মাসুদ আজহার প্রসঙ্গ এবং চীন ও পাকিস্তানের অবস্থান

For Sharing

চীন গত ১লা মে মাসুদ আজহারকে রাষ্ট্রসংঘের নিষিদ্ধ তালিকাভূক্ত করা সংক্রান্ত প্রস্তাবের ওপর তাদের আপত্তি প্রত্যাহার করেছে। চীন ২০০৯ সাল থেকে মাসুদ আজাহারকে আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদী হিসেবে চিহ্নিত করার লক্ষ্যে রাষ্ট্রসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের প্রয়াসকে ক্রমাগত বাধা দিয়ে এসেছে। পেইচিং ২০১৬ থেকে ২০১৯’এর মধ্যে অন্তত তিনবার এই প্রস্তাবে বাধাদান করেছে। জঙ্গী সংগঠন জৈশ এ মহম্মদের পাঠানকোট হামলার ঘটনার পরেই ২০১৬’র ফেব্রুয়ারি মাসে এ বিষয়ে পদক্ষেপ নেওয়া হয়। আন্তর্জাতিক চাপ উপেক্ষা করে চীন ঐ প্রস্তাব সাময়িক স্থগিত রাখা নয়, তাতে সম্পূর্ণভাবে বাধাদান করে।

ভারতের সিআরপিএফ বাহিনীর ওপর রক্তক্ষয়ী হামলার ঘটনার পর মার্চ ২০১৯’এ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্স ও ব্রিটেনের আজহারকে তালিকাভূক্ত করার প্রস্তাবটির ওপরেও চীন ‘টেকনিক্যাল হোল্ড’ জানায়। যদিও চীন ঐ ঘটনার নিন্দা করে এবং এর প্রতিক্রিয়ায় সন্ত্রাসবাদের মোকাবিলায় জৈশ-এ মহম্মদের জঙ্গি শিবিরগুলির ওপর ভারতের বোমা বর্ষণের সিদ্ধান্তকে পরোক্ষে সমর্থন জানায়।

প্রতিবেশীদেশগুলিকে লক্ষ্য করে পাকিস্তানের ভূমিতে উদ্ভূত সন্ত্রাসবাদী  কর্মকান্ডের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য ইসলামাবাদের ওপর ক্রমবর্ধমান  আন্তর্জাতিক চাপের প্রেক্ষিতে, চীনের এই অবস্থানের বিষয়ে অনুমান করা যায়।  পুলওয়ামা হামলার সঙ্গে মাসুদ আজহারের কোনো সম্পর্ক নেই এবং এটি পাকিস্তানের ভাবমূর্তি বিনষ্ট করার অপচেষ্টা মাত্র – একথা উল্লেখ করে চীন এ বিষয়ে একটি নিরপেক্ষ প্রস্তাবের পক্ষে সওয়াল করে।

ভারতের সক্রিয় কূটনৈতিক প্রয়াসের ফলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বিষয়টিকে সংশ্লিষ্ট কমিটির কাছ থেকে ২৭শে মার্চ রাষ্ট্রংঘ নিরাপত্তা পরিষদে আনার প্রয়াস নেয়। চীন এ বিষয়ে তাদের উদ্বেগের কথা জানায়। এর পরবর্তী দিনগুলিতে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে আলোচনার জন্য চীন কূটনৈতিক প্রয়াস নেয় এবং এ বিষয়ে বিশেষ আলোচনা হয়। ইমরান খান সম্প্রতি বিআরআই সম্মেলনে যোগদানের জন্য তাঁর চীন সফরকালে এ বিষয়ে পাকিস্তানের ভাবমূর্তি বিনষ্ট না ক’রে এবং পাকিস্তানের নাম উল্লেখ না ক’রে প্রস্তাবটির বিষয়ে অগ্রসর হওয়ার ক্ষেত্রে সম্মত হন। ভারতের পররাষ্ট্র সচিবের চীন সফরকালেও চীনের বিদেশ মন্ত্রী ওয়াং ই সহ শীর্ষ আধিকারিকদের সঙ্গে এ বিষয়ে আলোচনা হয়।

চীনের সিদ্ধান্তে এই পরিবর্তন থেকে এটা স্পষ্ট যে, চীনের নীতি নির্ধারকরা এই  বাস্তবটি অনুধাবন করতে পেরেছেন যে, মাসুদ আজহারকে আন্তর্জাতিক জঙ্গির তালিকাভূক্ত করার বিষয়ে ব্যাপক আন্তর্জাতিক সমর্থন থাকা সত্বেও এর ওপর চীনের ক্রমাগত আপত্তি ও বাধাদান, আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে চীনের অবস্থান জটিল করবে এবং সন্ত্রাসবাদের মোকাবিলার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আন্তর্জাতিক প্রয়াসে চীন একা হয়ে পড়বে। এ ক্ষেত্রে ভারত ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র একজোট হওয়ায় চীনের কাছে এই বার্তা পৌঁছেছে যে, আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে যাতে হাস্যস্পদ হতে না হয় তার জন্য চীনকে তাদের অবস্থান পরিবর্তনের বিষয়ে একটি যুক্তিগ্রাহ্য অজুহাত খুঁজতে হবে।

অন্যদিকে পাকিস্তানের দেওয়া পিঠ ঠেকে যাওয়ায় তারা চীনের এই অবস্থান পরিবর্তনের বিষয়ে কোনো প্রতিক্রিয়া জানায় নি। ইসলামাবাদ দাবি করেছে, চীনের সিদ্ধান্ত পরিবর্তনে তারা অনুঘটকের ভূমিকা পালন করেছে। আর্থিক পদক্ষেপ গ্রহণ সংক্রান্ত টাস্ক ফোর্সের তালিকাভূক্ত হওয়ার আশংকার প্রেক্ষিতে পাকিস্তানকে সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে সক্রিয় প্রয়াস গ্রহণের সদিচ্ছা প্রকাশ করতেই হবে।

আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদীর তালিকাতে মাসুদ আজহারের নাম অন্তর্ভূক্ত হওয়ার বিষয়টি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতের জন্য একটি উল্লেখযোগ্য কূটনৈতিক সাফল্য। তবে ভারতকে এই অনুকূল পরিস্থিতির যথাযথ ব্যবহার করতে হবে। আজহারের নাম তালিকাভূক্ত হলেই পাকিস্তানে ভারতের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসবাদী পরিকাঠামো ধ্বংস হবে এমন নয়।

এক দশক আগে ঐ একই কমিটি হাফিজ সইদের নামও তালিকাভূক্ত করা সত্বেও সে আজও পাকিস্তানে স্বাধীনভাবে বসবাস করছে, অর্থ সংগ্রহ করছে  এবং কাশ্মীর নিয়ে ভারতের বিরুদ্ধে বিষোদ্গার করে চলেছে। সুতরাং সীমান্ত পারের সন্ত্রাসের বিষয়ে ভারতের উদ্বেগের মোকাবিলায় আজহারের বিরুদ্ধে সক্রিয় পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য পাকিস্তানের ওপর চাপ বজায় রাখতে হবে।

(মূল রচনা – অশোক বেহুরিয়া)