আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদীদের তালিকায় আজহারঃ ভারতের কূটনৈতিক জয়

For Sharing

পাকিস্তান ভিত্তিক জঙ্গী গোষ্ঠী জায়েশ-এ-মহম্মদের প্রধান মাসুদ আজহারকে রাষ্ট্রসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের ১২৬৭ কমিটির নিষেধাজ্ঞার  তালিকায় শেষ পর্যন্ত একজন আন্তর্জাতিক জঙ্গী হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এর অর্থ হল আজহারের সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত হবে, ভ্রমণ নিষিদ্ধ হবে এবং রাষ্ট্রসংঘ সদস্য দেশগুলি তার বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা জারী করবে। ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রক এই সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছে এবং সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের বিষয়ে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের অঙ্গীকার পালনের দিশায় সঠিক পদক্ষেপ বলে অভিহিত করেছে। রাষ্ট্রসঙ্ঘে ভারতীয় কূটনিতিকদের উচ্চস্তরে জোর তৎপরতা এবং সম্প্রতি ভারত ও চীনের মধ্যে  আলোচনা বৃদ্ধির ফলেই সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে দীর্ঘ প্রতিক্ষিত এই সাফল্য অর্জিত হয়েছে।

এটি নিঃসন্দেহে ভারতের কূটনৈতিক জয়। ২০০৯ সালে ভারত ২৬/১১র মুম্বাই জঙ্গী হামলার মূল চক্রী আজহারকে এই তালিকাভূক্ত করার প্রয়াস শুরু করে। তবে বার বার কারিগরি কারণে চীনের প্রতিবন্ধকতার দরুণ ফ্রান্স এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থন সত্বেও ভারত এই সাফল্য পায় নি।

এই প্রেক্ষাপটে ভারত-চীন সম্পর্ক উন্নয়ন উল্লেখযোগ্য। যদিও ভারত দ্বিতীয় বেল্ট এবং রোড ফোরাম বি আর এফ এ  যোগ  দেয় নি, ফোরামের মাত্র চার দিন আগে ভারতের পররাষ্ট্র সচিব বিজয় গোখলে দুদিনের সফরে চীনে যান। এই বৈঠকের সরকারী আলোচ্যসূচি ছিল নিয়মিত কূতনৈতিক পরামর্শ। যদিও কোনো সরকারী ঘোষণাপত্র জারী করা হয় নি; তবে আলোচনার অন্যতম বিষয় ছিল ইউ এন এস সিতে আজহারকে তালিকাভুক্ত করা নিয়ে কথাবার্তা।

পুলওয়ামা আক্রমণের আগে ২০১৯এর মার্চে আজহারকে নিষিদ্ধ করার ভারতের চতুর্থ প্রয়াসে চীন কারিগরি প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে। JeM এই আক্রমনের দায়  স্বীকার করে।  চীন ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের বিষয়ে গুরুত্ব দেয়। ২০১৮র এপ্রিলে উহান শিখর সম্মেলনে দুই শীর্ষ নেতার কথাবার্তার পর থেকেই ভারত –চীন  সম্পর্ক উন্নতির দিশায় এগিয়ে চলছিল। বস্তুতপক্ষে চীনের বিদেশ মন্ত্রী এবং স্টেট কাউন্সিলর ওয়াং ই শ্রী গোখলের সফরের কয়েকদিন আগে মন্তব্য করেন যে চীন ভারতের প্রধান মন্ত্রী এবং চীনের রাষ্ট্রপতির মধ্যে দ্বিতীয় ঘরোয়া  শিখর বৈঠকের প্রস্তুতি নিচ্ছে। এ বছরের শেষের দিকে এই সম্মেলন অনুষ্ঠিত হবে।

উহানের মত বৈঠক সম্পর্ক মজবুত করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ভারত ও চীনের মধ্যে দীর্ঘ দিনের সীমান্ত সমস্যা রয়েছে যার সমাধানের জন্য ধারাবাহিক আলোচনা প্রয়োজন। উভয়ের পক্ষে জরুরী হল সীমান্ত অঞ্চলে শান্তি এবং স্থিতীলতা বজায় রাখা। নিয়মিত আলোচনার মাধ্যমেই কেবল অন্যান্য প্রশ্নের সমাধান করা যেতে পারে।

আজহারের বিষয়ে চীনের কারিগরি প্রতিবন্ধতা সরিয়ে নেওয়ার অন্য কারণ হল চীনের অবস্থানের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের ক্রমাগত সমালচনা। ভারত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্স, এবং ব্রিটেনের মত দেশের আনর্জাতিক সমর্থন পেয়ে আসছে। চীনের এই সিদ্ধান্তের সম্ভাব্য কারণ হতে পারে বি আর  আই কেন্দ্রিক বিতর্কের মধ্যে তাদের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক সমালোচনা কম করা।  চীন বি আর আই কে আরো সর্বাত্মক এবং স্বচ্ছ করে তোলার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।

JeM এর মত জঙ্গী গোষ্ঠীগুলি কেবল ভারতের জন্যই নয়- সমগ্র বিশ্বের কাছে এক চ্যালেঞ্জ। শ্রীলংকা সন্ত্রাসবাদের সাম্প্রতিকতম শিকার, সেখানে আড়াইশোর বেশি মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন। সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে ভারতের লড়াইয়ের প্রতি চীনের সংবেদনশীলতা প্রদর্শনের এই সিদ্ধান্ত আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা এবং বিশ্ব-শান্তির ক্ষেত্রে সহায়ক হবে। এই সিদ্ধান্ত উল্লেখ করে যে ভারত রাষ্ট্রীয় মদতপুষ্ট জঙ্গীবাদের শিকার এবং JeM এর মত জঙ্গী গোষ্ঠীগুলি যাতে সন্ত্রাসবাদের আতুর ঘর হয়ে না ওঠে তার জন্য পাকিস্তানের ওপর আন্তর্জাতিক চাপ সৃষ্টি করতে হবে। গুরুত্বপূর্ণ অচলাবস্থার নিরসনে ভারত-চীন সম্পর্ক সফল হয়েছে এবং আরো গঠনমূলকভাবে তারা এগিয়ে চলেছে। (মূলরচনাঃ সানা হাশমি)