষণ, অপহরণ, ধর্ষণ, দাসত্বে পরিণত করা এবং গণহত্যার মত কাজে তারা প্রতিনিয়ত লিপ্ত থাকতো। যারা তাদের ভয়ংকর রাজনীতি বা বিভাজনমূলক আদর্শে বশ্যতা স্বীকার করত না তাদের এই সব ভয়াবহ পরিণতির শিকার হতে হত। তাদের বর্বরতায় হাজার হাজার শিশু অনাথ হয়েছে এবং অসংখ্য মহিলা বিধবা হয়েছেন। ঐ অঞ্চলে বহু গণ কবর রয়েছে যেখানে তারা গত চার-পাঁচ বছর শাসন করেছে। ইরাকে ইয়াজিদিসদের গণহত্যা এই জঙ্গী গোষ্ঠীর জঘন্য অপরাধের চরমতম দৃষ্টান্ত।

ইরাকী বাহিনী যখন রামাদি এবং ফালুজা শহরের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে নিতে শুরু করে এবং পরে ইরাকী বাহিনী এবং মার্কিন-নেতৃত্বাধীন জোট বাহিনী স্থানীয় কুর্দ মিলিশিয়াদের সহায়তায় ২০১৭র জুলাইয়ে মসুল শহরের দখল নেয় তখন থেকে ডায়েশের পতন শুরু হয়। ২০১৭র পরের দিকে মার্কিন সমর্থিত স্থানীয় মিলিশিয়া এবং আন্তর্জাতিক জোটের কাছে আই এস  রাক্কা এবং পাল্মিরায় দুর্দান্তভাবে পরাস্থ হয়। মার্কিন নেতৃত্বাধীন বাহিনীর প্রতি সিরিয়ার ডেমক্রেটিক বাহিনী এস ডি এফ এর পূর্ণ সমর্থন ছিল।

সিরিয়ান ডেমক্রেটিক বাহিনীর আই এস বিরোধী জোটে যোগদানের ফলে সিরিয়ায় ডায়েশের পতন ত্বরান্বিত হয়। তুরক্সের মত কিছু দেশের  বিরোধীতা সত্বেও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র পূর্ণ সহযোগিতা করে। কুর্দরা রাকা এবং সিরিয়ার অন্যান্য শহরে ডায়েশের পতনে সহায়তা করেছে। মার্কিন নেতৃত্বাধীন জোট এবং রুশ বাহিনী ছাড়াও এস ডি এফ আই এস বিরোধী এই লড়াইয়ে বড় ভূমিকা পালন করে।

সম্প্রতি সিরিয়া-ইরাক সীমান্তের ছোট্ট গ্রাম বাগৌজে ডায়েশের শেষ আস্তানায় হানা দেয় এস ডি এফ ফলে অনেক আই এস যোদ্ধা পালিয়ে যায় বা এস ডি এফ এ যোগ দেয়।

খবরে প্রকাশ গত তিন মাসে ৫০০০ ডায়েশ জঙ্গী বাগৌজ থেকে ইডলিব শহরের দিকে সরে গেছে। মার্কিন বিদেশ দপ্তর ইতিমধ্যেই সিরিয়ায় আই এস এর পতনের কথা ঘোষণা করেছে এবং সিরিয়া থেকে তাদের সেনা সরিয়ে নেবার কথা জানিয়ে দিয়েছে। কিন্তু পরে সম্পূর্ণ সেনা প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করে। ডায়েশের পুনরুজ্জীবিত হওয়া প্রতিরোধ করতে এখন NATOর সহায়তায় ৪০০র মত সৈন্য সেখানে থাকবে বলে ওয়াশিংটন পরিকল্পনা করছে।

আই এস এর বিরুদ্ধে লড়াইয়ের অবসান হয়েছে বলে মনে হচ্ছে তবে এখনও অনেকটা পথ যেতে হবে। সিরিয়ার কারাগারে এখনও বহু ইওরোপীয় এবং এশিয় দেশ থেকে আসা আই এস জঙ্গী বন্দী রয়েছে। নিজ নিজ দেশে তাদের বিচারের কাঠ গড়ায় দাঁড় করাতে হবে। রাষ্ট্রপতি ট্রাম্প ইওরোপীয় দেশগুলিকে ৮০০জন জঙ্গীকে ফিরিয়ে নিয়ে তাদের বিচার করতে বলেছেন। অনেক দেশ জঙ্গীদের ফিরিয়ে নেবার বিষয়ে অনীহা দেখিয়েছে কারণ তা জাতীয় নিরাপত্তার ক্ষেত্রে আশংকার কারণ হতে পারে।

শ্রী ট্রাম্প ধৃত জঙ্গীদের ছেড়ে দিয়ে নিজের দেশে যাবার অনুমতি দেওয়ার হুমকিও দিয়েছেন। সবচেয়ে বড় উদ্বেগের কারণ হল যারা সিরিয়া থেকে পালিয়ে গেছে সেই সব ডায়েশ জঙ্গীদের চিহ্নিত করা। যেহেতু বিভিন্ন দেশে তাদের অনেক সমর্থক রয়েছে সেই কারণে পুনরায় একত্রিত হয়ে ডায়েশের পুনরুত্থানের সম্ভাবনা খারিজ করে দেওয়া যায় না। বিশ্ব সম্প্রদায়কে একজোট হয়ে এই চ্যালেঞ্জের মোকাবিলা করতে হবে। (মূল রচনা ডঃ ফজুর রহমান সিদ্দিকি)