মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে তালিবানদের সঙ্গে আলোচনা পুনর্বিবেচনা করতে হবে

For Sharing

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সব ধরণের সন্ত্রাসবাদ নির্মূলকরণে তার প্রতিজ্ঞা থেকে কিছুটা হলেও সরে এসেছে বলেই অনুমান করা যাচ্ছে। গত বছরের জুলাই মাস থেকে  তালিবানদের সঙ্গে আলোচনায় ওয়াশিংটনের উদোগ এর প্রমাণ বহন করছে। গত সপ্তাহে কাতারের দোহায় শুরু হওয়া ষষ্ঠ দফার আলোচনা এখনও চলছে। তবে এই আলোচনায় এ পর্যন্ত কোনও অগ্রগতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে না। তালিবানদের সঙ্গে এই বার্তালাপে মার্কিন প্রতিনিধি দলের প্রধান জালমে খলিলজাদ জানিয়েছেন,আফগানিস্তান থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহার, সন্ত্রাসবাদ দমনে গ্যারান্টি প্রদান, দীর্ঘস্থায়ী সংঘর্ষ বিরতি ও রাজনৈতিক সুস্থিতির  স্বার্থে আফগান কর্তৃপক্ষের সঙ্গে তালিবানদের আলোচনা শুরু করার প্রশ্নই আলোচ্য সূচিতে প্রাধান্য পায়।

উল্লেখ করা যেতে পারে, সেই ২০০১’এর সেপ্টেম্বর মাসে নিউইয়র্কের ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারে ভয়াবহ জঙ্গী হামলার পরেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আফগানিস্তানে তালিবানদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে প্রত্যক্ষ ভাবে জড়িয়ে পড়ে। এই ঘটনার প্রেক্ষিতে ওয়াশিংটন সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে; ও ওই আক্রমণের পিছনে যার হাত ছিল বলে সে মনে করে-সেই আলকায়দা ও তার নেতা ওসামা বিন লাদেনকে নিশ্চিহ্ন করার সংকল্প গ্রহণ করে। এরই সঙ্গে   ওয়াশিংটন, আফগানিস্তানে আল কায়দা ও তার নেতাকে আশ্রয়দানকারী তালিবানদের নির্মূল করারও অঙ্গীকার গ্রহণ করে।

অর্থাৎ, ২০০১’র সেপ্টেম্বরের ঘটনার পর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, যে কোনও ধরণের সন্ত্রাসবাদ হোক না কেন, তা সব নির্মূল করতে বার বার তার প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করে। তবে গত বছরে ওয়াশিংটন  সন্ত্রাসবাদীদের “ভাল”  ও “মন্দ”- এই দুই শ্রেণিতে ভাগ করার বিষয়টি যুক্তিগ্রাহ্য বলে ঘোষণা করলে সন্ত্রাসবাদ দমনে সে তার আগেকার অবস্থান  থেকে কিছুটা সরে  এল বলেই মনে হয়।  প্রকৃত অর্থে সন্ত্রাসবাদীদের মধ্যে ভাল বা মন্দ- এমন কোনও শ্রেণি বিভাগ করা যায় না। আন্তর্জাতিক মহলও অনুরূপ  অভিমত পোষণ করে। বিশ্ব জনমত বলে, রাজনৈতিক উদ্দেশ্য চরিতার্থ করতে সন্ত্রাসবাদীদের এই ধরণের শ্রেণি বিভাগ করলে এক দিকে যেমন   মানব সমাজের সামনে এই সমূহ বিপদকে নির্মূল করার সংকল্প দুর্বল হয়ে পড়ে; অন্য দিকে চরমপন্থী মতাদর্শ সমাজে তার প্রভাব আরও বেশি করে বিস্তার করে, যার অনিবার্য পরিণাম হল  জঙ্গি হামলার ঘটনায় বৃদ্ধি।

গত বছর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তালিবানদের সঙ্গে  আলোচনার সিদ্ধান্ত নেবার পর এ বছরের প্রথম দিকে আফগানিস্তান থেকে ওই দেশ আংশিক সেনা প্রত্যাহারের কথা ঘোষণা করে। এর বিরুদ্ধে সর্বস্তরে ওয়াশিংটনকে সমালোচনার মুখে পড়তে হয়;  যার জেরে মার্কিন প্রতিরক্ষা মন্ত্রী জিম ম্যাটিস পদত্যাগ করেন।

এর আগে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আফগানিস্তানের ওপর তালিবানদের নিয়ন্ত্রণ শিথিল করার লক্ষ্যে কিছুটা সাফল্য পেলেও ২০১১ সাল পর্যন্ত ওসামা বিন লাদেন গোপনে তার সন্ত্রাসবাদী কাজকর্ম চালিয়ে যায়। এই পরিস্থিতিতে ওয়াশিংটন অপ্রত্যাশিতভাবে ইরাক যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে। আর তখন থেকেই আই এস জঙ্গিগোষ্ঠী তার ক্ষমতা বিস্তার করতে থাকে।

এখনও পর্যন্ত আফগানিস্তানের এক বিস্তীর্ণ অঞ্চল  তালিবানদের নিয়ন্ত্রণে। কাজেই এখনই যুদ্ধ বিদ্ধস্ত আফগানিস্তান থেকে আমেরিকার সেনা প্রত্যাহার করা যুক্তিযুক্ত হবে না; বিশেষ করে যখন আফগানিস্তানের ঘনিষ্ঠ প্রতিবেশী দেশ পাকিস্তান কাবুলে তার সমর্থিত সরকার বসাতে সন্ত্রাসবাদকে হাতিয়ার করেছে। বিশেষজ্ঞ মহলের ধারণা, ইসলামাবাদ তার এই দূরভিসন্ধি যে কোন প্রকারেই হোক না কেন  সফল করতে বদ্ধপরিকর।

সমগ্র ঘটনাক্রমের প্রেক্ষাপটে সন্ত্রাসবাদ দমনে ওয়াশিংটনকে তার সংকল্প থেকে পিছিয়ে আসার আগে সামগ্রিক পরিস্থিতি বিচার করে দেখতে হবে। রাষ্ট্রসংঘকে ভারতের প্রস্তাবিত আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদ দমন বিষয়ক সর্বাত্মক চুক্তিটি অনুমোদন করতে হবে;  যার আওতায়  সন্ত্রাসবাদ দমনে সব দেশ তাদের মধ্যে আপাত মতপার্থক্য দূরে সরিয়ে রেখে একযোগে একটি নির্ণায়ক ব্যবস্থা গ্রহণে এগিয়ে যেতে পারবে। বিষয়টিকে সামনে রেখেই ওয়াশিংটনকে তালিবানদের সঙ্গে তার বার্তালাপ পুনর্বিবেচনা করতে হবে।  (মূল রচনাঃ- জে এল কল জালালি)