আবার এসেছে বরষা

For Sharing

প্রিয় শ্রোতাবন্ধুরা,

দীর্ঘদিন পরে আবার লেখার সুযোগ পেলাম। কর্মব্যস্ততা জীবনকে পঙ্গু করলেও আপনাদের সাথে ভাব বিনিময়ের প্রলোভন প্রবল থেকে প্রবলতর হয়ে উঠেছে। বয়সের গণ্ডিও বাধা হয়ে উঠতে পারে নি।

টিভি খুললেই দেখা যাচ্ছে ‘নদী আপন বেগে পাগলপারা’। চ্যানেল বদলালেও, দৃশ্য সর্বত্রই এক – চারিদিকে শুধু প্লাবন আর প্লাবন। প্রকৃতি আজ যেন প্রতিবাদের প্রতিমূর্তি। এ যেন মানব সভ্যতার বুকে প্রকৃতির তাণ্ডব নৃত্য।  প্রকৃতির কাছে আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞান যেন পরিচয়হীন খড়কুটো, ভেসে চলেছে কোন অজানার উদ্দেশে। নিয়ন্ত্রণের লড়াইয়ে প্রকৃতি আজও অপারেজেয়, আজও দুর্জয়।

দিল্লির আকাশ এখন ঘন কালো মেঘে ছেয়ে আছে। এমন দিনে শীতাতপনিয়ন্ত্রিত ঘরে বসে  টিভির পরদায় চোখ রেখে চায়ে চুমুক দিতে দিতে হঠাৎই ছোটোবেলার কথা মনে এল।

মনে পড়ে গেল দিল্লির বর্ষার কথা। শৈশব মনে তখনও রবি’র উদয় না হলেও  “এসেছে বরষা এসেছে নবীনা বরষা, গগন ভরিয়া এসেছে ভুবন ভরসা’’র আনন্দটা অনুভব করতে কোনও বেগ পেতে হত না; কারণ শৈশব মনে ভাষার থেকে ভাবের আধিক্যই বেশি।

গ্রীষ্মের প্রখর দাবদাহের পর ঈশান কোণে যখন মেঘের আনাগোনা শুরু হয়েছে, তখন শিশু মনেও … “মন মোর মেঘের সঙ্গী উড়ে চলে দিক দিগন্তের পানে নিঃসীম শূন্যে শ্রাবণ বরষন সঙ্গীতে রিমিঝিম রিমিঝিম রিমিঝিম”।

সূর্য তার প্রখর তেজ সম্বরণ ক’রে বর্ষাকে স্বাগত জানাতে উদগ্রীব হয়ে উঠেছে। আস্তে আস্তে প্রকৃতি শান্ত ও স্নিগ্ধ হয়ে উঠেছে। বন্ধুদের হাত ধরে আমরা ততক্ষণে মাঠে একত্রিত হতে শুরু করেছি। হঠাৎ দেখি আমাদের সেই চিরসাথী ছায়াটা পালিয়েছে। কোথায় গেছে বলতে পারব না। ও কি বৃষ্টির ভয়ে পালালো? জানি না। হয়তো ও দূরে বসে বর্ষার সঙ্গে দুরন্ত শিশুদের মিলনের ওই দৃশ্য দেখতে চায়, অনেকটা কুরুসভার সঞ্জয়ের মতো।

আধুনিকতার ছোঁয়া তখনও আমাদের জীবনকে আজকের  মতো আষ্টেপৃষ্টে বেঁধে উঠতে পারেনি। কংক্রিটের জঙ্গলের সাথে তখনও আমাদের  তেমনভাবে পরিচয় হয় নি। তখনও দৃষ্টির গতি ছিল অবাধ।

ঝির ঝির ঝির ঝির…একটু একটু করে বৃষ্টি এগিয়ে  আসছে। এরই মধ্যে  বৃষ্টি চুলে বিলি কাটতে শুরু করেছে। আমাদের আনন্দ উচ্ছাসের প্রকাশটা এতটাই প্রবল হয়ে উঠেছে যে, ‘প্রথম বৃষ্টি, ভিজিস না, জ্বর হবে। চলে আয়’…… মা’এর এই সতর্কবাণী কানেই পৌঁছত না। বৃষ্টির প্রথম ছাঁট আজও মা’র স্নেহের সেই ডাক মনে করিয়ে  দেয় ……মনটা প্রকৃতির সাথে তাল মিলিয়ে কেমন যেন ভরাক্রান্ত হয়ে ওঠে।

ক্রমে ক্রমে বৃষ্টি তার গতি বাড়ায়। চারিদিক জলে থৈ থৈ। এবার কিন্তু এক ছুটে  ঘরে যাবার পালা, কাগজের নৌকো ভাসাতে হবে যে। দিদির খাতার পাতা দিয়ে তৈরি নৌকো আবার অনেক দূরে যায়… হয়তো সেই চাঁদ সওদাগরের কাছে। দিদি টের পাওয়ার আগেই চার-পাঁচটা নৌকো ভাসানো হয়ে গেছে। এ নিয়ে দিদির সাথে তুমুল ঝগড়াও নৌকো ভাসানোর আনন্দকে কিছুতেই ম্লান করতে পারেনি।

 

তখন দিল্লির বৃষ্টি মানেই ময়ূরের নাচ দেখা। দিল্লিতে ময়ূর তখন যত্র-তত্র ঘুরে বেড়াতো। অপু-দুর্গার মতো আম কুড়োতে না পারলেও ময়ূর-পেখম কুড়নোর সেই আনন্দ কি কখনো ভোলা যায়?

 

তখন দিল্লির বর্ষা মানেই বাঙালিদের ল্যাম্ব্রেডা অথবা বাজাজ স্কুটারে করে  যমুনাতে মাছ ধরতে যাওয়া। বলা বাহুল্য, মাছ ধরা থেকে যমুনার পাড়ে বসে মিনি-চড়ুইভাতির আনন্দটাই ছিল বড়ো পাওনা। বর্ষা, তোমার ডাকে সাড়া দিয়ে আমাদের উঠোনে কোথা থেকে ব্যাঙও এসে জুটত। তখন ব্যাঙ ধরার  প্রতিযোগিতা চলত উঠোন জুড়ে। ধরতে পারলে সুতো দিয়ে পা বেঁধে দিতাম, পোষ মানাবো বলে। লুকিয়ে লুকিয়ে মার দেওয়া আদা কুচি আর সরষের তেল  মাখানো মুড়ি দিতাম ওকে। তখন বুঝতাম না ও কেন খেতে চাইত না। মুড়ি তখন দিল্লীতে আজকের মতো সহজলভ্য ছিল না। আঃ….. বর্ষা, তুমি কতো সুন্দর। তখন তুমি মানেই এক ঝুড়ি আনন্দ।

 

সেই দিল্লিও আজ নেই, সেই বর্ষাও আজ নেই। বর্ষা, তুমি আজ আমার সেই শৈশবের বর্ষা নও। তুমি আজ বড়ো কঠোর, নির্দয়। জানি, এখন ভাষা পালটেছে, ভাব পালটেছে। যুগ পালটেছে, জলহাওয়া পালটেছে। পালটেছে দিল্লি। পালটেছে তোমার রূপ। আধুনিকতার মোহে অন্ধ মানুষ আজ বিবেকহীন, প্রকৃতি আজ অবহেলিত; তাই ব্যথিত, ক্রুদ্ধ। বৃষ্টি তাই আজ কখনও অভিমানী, কখনও বিধ্বংসী।

 

বৃষ্টির এই অনুভূতি, আজকের শৈশব মনে ছায়া ফেলে না। হোয়াটসঅ্যাপের যুগে ওই অনুভূতির কি আর প্রয়োজন আছে? একটু ভেবে দেখুন। প্রকৃতি আজ ক্রুদ্ধ, তবে এখনও সংযত। এখনও সময় আছে, মানব বিকাশকে প্রকৃতি বিকাশে রূপান্তরিত করার। মানব চেতন, প্রকৃতি চেতন হয়ে উঠুক এটাই কাম্য। আসুন এই বর্ষায় সবাই মিলে বৃক্ষরোপণ করি। নতুন প্রজন্মের জন্য এই পৃথিবী হয়ে উঠুক মমতাময়ী। মানব হৃদয় হয়ে উঠুক আরও সহিষ্ণু। হয়ে উঠুক প্রকৃতি প্রেমিক, প্রকৃত প্রেমিক। নাহলে প্রলয় অবশ্যম্ভাবী। তাই সাধু সাবধান।

 

আজ এখানেই শেষ করছি। আবার কথা হবে।

ভালো থেকো। ভালো রেখো ।

 

ইতি

তোমাদেরই ‘মিতা’

 

(রচনা – শুভা রায় )