দৈব পর্যটন

For Sharing

প্রিয় কৃষ্ণচুড়া,

হাওড়ায় যেমন সকলে দেখা করার জন্য বেছে নেয় বড়ঘড়ির নীচের জায়গাটিকে, এখানে তেমন দেখা হওয়ার অ্যাপয়েন্টমেন্ট স্থলের নাম কেল্লা। বিকেলে তাহলে কেল্লার সামনে দেখা হবে…. ওই তো কেল্লা থেকে অটো ছাড়বে….আপনি কেল্লাকে সামনে রেখে এগোবেন…এরকম পথচলতি কথোকপথন অহরহ কানে ভাসবে এই দৈব সম্মেলনে। শুধু গঙ্গা যমুনা অন্তঃসলিলা সরস্বতী নয়। এই নদীতীরের তাঁবুনগরীর অন্যতম ভরকেন্দ্র যেন ওই কেল্লাও।

কাল এসেছি কুম্ভমেলায়। এলাহাবাদ। এখন যার নাম প্রয়াগরাজ। উত্তরদিক থেকে ঠিক সূর্যোদয়ের পর একটা ঠাণ্ডা বাতাস আসছে। সে বাতাসের গিয়ে মেশার কথা ওই ত্রিবেণী সঙ্গমে। যেখানে হাজার হাজার মানুষ রাত্রিদিন অঞ্জলী ভরে করে নিচ্ছেন এই নশ্বর জীবনের পাপমুক্তির আচমন। কিন্তু প্রতিদিন দেখছি সেই বাতাস নিজের রুটিন ভুলে হঠাৎ এই পূণ্যচক্রের আবর্তে কেমন যেন উদাসী হয়ে যাচ্ছে। নির্দিষ্ট সময়ে তার আর সঙ্গমে পৌঁছনো হচ্ছে না। সে প্রতিদিনই  বেলাশেষে ত্রিবেণীর জলকে উত্তরের বার্তা পৌঁছে দিচ্ছে ঠিকই। তবে তার আগে তার যেন ইচ্ছে করছে ভারতের প্রতিটি প্রান্ত থেকে আসা লক্ষ লক্ষ ব্যক্তিগত কাহিনীতে কান পাততে। ওই তো একটুকরো বিহার এসে লাইন দিয়েছে দশনামী আখড়ার কথকতায়। ভিড়ের মধ্যে তাকে মৃদু ধাক্কা মেরে মধ্যপ্রদেশের সাগর জেলা উদগ্রীব হয়ে ছুটে গেল হঠাৎ হারিয়ে ফেলা স্বামীকে খুঁজতে। অন্ধ্রপ্রদেশের অনন্তপুর জেলা লাগাতার মন্ত্রোচ্চারণ করে চলেছে তিরুপতি সেবা সম্মেলনের তোরণের নীচে। আর তারই আবহ হয়ে দাঁড়িয়ে ওই কেল্লার সামনে বসেছে এক জনসঙ্গম। ওই যে পুরুলিয়া থেকে এসেছে সাতজনের এক কীর্তনের দল। সুবল সরকার বাঁশি বাজান সেই দলে। বছরের যে কোনও সময় তাঁর গ্রামের আশ্রমে গেলে দেখা যাবে সকালে বাগানে ঢুকে মাটি কর্ষণে মগ্ন তিনি। তাঁর হাত ধরে ওই মাটিতে জন্ম নিয়ে চলেছে অবিরত গাঁদা, গোলাপ, চন্দ্রমল্লিকা। আবার গ্রাম থেকে গ্রামে ঋতুবদলের সন্ধিক্ষণের সন্ধ্যাগুলিতে অষ্টপ্রহর নৌকাবিলাস কিংবা রাখার মানভঞ্জন আসরে ওই মাটি লাগা হাতে তৈরি হয় একটি করে বাগেশ্রী, একটি করে শ্যামকল্যাণ। দুঃখসাগরে ভেসে যাওয়ার রাধারাণীর আকুলতা। সুবল সরকারদের হাতে কিংবা শ্বাসে কোনও অলৌকিকতা নেই। আসলে তাঁদের হৃদয়ে রয়েছে একাগ্রতার এক জেদি নিবিষ্ট বিশুদ্ধতা। যে বিশুদ্ধতাগুলিতে টেলিভিশনের রিয়ালিটি শোতে যাওয়ার তাড়না নেই। তুমি কী জানো কৃষ্ণচুড়া, কলেজ স্ট্রিট ছাড়িয়ে হাওড়া স্টেশনের দিকে হাঁটার সময় বাঁদিকে যে একের পর এক ব্যাণ্ডের দোকানগুলি চোখে পড়ে, তার কালো, রোগা, অপুষ্টিজনিত শরীরে বেখাপ্পার মতো উজ্জ্বল, ঝলমলে রঙীণ পোশাক পরা মানুষগুলি যখন সোদপুরের বিয়েবাড়ির অনুষ্ঠানে ভোরে লাইন দিয়ে বাজাতে বাজাতে যায় একের পর এক জনপ্রিয় সুরের গান, তাঁদের কেউ আসলে রাণাঘাটের ভ্যানচালক, কেউ বারুইপুরের মজুর অথবা কেউ ইলিয়ট রোডের ফেরিওয়ালা। এই যে সারাবছর দাঁতে দাঁত চেপে পেটের লড়াই করতে হয় তাঁদের, সেসবের মধ্যেও প্রতিটি হৃদয়ে রয়েছে একটি করে মৌলিকতা। কেউ অসাধারণ যাত্রা অভিনেতা। কেউ হারমোনিয়ামে সিদ্ধহস্ত। কেউ হয়তো চমৎকার কীর্তনগায়ক। জীবনযুদ্ধ তাঁদের ওইসব সুরের দেশ থেকে সরিয়ে এনেছে হয়তো। কিন্তু মনের আকুলতা কোথায় যাবে? তাই এই মানুষগুলো  খুঁজে নেয় নিজেদের মতো করে এক টুকরো মরুদ্যান। সুযোগ পেলেই ডুবে যান ওই নিহিত ভালো লাগার কাজগুলিতে। এই অসংখ্য সুবল সরকাররা কুম্ভমেলায় এসেছেন সেই মরূদ্যানে দু দণ্ড বসতে।

কুম্ভমেলায় আমি প্রতিবার কেন আসি? কারণ এই বোধহয় এমন একটা সাম্যসমাজ যেখানে কোনও বৈষম্য বসার জায়গা পায় না। সামাজিক বৈষম্যের, আর্থিক বৈষম্যদের জন্য এই মেলার বাইরের গেটে টাঙানো থাকে নো এন্ট্রি। মাঘী পূর্ণিমা অথবা মকর সংক্রান্তিতে তাই এলাহাবাদের ত্রিবেণী সংগম অথবা উজ্জয়িনীর শিপ্রা নদী কিংবা নাসিকের গোদাবরীস্রোতে পাশাপাশি ডুব দেন কোটিপতি আর দিনমজুর। উত্তরপ্রদেশের যে চতুর্বেদী ব্রাহ্মণ পূণ্যস্নানের পর ভারসাম্য রাখতে নদীতটে উঠতে সামনে দাঁড়ানো মানুষটির দিকে হাত বাড়িয়ে সাহায্য চান হেসে, তিনি কখনও জানতেই চান না ওই বাড়িয়ে দেওয়া হাতের মালিকের জাতগোত্র কী। প্রতিদিন আশ্রমে আশ্রমে একই ভাণ্ডারায় পাশাপাশি বসে কুম্ভের পূণ্যধুলো মেশা খিচুড়ি আর সবজিতে তৃপ্তির বাষ্প বুকে ভরে নিচ্ছেন ব্যাংকের অফিসার আর এক রিকশচালক।  কেউ জানে না পাশের লোকটির আয় কত। পাশের লোকটির টাইটেল কী। পাশের লোকটির সামাজিক সম্মান কোন স্তরে। এই একটি স্থান যেখানে সম্ভবত সকলেই সমান। সকলের বুকে ঝোলানো আসলে অদৃশ্য একটি আইডেন্টিটি কার্ড, যার নাম পূণ্যকুম্ভের পূণ্যাত্মা। এখানে হাঁটতে গিয়ে পড়ে যাওয়ার আগেই তোমাকে কেউ একজন হাত বাড়িয়ে ধরে ফেলবে।  এখানে তোমার পাশে দাঁড়িয়ে বাড়িতে থাকা মেয়ের জন্য ঝুটো মুক্তের কানের দুল কিনতে কিনতে অপরিচিত হলেও তোমাকে আপনজনের মতো কোনও এক দ্বিধাগ্রস্ত  বাবা বলবেন, দ্যাখো তো মা, কেমন হবে এটা?  তাই কুম্ভ কোনও মেলা নয় কৃষ্ণচুড়া। ঈশ্বরের নিজস্ব বাগান। যে বাগানের রঙবেরঙের ফুল ভারতবাসী। প্রতিটি ফুলের নিজস্ব সৌরভ আছে। আছে একটি করে কাহিনী। যে কাহিনী শুনে বেড়ায় সারাদিনের উত্তুরে বাতাস। কেউ ব্রাত্য নয় যেখানে। কুম্ভ তাই একটি আশ্চর্য হৃদয়পুর! আজ এখানেই শেষ করি। ভালো থেকো।

ইতি ঋজু

(রচনা – সমৃদ্ধ দত্ত)