ভারত ও মার্কিন বাণিজ্য সংকট

For Sharing

মার্কিন বাণিজ্য মন্ত্রী উইলবার রস বলেছেন, বিশ্বে ভারতেই সবচেয়ে বেশী বাণিজ্য শুল্ক আরোপ করা হয়। মার্কিন সরকারের সর্ববৃহৎ বাণিজ্য মিশন -“মার্কিন বাণিজ্য শাখা ভারত-প্রশান্ত মহাসাগরীয় বাণিজ্য মঞ্চ ও উদ্যোগ” এর একাদশতম সম্মেলনে যোগ দিতে তিনি নতুন দিল্লি এসেছিলেন।

চীনের পর ভারতই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বৃহত্তম বাণিজ্য অংশীদার। মার্কিন বাণিজ্য মন্ত্রী ভারতের বাণিজ্য মন্ত্রীর সঙ্গে তাঁর বৈঠকে দেশকে পুণরায় শ্রেষ্ঠত্বের আসনে নিয়ে যেতে ভারত মার্কিন সম্পর্কের উন্নতির বিষয়ে মার্কিন রাষ্ট্রপতির বক্তব্যকে তুলে ধরেন। মার্কিন বাণিজ্য মন্ত্রী ভারত-মার্কিন বাণিজ্য সম্পর্কের বিষয়ে MAGAWIC শব্দটি প্রয়োগ করেন যার অর্থ, ভারতের সহযোগিতায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পুণরায় শ্রেষ্ঠত্বের আসন অর্জন।

তবে ভারত-মার্কিন বাণিজ্য সম্পর্কে চাপা উত্তেজনাও রয়েছে। ভারত, চীন ও  মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে ক্রমবর্ধমান বাণিজ্য যুদ্ধ, ইরান থেকে তেল আমদানির ওপর নিষেধাজ্ঞা এবং GSP কর্মসূচীর আওতায় ভারতের জন্য বিশেষ সুবিধা খারিজের সিদ্ধান্তে উদ্বিঘ্ন। উল্লেখ্য, ভারত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের GSP সুবিধাপ্রাপ্ত অন্যতম দেশ। GSP হল, ১৯৭৪ সালের  বাণিজ্য আইন অনুযায়ী, বিকাশশীল দেশসমূহের থেকে আমদানিকৃত বিভিন্ন পণ্যের ওপর শুল্কছাড় সংক্রান্ত মার্কিন বাণিজ্য কর্মসূচী। তবে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা – WTO’র উল্লিখিত MFN  বা সর্বাধিক সুবিধাপ্রাপ্ত দেশের সংজ্ঞা থেকে GSP ভিন্ন। রাষ্ট্রপতি ট্রাম্পের  ভারতের জন্য এই সুবিধা বন্ধ করার পরিকল্পনা রয়েছে। মার্কিন বাণিজ্য মন্ত্রী সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন,  মার্কিন পণ্যের ওপর ভারতের শুল্ক বৃদ্ধি WTO আইনের পরিপন্থী।

উইলবার রস বলেছেন, ভারতের নতুন ই-বাণিজ্য নীতির ফলে সেদেশের সঙ্গে বাণিজ্যের ব্যয় বৃদ্ধি পেয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে চিকিৎসা সরঞ্জামের সর্বোচ্চ আমদানি মূল্য বেধে দেওয়ার ফলেও বাণিজ্য ব্যহত হচ্ছে। তবে ভারতে নতুন সরকার গঠনের পর এ বিষয়ে আলোচনা হবে বলে তিনি জানান।

প্রসঙ্গত, বিশ্বের মধ্যে ভারতই সর্বাধিক বাণিজ্য শুল্ক আরোপ করে বলে রসের  উল্লিখিত বক্তব্য সঠিক নয় কারণ ভারতে এই হার  ৭. ৫ শতাংশ,  অন্যদিকে ব্রাজিলে ঐ হার ১০.৩ শতাংশ এবং দক্ষিণ কোরিয়ায় ৯ শতাংশ।

ভারত ও মার্কিন বাণিজ্য মন্ত্রীগণ দুদেশের মধ্যে ব্যবসা-বাণিজ্য ক্ষেত্রে মজবুত এবং ক্রমবর্ধমান দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের প্রশংসা করেন। এক যৌথ বিবৃতিতে জানানো হয়েছে, পণ্য ও পরিষেবা ক্ষেত্রে এই হার ২০১৭’র ১২৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার থেকে বেড়ে ২০১৮’য় ১৪২ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে পৌঁছেছে। সাম্প্রতিক দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য আলোচনায় ক্ষুদ্র এবং মাঝারি উদ্যোগের ওপরে বিশেষভাবে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

উল্লেখ্য, মার্কিন বাণিজ্য মন্ত্রীর সঙ্গে এসেছিলেন একশো জনের একটি বাণিজ্য প্রতিনিধি দল। মার্কিন বাণিজ্য সংস্থাগুলির জন্য ভারতে আরো সহজে ব্যবসা-বাণিজ্যের সুবিধা প্রদান এবং বাণিজ্য সংক্রান্ত বিভিন্ন বাধা দূর করার বিষয়ে আলোচনা তাদের অন্যতম লক্ষ্য ছিল।

ভারত এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে বাণিজ্যে ক্রমবর্ধমান ভারসাম্যহীনতার বিষয়টি মার্কিন রাষ্ট্রপতি এর আগেও তুলে ধরেছিলেন। উল্লেখ্য, ২০১৭-১৮’য়  মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ভারতের রপ্তানির পরিমাণ ছিল ৪৭.৯ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, অন্যদিকে আমদানির পরিমাণ ছিল মাত্র ২৬.৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। আমদানি এবং রপ্তানির পরিমাণের মধ্যে এই ২১.৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের  ফারাকটিকেই রাষ্ট্রপতি ট্রাম্প ‘বাণিজ্য ভারসাম্যহীনতা’ আখ্যা দিয়েছেন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আর্থিক পরিষেবা প্রদানকারী সংস্থাগুলির বিষয়ে ভারতের রিজার্ভ ব্যাঙ্কের নীতিগুলিও পর্যালোচনা করার দাবি জানিয়েছে। দুদেশের মধ্যে বাণিজ্য ভারসাম্য বজায় রাখার ওপরেও জোর দিয়েছে। তবে মার্কিন  যুক্তরাষ্ট্র GSP প্রত্যাহার করলে ভারত, দেশের অর্থনৈতিক নিরাপত্তার স্বার্থে এর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারে বলেই অনুমান করা হচ্ছে।

(মূল রচনাঃ লেখা চক্রবর্তী)