জাপানে রেওয়া যুগের সূচনা

For Sharing

আজ পয়লা মে ২০১৯ তারিখে জাপানে হেইসেই যুগের অবসান ও নতুন রেওয়া যুগের সূচনা হল। দিনটি প্রকৃত অর্থেই জাপানের  এক ঐতিহাসিক দিন হিসেবে বিশ্ব ইতিহাসে স্থান করে নিল। এই দিনই জাপানের ১২৬ তম সম্রাট হিসেবে নারুহিতো তাঁর পিতা সম্রাট আকিহিতো’র স্থলাভিষিক্ত হলেন।  ১৮১৭ থেকে জাপানের রাজতন্ত্রের ইতিহাসে এই প্রথম একজন সম্রাট জীবদ্দশাতেই সিংহাসন তাঁর পুত্রকে ছেড়ে দিলেন। দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধ পরবর্তী সময়ে রচিত জাপানের নতুন গণতান্ত্রিক সংবিধানে রাজতন্ত্রকে  দেশের ঐতিহ্যের ধারক একটি নিছক প্রতীকী প্রতিষ্ঠান হিসেবে স্বীকৃতি দেবার পর আকিহিতো ছিলেন দেশের প্রথম সম্রাট। গতকাল এপ্রিলের ৩০ তারিখে পাই চেম্বারের ইমপিরিয়াল রাজপ্রাসাদে সিংহাসন থেকে সরে দাঁড়ানোর আনুষ্ঠানিক বিধিনিয়ম সম্পন্ন হল। সম্রাট হিসেবে নারুহিতো’র রাজ্যাভিষেক অনুষ্ঠান নির্ধারিত রয়েছে আগামী অক্টোবর মাসে।  গতকালের এই অনুষ্ঠান উপলক্ষ্যে জাপানের প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবে দেশের সেবায় সম্রাট আকিহিতো’র অসামান্য অবদানের উল্লেখ করেন এবং সমগ্র দেশবাসীর পক্ষ থেকে জাপানকে এক শান্তিপূর্ণ ও সমৃদ্ধিশালী দেশ হিসেবে এগিয়ে নিয়ে যাবার সংকল্প পুনর্ব্যক্ত করেন।

জাপানে এক নতুন যুগের নামকরণ দেশটির ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। সেই ৬৪৫ খ্রীস্টাব্দ থেকে এই প্রথা চালু রয়েছে। প্রতিটি যুগ এক এক জন সম্রাটের রাজত্বকালের মেয়াদের পরিচয় বহন করে। যেমন গতমাসের এক তারিখে জাপানের মন্ত্রীসভা এই নতুন যুগের নাম করণ করেন Reiwa-রেওয়া, যার অর্থ “সুন্দর সমন্বয়”। এই শব্দটি চয়ন করা হয়েছে প্রায় ১২০০ বছর আগে জাপানের কাব্য সংকলন-মানিওশু-Manyoshu  থেকে। উল্লেখ্য, ১৯৮৯ সাল থেকে চলে আসা প্রায় তিন দশক ব্যাপী Heisei বা হেইসেই- যুগের অবসান হল গতকাল ৩০’এ এপ্রিল। এর আগে Showa বা শোওয়া যুগ চলে ১৯২৬ থেকে ১৯৮৯ পর্যন্ত। এই যুগই এ পর্যন্ত জাপানের ইতিহাসে সব চেয়ে দীর্ঘ সময় ব্যাপী যুগ।

জীবদ্দশাতেই কোনও সম্রাটের সিংহাসন থেকে সরে দাঁড়ানোর সংস্থানটি  জাপানের সংসদে ২০১৭ সালে অনুমোদিত হয়, যখন সম্রাট আকিহিতো তাঁর স্বাস্থ্যের কারণে এই ইচ্ছা ব্যক্ত করেন। দেশের মানুষ শ্রদ্ধাবনত চিত্তেই সম্রাটের এই ইচ্ছা মেনে নেয়। সম্রাট আকিহিতো তাঁর প্রায় তিন দশক ব্যাপী শাসনে অত্যন্ত দক্ষতা ও নিষ্ঠার সঙ্গে নিজেকে দেশবাসীর সেবায় নিয়োজিত করেন। ভয়াবহ প্রাকৃতিক বিপর্যয় সহ যে কোনও সংকটের মোকাবিলায় তাঁর নির্দেশিত পথ দেশবাসীকে সাহস ও প্রেরণা যুগিয়েছে। তাঁর শাসনকালেই ভারত-জাপান মৈত্রী এক নতুন উচ্চতায় উন্নীত হয়েছে। ভারত-জাপান কূটনৈতিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার ৬০-তম বার্ষিকী উপলক্ষ্যে ২০১৩ সালে সম্রাট আকিহিতো ও সম্রাজ্ঞী মিচিকো ভারত সফরে আসেন।এর আগে ১৯৬০ সালে তিনি তৎকালীন যুবরাজ হিসেবে সস্ত্রীক নতুন দিল্লি সফর করেন।

সদ্য সমাপ্ত Heisei বা  হেইসেই- যুগে জাপানে উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে নানা চ্যালেঞ্জও দেখা দিয়েছে, যেগুলির অত্যন্ত বিচক্ষণতার সঙ্গে মোকাবিলার প্রয়োজন। জাপানে এখন মোট ঋণ ও জিডিপি অনুপাত বিশ্বের মধ্যে সর্বাধিক।  দেশটির অর্থব্যবস্থায় কাঠামোগত সংস্কার অত্যন্ত প্রয়োজন। দেশটি এখন চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের দিকে তাকিয়ে। তাছাড়া জাপান এখন আন্তর্জাতিক মহল থেকে তীব্র অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতা ও রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন। একটি শান্তিপুর্ণ ও উদারনৈতিক আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা গড়ে তোলার ক্ষেত্রে জাপানকে ক্রমশ অধিক সক্রিয় ভূমিকা গ্রহণ করতে হবে। একদিকে উত্তর কোরিয়ার পরমাণু ও ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি ও অন্যদিকে পূর্ব চীন সাগর অঞ্চলে  চীনের ক্রমবর্ধমান আগ্রাসন মূলক আচরণ জাপানের সামনে মারাত্মক নিরাপত্তা সমস্যা সৃষ্টি করেছে। সামগ্রিক পরিস্থিতি বিচার করে একদিকে তার নিরাপত্তা কাঠামো ঢেলে সাজাতে হবে এবং অন্য দিকে একটি মিত্র দেশ হিসেবে ভারত ও আমেরিকার সঙ্গে সম্পর্ক ক্রমাগত মজবুত করার মাধ্যমে ভারত-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে শান্তি ও সৌভ্রাতৃত্বের আদর্শ প্রতিষ্ঠায় তাকে এক বৃহত্তর ভূমিকা পালন করতে হবে। Reiwa-রেওয়া যুগের সুচনা এই দিক থেকে অত্যন্ত তাপর্যপূর্ণ। মূল রচনাঃ-ডঃ তিতলি বসু)