নওয়াজ শরিফের বিবৃতিতে পাকিস্তান অপ্রস্তুত

For Sharing

পাকিস্তানের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফ নিজেকে এবং তাঁর দেশের সরকারকে লজ্জার মুখে ফেলেছেন। পানামা গেট কেলেংকারীর বিষয়ে সুপ্রিম কোর্ট তাঁকে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে অযোগ্য ঘোষণার পর শ্রী শরিফ তাঁর নিজের রাজনৈতিক অস্তিত্বের লড়াই লড়ছেন। সর্বোচ্চ আদালত তাঁর নিজের দল পাকিস্তান মুসলিম লিগ-নওয়াজ (পি এম এল এন)এর সভাপতি পদের জন্য অযোগ্য বলেও রায় দিয়েছেন। আগামী দুমাসে সেদেশে ভোট হতে চলেছে আর পি এম এল এন সে দেশের এক গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক দল।

এক সাক্ষাৎকারে শ্রী শরিফ মুম্বাই আক্রমণের মুল ষড়যন্ত্রকারী হাফিজ সাঈদ এবং মৌলানা মাসুদ আজহারের জঙ্গী সংগঠন, জামাত-উদ-দাওয়া এবং জায়েশ-এ-মহম্মদের নাম উল্লেখ না করে বলেছেন যে, পাকিস্তানে জঙ্গী সংগঠনগুলি সক্রিয় রয়েছে। তাদের রাষ্ট্রহীন সক্রিয়বাদী বলে আমরা কি তাদের সীমান্তপাড়ে গিয়ে মুম্বাইয়ে ১৫০জনের বেশি মানুষকে হত্যা করার অনুমতি দিতে পারি? তিনি জানতে চান আমরা কেন তাদের বিচার প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ করতে পারি না সেটা ব্যাখ্যা করা দরকার।

শ্রী শরিফ যথার্থই বলেছেন। এটি সর্বজন বিদিত যে পাকিস্তানের জঙ্গীরা ২০০৮’এর ২৬শে নভেম্বরের মুম্বাই আক্রমণের পেছনে ছিল। আর সেই ঘটনায় ১৬৫জন নিরপরাধ ভারতীয় এবং বিদেশী নাগরিক প্রাণ হারিয়েছেন। মুম্বাই আক্রমণের অব্যবহিত পরেই পাকিস্তানের তদানিন্তন রাষ্ট্রপতি আই এস আই এর প্রধানকে যৌথ তদন্তের জন্য ভারতে পাঠাতে রাজী হন, কিন্তু তৎকালীন পাকিস্তানী সেনা প্রধান সেই প্রস্তাব বাতিল করে দেন।  

ভারতীয় নিরাপত্তা বাহিনী একমাত্র যে পাকিস্তানী জঙ্গীকে জীবন্ত অবস্থায় পাকরাও করে সেই আমীর কাসাব স্বীকার করে যে পাকিস্তানী প্রতিষ্ঠানে তার প্রশিক্ষণ হয় এবং এই আক্রমণের সঙ্গে যুক্ত পাকিস্তানী সামরিক  আধিকারিকদের নামও সে প্রকাশ করে। তবে জাকি উর রহমান লাখভি এবং মূল চক্রী হাফিজ সাঈদকে গ্রেপ্তার করার পর, পাকিস্তান আইনী প্রক্রিয়াকে বিভ্রান্ত করে তুলতে যা যা দরকার সবই করেছে। ভারত মুম্বাই আক্রমণের জঙ্গীদের ভূমিকার বিষয়ে বিশদ নথিপত্র সহ একাধিক দস্তাবেজ পাকিস্তানের হাতে তুলে দেয়; কিন্তু ইস্লামাবাদ সর্বদাই বলে আসছে “প্রমাণ পর্যাপ্ত নয়”।

দীর্ঘ বছর ধরে লাখভি এবং সাঈদকে তোষামোদ করে আসা পাকিস্তানী সরকার (বিশেষ করে সেনা বাহিনী) শ্রী শরিফের এই প্রকাশ্য স্বীকারোক্তিতে ভিষণ ভাবে অপ্রস্তুত হয়ে পড়েছে। তবে বিশ্লেষকগণ শ্রী শরিফের মন্তব্যের বিষয়ে প্রশ্ন তুলছেন। আসলে তিনিই তো ২০১৭র মাঝামাঝি সময় পর্যন্ত সব কিছুর কর্ণধার ছিলেন আর এই জঘন্য আক্রমণে তাঁর দেশের যুক্ত থাকার কথা যখন তাঁর জানা ছিল, তখন তাঁর উচিত ছিল সেই সব শক্তির বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া। এটা ভুললে চলবে না যে শ্রী শরিফের শাসনকালেই ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ঐতিহাসিক লাহোর সফরের কয়েকদিন পর পাঠানকোট বিমান ঘাঁটিতে আক্রমণ ঘটে। শ্রী শরিফের আগের কার্যকাল ১৯৯৯এ ঘটেছিল কারগিল।

ভারত এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় খুব ভালো করেই জানে যে পাকিস্তান সন্ত্রাসবাদীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের প্রতি কখনই তেমন গুরুত্ব দেয় না।   পাকিস্তানের প্রাক্তন প্রধান মন্ত্রী কেবল এই কথাটাই আবার স্বীকার করেছেন যে তাঁর দেশ সন্ত্রাসবাদকে বিদেশ নীতির অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে। সন্ত্রাসবাদের প্রশ্নে ইস্লামাবাদের দুমুখো নীতি সকলেরই জানা আছে।

পাকিস্তানে নির্বাচন আগতপ্রায় এবং শ্রী শরিফের পুত্র কন্যারা দুর্নীতি এবং অন্যান্য অভিযোগে সর্বোচ্চ আদালতের কোপের মুখে। মুম্বাই আক্রমণে পাকিস্তানের যুক্ত থাকার বিষয়ে শ্রী শরিফের স্বীকারোক্তি সহানুভূতি এবং সমর্থন আদায়ের এক কৌশলও হতে পারে। তাঁর নিজের দল পি এম এল এন এবং পাকিস্তানী সেনা শ্রী শরিফের বিবৃতির সমালোচনা করেছে।

পিএমএল এন বলেছে, ভারতীয় প্রচার মাধ্যম শ্রী শরিফের বিবৃতির অপব্যাখ্যা করেছে। পাকিস্তানের শীর্ষ সিভিল-মিলিটারী সংস্থা জাতীয় নিরাপত্তা কমিটি এন এস সি ২৬/১১র মুম্বাই আক্রমণে পাকিস্তানী জঙ্গীদের যুক্ত থাকার বিষয়ে শ্রী শরিফের প্রকাশ্য স্বীকারোক্তিকে ভিত্তিহীন বলে আখ্যায়িত করেছে।

তবে শ্রী শরিফ এক জনসভায় বলেছেন এখন সময় এসেছে পাকিস্তানের এটা জানার যে সন্ত্রাসবাদ এবং বর্তমান এই অবস্থার জন্য কারা দায়ী। তিনি জানতে চান পাকিস্তানকে একাকিত্বের পথে কারা ঠেলে দিচ্ছে এবং দেশকে এমন অবস্থায় এনে কারা দাঁড় করিয়েছে যেখানে পাকিস্তানের কথা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কেউ শুনতে চায় না। এই সমস্ত প্রশ্নের উত্তর পাকিস্তানের শাসন তন্ত্রকেই দিতে হবে।

শ্রী শরিফের বিবৃতি প্রমাণ করেছে যে ভারত বরাবর যা বলে আসছে তা সঠিক এবং মুম্বাই আক্রমণের অভিযুক্ত জঙ্গীদের বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করানোর কাজ পাকিস্তানকেই করতে হবে।   

 ( মুল রচনাঃ কৌশিক রায় )