দ্বিপাক্ষিক উত্তেজনার মধ্যেই আফগানিস্তান-পাকিস্তান আলোচনা

For Sharing

পাকিস্তান ও আফগানিস্তান, তাদের ভৌগলিক নৈকট্যের কারণে পরস্পরের স্বার্থেই আঞ্চলিক সংযোগ ব্যবস্থার প্রসার, সামাজিক তথা অর্থনৈতিক উন্নয়ন, দারিদ্র দূরীকরণ  ও সামগ্রিক অর্থে দুদেশের জনগণের সার্বিক সমৃদ্ধির লক্ষ্যে সচেষ্ট হবার সংকল্প ব্যক্ত করেছে।

এরই অঙ্গ হিসেবে আফগান রাষ্ট্রপতি আশরাফ গণি এই প্রথম পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানকে টেলিফোন করেন; এবং দুই নেতা আফগানিস্তান ও সমগ্র অঞ্চলে শান্তি, নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক উন্নতির প্রসঙ্গ সহ দ্বিপাক্ষিক স্বার্থ জড়িত বিভিন্ন বিষয় নিয়ে মতামত বিনিময় করেন।

এই আলোচনায় পাক প্রধানমন্ত্রী দুটি দেশের জনগণের স্বার্থেই পারস্পরিক অবিশ্বাস ও সন্দেহ পিছনে রেখে সামগ্রিক সমৃদ্ধির লক্ষ্যে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করতে আগ্রহ প্রকাশ করেন।

আফগান রাষ্ট্রপতি আলোচনার হাত বাড়িয়ে দিলেও বাস্তব পরিস্থিতির নিরিখে ইসলামাবাদকেই যে এ বিষয়ে অগ্রণী ভূমিকা গ্রহণ করতে হবে সে বিষয়ে সন্দেহের কোনও অবকাশ নেই। পাক গোয়েন্দা সংস্থা- ISI ও  হাক্কিনি গোষ্ঠী  কাবুল সরকারের ওপর ক্রমাগত চাপ সৃষ্টি করে যাচ্ছে। আর তাতে মদত দিচ্ছে পাকিস্তান সরকার। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, পাকিস্তানের প্রশ্রয়ে সে দেশে সক্রিয় একাধিক জঙ্গি সংগঠন আফগানিস্তানে বেশ কয়েকবার সন্ত্রাসবাদী হামলা চালিয়েছে।

এদিকে ভারত সবসময়েই আফগানিস্তানের সরকার ও সে দেশের জনগণের পাশে আছে। যুদ্ধ বিধ্বস্ত আফগানিস্তানের অর্থনৈতিক পুনর্গঠনে নতুন দিল্লি প্রায় ২০০ কোটি মার্কিন ডলার সহায়তার অঙ্গীকার করেছে। ইতিমধ্যে ভারতের প্রত্যক্ষ আর্থিক সহায়তায় সে দেশের সংসদ ভবন পুনর্নির্মাণ সহ   সামাজিক ও অর্থনৈতিক পরিকাঠামো উন্নয়নের অঙ্গ হিসেবে একাধিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল,  প্রশিক্ষণ কেন্দ্র, জলাধার, মহাসড়ক নির্মাণ করা হয়েছে। এই সব প্রকল্প নির্মাণের কাজে নিয়োজিত ভারতীয় শ্রমিকদের মধ্যে অনেকেই সন্ত্রাসবাদের শিকার হয়েছেন। নতুন দিল্লি ভারতের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে আফগান শিক্ষার্থীদের পড়াশুনায় বৃত্তির সুবিধাও দিচ্ছে।

নতুন দিল্লির অভিমত, বাইরে থেকে সন্ত্রাসবাদীদের সহায়তা বন্ধ হলে তবেই আফগানিস্তানে প্রকৃত অর্থে শান্তি ফিরিয়ে আনা সম্ভব। ২০০১ সালে আফগানিস্তানে তালিবানদের পতনের পর থেকে কাবুল সরকার শত প্রতিকূলতা সত্বেও দেশে  গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার আন্তরিক চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে; এর প্রেক্ষিতে প্রতিবেশী দেশগুলির পবিত্র দায়িত্ব হল আফগানিস্তানে গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করতে সহায়তার হাত বাড়িয়ে দেওয়া। কিন্তু বাস্তব পরিস্থিতি বলে, আফগানিস্তনের অভ্যন্তরীণ দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে  পাকিস্তানের মদতপুষ্ঠ অশুভ শক্তিগুলি আফগান জনগনের গণতান্ত্রিক পরীক্ষা নিরীক্ষার ওপর বার বার আঘাত হানছে।

পাক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান, তাঁর সঙ্গে আশরাফ গণির টেলিফোনে বার্তালাপের সময় দ্বিপাক্ষিক স্বার্থ জড়িত সকল বিষয়ে আলোচনার জন্য আফগান রাষ্ট্রপতিকে আমন্ত্রণ জানালেন। উল্লেখ করা যেতে পারে, আফগানিস্তানের ভূমিতে সক্রিয় সন্ত্রাসবাদীদের হামলায় তিন পাক সেনার মৃত্যুর চার দিন পর ইমরান খান ও আশরাফ গণির মধ্যে এই সর্বশেষ আলোচনা।

এদিকে দুটি দেশের সেনা বাহিনীর মধ্যে ছোট খাট সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেই চলেছে। এ মাসের প্রথম দিকে পাকিস্তানের উত্তর ওয়াজিরিস্তান উপজাতি জেলার আলওয়ারা গ্রামে আফগান সেনার হামলায় সাত পাক সেনা আহত হয়।

এই সব ঘটনার পাশাপাশি  আফগানিস্তানে শান্তি প্রক্রিয়া এগিয়ে নিয়ে যাবার লক্ষ্যে কাতারের দোহায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও তালিবানদের মধ্যে আর এক দফার বৈঠক সম্পন্ন হল। তালিবানদের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, আফগানিস্তান থেকে মার্কিন নেতৃত্বাধীন জোট বাহিনী প্রত্যাহারের প্রশ্ন সহ কিছু বিবাদমূলক বিষয়ের নিষ্পত্তি না হওয়ায় এই বৈঠকে এখনও কোনও উল্লেখযোগ্য সাফল্য পাওয়া যায় নি। দোহা বৈঠকের আগে শান্তি আলোচনায় অংশগ্রহণকারী মার্কিন প্রতিনিধিদলের নেতা জালমে খলিলজাদ ও তালিবান সহকারী নেতা মুল্লা আবদুল গণি বারাদার’এর মধ্যে আলোচনা হয়।

তালিবানদের বিষয়ে ভারতের অবস্থান অত্যন্ত স্পষ্ট। নতুন দিল্লির চোখে  তালিবান একটা সন্ত্রাসবাদী সংগঠন ছাড়া আর কিছুই নয়।  কাজেই এদের সঙ্গে যে কোনও শান্তি আলোচনায় উদ্যোগী হবার  অর্থ হল এই জঙ্গি গোষ্ঠীকে সমগ্র মানব জাতির সামনে প্রাসঙ্গিক করে তোলা। (মূল রচনাঃ- পদম সিং)