ভারত-আফ্রিকা সম্পর্কে ঘনিষ্ঠতা

আফ্রিকার বিভিন্ন দেশের সঙ্গে ভারতের যোগাযোগ সাম্প্রতিক বছরগুলিতে ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে। আর এ কারণেই দুই পক্ষের মধ্যে সম্পর্কের পরিধি ক্রমাগত প্রসারিত হচ্ছে। ভারতের অর্থনৈতিক ও পররাষ্ট্র নীতিতে   আফ্রিকাকে উচ্চ অগ্রাধিকার প্রদানের অঙ্গ হিসেবে বিগত কয়েক বছরে নতুন দিল্লির সঙ্গে আফ্রিকী দেশগুলির আর্থিক, বাণিজ্যিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক সম্পর্ক অধিক শক্তিশালী হয়েছে। গাম্বিয়ার বিদেশমন্ত্রী ডঃ মামান্দো টাঙ্গারা ও কেনিয়ার  বিদেশ নীতি সম্পর্কিত ক্যাবিনেট সচিব শ্রীমতী মণিকা জুমার সাম্প্রতিক  নতুন দিল্লি সফর ভারতের সঙ্গে আফ্রিকার সম্পর্কে  এক নতুন মাত্রা সংযোজন করেছে।

আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে কূটনৈতিক প্রতিনিধিত্ব বৃদ্ধির লক্ষ্যে ভারত ওই সব দেশে নতুন ১৮ টি দূতাবাস স্থাপনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে।  এই নিয়ে আফ্রিকা মহাদেশে ভারতীয় দূতাবাসের সংখ্যা বেড়ে ৪৭’এ পৌঁছেছে।  আফ্রিকার দেশগুলির অর্থনৈতিক উন্নয়ন ছাড়াও সন্ত্রাসবাদ ও জলবায়ু পরিবর্তন জনিত সমস্যার মোকাবিলায় ওই দেশগুলির সঙ্গে একযোগে কাজ করার লক্ষ্যে   গত বছর প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ১০ টি মূল নীতি ঘোষণা করেন, যার অঙ্গ হিসেবে ওই মহাদেশের অন্তর্নিহিত বিপুল অর্থনৈতিক  সম্ভবনাকে উপযুক্ত মাত্রায় কাজে লাগাতে একটি যোজনা রচনা করা হয়। প্রধানমন্ত্রী এই উদ্দেশ্যে আফ্রিকার সঙ্গে প্রতিযোগিতার পরিবর্তে সহযোগিতার নীতির প্রতি জোর দেন।

আফ্রিকার দেশগুলির সঙ্গে অধিক যোগাযোগ স্থাপনের লক্ষ্যে গত পাঁচ বছরে ভারতের রাষ্ট্রপতি, উপরাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী পর্যায়ের প্রতিনিধি ২৯ বার ওই সব দেশ সফর করেন। অপরদিকে এই সময়ে আফ্রিকার বিভিন্ন দেশ থেকেও বহু সরকারী উচ্চ পদস্থ নেতা নতুন দিল্লি সফরে এসেছেন।

আফ্রিকা মহাদেশের সঙ্গে একটি সর্বাত্মক সংযোগ প্রতিষ্ঠার স্বার্থে নতুন দিল্লি ২০১৫ সালে ভারতে অনুষ্ঠিত তৃতীয় ভারত-আফ্রিকা শিখর সম্মেলনে ৫৪ টি আফ্রিকী দেশের সরকারকেই আমন্ত্রণ জানায়। আফ্রিকার ৪১ টি দেশের রাষ্ট্র ও সরকার প্রধান সহ সব কটি দেশেরই উচ্চ সরকারী প্রতিনিধি ওই সম্মেলনে অংশ গ্রহণ করেন। গত বছর ভারতে আয়োজিত আন্তর্জাতিক সৌর আঁতাত’এর প্রথম সম্মেলনে আফ্রিকার ৩৫ টি দেশের সরকারী প্রতিনিধি যোগ দেন। এ বছরের সাধারণতন্ত্র দিবস উদযাপনের মূল অনুষ্ঠানে দক্ষিণ আফ্রিকার রাষ্ট্রপতি সিরিল রামাফোসা প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন। এই ধরণের নিয়মিত সফর বিনিময়ের ফলে আফ্রিকার দেশগুলির সঙ্গে বাণিজ্য, বিনিয়োগ, প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা সহ নানা ক্ষেত্রে সম্পর্ক ক্রমশ অধিক মজবুত হয়ে উঠছে।

আফ্রিকার সঙ্গে ভারতের বাণিজ্য ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে। ভারত, আফ্রিকায় পঞ্চম সর্ববৃহৎ লগ্নীকারক দেশ। বর্তমানে ভারতের লগ্নীর পরিমাণ প্রায় ৫,৪০০ কোটি মার্কিন ডলার। ৩৪ টি আফ্রিকী দেশ ভারতের কাছে অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে শুল্ক বিহীন বাণিজ্যের সুবিধা পেয়ে থাকে। ৪১ টি দেশকে ভারতের দেওয়া সহায়তার পরিমাণ প্রায় ১১০০ কোটি মার্কিন ডলার।

উন্নয়নী সহযোগিতার অধীনে ভারত, সুদান ও রাওয়ান্ডায়  বিদ্যুৎ প্রকল্প ও বাঁধ নির্মাণ, তানজানিয়ায় জল শোধন প্রকল্প, ইথিওপিয়ায় চিনি কল স্থাপন, এবং মোজাম্বিক ও সোয়াজিল্যান্ডে তথ্য প্রযুক্তি কেন্দ্র স্থাপনের দায়িত্ব পালন করছে। দূষণ মুক্ত শহরাঞ্চলীয় সরকারী পরিবহণ যোজনার অঙ্গ হিসেবে ভারত, সেনেগালকে লিথিয়াম আয়ন ব্যাটারিযুক্ত ২৫০ টি ই-রিক্সা সরবরাহ করেছে। এ ছাড়াও আফ্রিকায় ভারত ৭ টি বৃত্তি শিক্ষা কেন্দ্র ও ৬ টি তথ্য প্রযুক্তি কেন্দ্র স্থাপন করেছে।

অপর দিকে ভারত, তার অপরিশোধিত তেল ও তরল প্রাকৃতিক গ্যাসের  মোট প্রয়োজনের ১৮ শতাংশের মত পূরণ করে পশ্চিম আফ্রিকার দেশগুলি থেকে আমদানির মাধ্যমে।এ ছাড়া দক্ষিণ আফ্রিকা ও ঘানা থেকে আমদানির মাধ্যমে দেশে কয়লার মোট প্রয়োজনের প্রায় ২৫ শতাংশ পুরণ করা হয়।

সংক্ষেপে বলতে গেলে, আফ্রিকা বিষয়ক একটি সক্রিয় ও বলিষ্ঠ নীতি অনুসরণের কারণেই ভারত-আফ্রিকা অংশীদারিত্ব ক্রমশ অধিক মজবুত হয়ে উঠছে। (মূল রচনাঃ- সুনীল গাটাড়ে)