কারপুল ড্রাইভার অঞ্জনা ভট্টাচার্যর সাক্ষাতকার

For Sharing

ঘুরে দাড়ানোর গল্প – কারপুল ড্রাইভার অঞ্জনা ভট্টাচার্য

আকাশবাণী মৈত্রীর “ঘুরে দাঁড়ানোর গল্প”

-এখানে গাড়ি রাখা যাবেনা, সরিয়ে নিন।
-মেয়েছেলে গাড়ি নিয়ে বেরোবার দরকারটা কি, ড্রাইভার রাখলেই হয়!
আশপাশ থেকে উড়ে আসা কিছু তির্যক মন্তব্য–অবজ্ঞা সূচক শব্দবন্ধ। এঁরা হলেন সেইসব মানুষজন, বাসে কোনো মহিলা অস্বস্তির প্রতিবাদ করলে যাঁরা পুরুষোচিত তাচ্ছিল্যে বলেন, ” বেশি অসুবিধে হলে ট্যাক্সি করে যান।” কিন্তু এসব কথা আদপেই গায়ে মাখেননি অঞ্জনা। গায়ে মাখলে তাঁর কি চলে, যাঁর হাতে স্টিয়ারিং ঘুরলে তবেই ঘোরে সংসারের চাকা! আবার অন্যদিকে যাঁর ওপরেই নির্ভর করে কয়েক ডজন বাচ্চার প্রতিদিনের স্কুল যাতায়াত! টালিগঞ্জ করুণাময়ীর অঞ্জনা ভট্টাচার্য অতএব নির্বিকারে চালিয়েই যাচ্ছেন তাঁর ‘পুল-কার’ গত ১৩/১৪ বছর ধরে।

বাংলার বাইরে মোগলসরাইতে বড় হয়ে ওঠা, বেনারস হিন্দু ইউনিভার্সিটির স্নাতক মেয়েটির জীবনটা অবশ্য ঠিক এমনটাই হবার কথা ছিল না। ইচ্ছে ছিল পড়াবেন। একটি স্কুলে শুরুও করেছিলেন পড়াতে কিন্তু বিএড না থাকায় দিদিমনি হবার বাসনায় ইতি টানতে হল। তাবলে বসে থাকা তাঁর ধাতে সয়না। বিয়ের আগে থেকেই শাড়ির ব্যবসা, মেশিনে উল বুনে স্কুলে স্কুলে অর্ডার সাপ্লাই কিছু না কিছু করেছেন। স্বামী কাজ করতেন প্রাইভেট ফার্মে। রোজগার বেশি ছিল না। স্ত্রীর ব্যবসায় উৎসাহ দেখে তিনি পরামর্শ দিয়েছিলেন গাড়ির ব্যবসা শুরু করার। যেমন কথা তেমনি কাজ — সেকেন্ড হ্যান্ড গাড়ি কিনে শুরু হল স্কুল-গাড়ির ব্যবসা। গোড়ার দিকে ড্রাইভারই চালাত। শখ করে তবু গাড়ি চালানোটা নিজেও শিখে নিয়েছিলেন মালকিন। তখন ভাবেন নি একদিন সত্যি সত্যি-ই হাল ধরতে হবে। চালকের আসনে প্রথম যেদিন বসতে হল সাহস করে বাচ্চা গুলিকে গন্তব্যে পৌঁছে দিলেন আত্মবিশ্বাস বেড়ে গেল সেদিনই। পরিবার আগাগোড়াই পাশে দাঁড়িয়েছে অঞ্জনার। শাশুড়ি-মা সংসার সামলে দিয়েছেন — কাজ থেকে ফিরলে রান্না খাবারটা বৌমাকে এগিয়ে দিয়েছেন যথাসময়ে, দরকারে বাসনটাও মেজে রেখেছেন নিজেই। কিন্তু গাড়ির চাকার মতো ভাগ্যের চাকাটাও ঘুরে গেল ইতিমধ্যে। শাশুড়ি চলে গেলেন, স্বামীর ধরা পড়ল দুরারোগ্য মোটর নিউরোন ডিজিজ। এরপর এক হাতে রোগীর যাবতীয় কাজকর্ম এবং সেই সঙ্গে গাড়ি চালানোর কাজ। স্বামী যখন চলে গেলেন, মেয়ের তখনও পড়াশুনা শেষ হয়নি।

কাজ করতে নেমে বাড়ির সাহায্য যতটা পেয়েছেন, বাইরে পেয়েছেন ততটাই প্রতিকূলতা। মহিলারা নিজেদের গাড়ি চালালে অনেকেই সম্ভ্রমের চোখে তাকান কিন্তু কোন এক মহিলা যদি রোদ জল ঝড়ে নিয়মিত অনেকগুলি কচিকাঁচার দায়িত্ব নিয়ে স্কুল-গাড়ি চালান সেই পেশাদারিত্ব তাঁদের কোথাও একটা ধাক্কা দেয়। মেয়েরা অর্থকরী কাজ করে সংসারে সহায়তা করবেন এটা স্বীকৃত হয়েছে বহুদিনই। বিয়ের বিজ্ঞাপনেও এখন প্রকৃত সুন্দরী, গৃহকর্ম-নিপুণার চেয়ে চাকুরিরতাই অগ্রগণ্যা। সংসার সুখের হয় রমণীর গুণে, কিন্তু তাবলে রমণীর কাজটাও একটু রমণীয়, মানে সোজা কথায় একটু মেয়েলি না হলে কি চলে? ডাক্তার দেখাতে গিয়ে রোগিনীরাও তো পুরুষ ডাক্তারেরই খোঁজ করেন কিনা! কাজের ক্ষেত্রে নারী-পুরুষের অদৃশ্য বিভেদ-রেখা ডিঙিয়ে ফেললে পুরুষ-তান্ত্রিক সমাজের ভুঁরু তো কুঁচকাবেই। তা সে ভুঁরুর তোয়াক্কা কোনকালেই করেন নি অঞ্জনা। যে বাচ্চা গুলিকে মায়ের মমতায় বছরের পর বছর স্কুলে আনা- নেওয়া করছেন তিনি, তাদের অভিভাকদের পূর্ণ আস্থাই তাঁর মূলধন।
সারাজীবন হাসিমুখে পরিশ্রম করে চলেছেন অঞ্জনা, মেয়ে চাকরি পেয়ে গেছে সম্প্রতি। এবার কি একটু জিরোতে ইচ্ছে করছে? না, না, এখনই বিশ্রাম নয়। মেয়ের বিয়ে না দিয়ে মায়ের দায়িত্ব কি ফুরোয়? অতএব চাকা ঘুরবেই। কিন্তু এর মধ্যে কি চাপা পড়ে গেল একান্ত ব্যক্তিগত কোনো শখ-সাধ? তা একটু গেলো বৈকি। গান ভালোবাসেন। শিখতেও শুরু করেছিলেন, কিন্তু সময় দিতে পারেন নি কাজের চাপে। এখন স্কুল-গাড়িতে গান বাজে সারাদিন। সুর ঠিক তার পথ করে নেয় লড়াকু এই নারীর বুকের মাঝে, বোধের মাঝে। ব্যস্ত রাজপথের সব শব্দ ঢেকে দিয়ে জীবন জুড়ে বাজতে থাকে তাঁর প্রিয় রবীন্দ্র-গান।
আকাশবাণী মৈত্রীর “ঘুরে দাঁড়ানোর গল্পে” আজ বেলা ১১ টায় এবং রাত ৮ টায় ৫০৫ মিটার/৫৯৪ কিলোহার্ৎজে শুনুন অঞ্জনা ভট্টাচার্যের এই অন্যরকম লড়াইয়ের কথা।