দাতা দরবার আত্মঘাতী হামলা

For Sharing

পবিত্র রমজান মাসের দ্বিতীয় দিনে লাহোরের সুফি মসজিদ দাতা দরবারে আত্মঘাতী হামলায় ১০ জনের মৃত্যু এবং ২৫ জনেরও বেশি মানুষের আহত হবার ঘটনা একবার আবারও প্রমাণিত হল    পাকিস্তান এখনও সন্ত্রাসবাদীদের আশ্রয় দিচ্ছে ; যা এখন তাদের নিজের দেশেই আঘাত হানছে।  রমজান মাসে জনাকীর্ণ এই  মসজিদের বাইরে  এলিট ফোর্সেস নামে নিরাপত্তা কর্মীদের গাড়ি লক্ষ্য করে এই হামলা চালানো হয়।

পাকিস্তানে মসজিদ লক্ষ্য করে এই প্রথম এই ধরণের হামলা হল তা নয়। এর আগেও, সেহওয়ানের লাল শাহবাজ কলান্দর, পাকপাত্তনের বাবা ফারিদ এবং করাচির আবদুল্লা শাহ গাজি মসজিদে সন্ত্রাসবাদী হামলা চালানো হয়েছে।  বিশেষ করে সুফি মসজিদগুলিকে  লক্ষ্য করেই এই হামলা চালানো হচ্ছে। হিজবুল আহরার  জঙ্গি গোষ্ঠী দাতা দরবার মসজিদ হামলার দায় স্বীকার করেছে। পাকিস্তান ভিত্তিক পাকিস্তান তালিবান, লস্কর-এ-ঝাংবি এবং হিজবুল আহরার মত জঙ্গি গোষ্ঠীগুলি সুফি বিচারধারার বিরোধী।  সন্ত্রাসবাদী গোষ্ঠীগুলি সুফি  সম্প্রদায়কে  বহু ঈশ্বরবাদী এবং ইসলাম ধর্ম বিরোধী বলে মনে করে এবং এই কারণেই  সুফি মসজিদগুলিতে এই ধরণের হামলা চালানো হচ্ছে।

দক্ষিণ এশিয়ায় দাতা দরবার  সর্ব বৃহৎ মসজিদ এবং বছরের শেষে অনুষ্ঠিত তিন দিন ব্যাপী বার্ষিক উৎসবের সময় পাকিস্তানের বিভিন্ন স্থান থেকে শিয়া ও সুন্নি উভয় সম্প্রদায়ের বিপুল সংখ্যক মানুষ সেখানে একত্রিত হন। প্রসঙ্গত,  এই মসজিদে পাকিস্তানের রাজনৈতিক নেতা সহ বহু  বিখ্যাত মানুষ নামাজ পড়তে  আসেন। সাম্প্রতিক এই হামলার দু’দিন আগেই প্রাক্তন পাক প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফ এক সপ্তাহের জামানতে মুক্তি পেয়েই এই মসজিদ দর্শন করে গেছেন। বিশেষজ্ঞরা নওয়াজ শরিফের এই সফরকে  পাকিস্তান মুসলিম লীগ-নওয়াজ PML-N  দলে প্রত্যাবর্তনের বার্তা দিতে চেয়েছেন  বলেই মনে করছেন। এই পরিস্থিতিতে এই   মসজিদের নিরাপত্তা দেশের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আইন প্রয়োগকারী এবং নিরাপত্তা বাহিনীকে দেশের প্রতীক বলে মনে করা হয় এবং সেই কারণে নিরাপত্তা বাহিনীই সন্ত্রাসবাদীদের আক্রমণের প্রধান লক্ষ্য হয়ে ওঠে।

বিখ্যাত এই মসজিদের নিরাপত্তা দায়িত্বে থাকা এলিট ফোর্সেস নামে নিরাপত্তা কর্মীদের গাড়ি লক্ষ্য করে এই বিস্ফোরণ বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। আত্মঘাতী বোমারুরা পাকিস্তানকে পুনরায় স্মরণ করিয়ে দিতে চাইছে যে, পাক ভূমিতে সন্ত্রাসবাদী গোষ্ঠী এখনও সক্রিয়  এবং ভবিষ্যতে  সুফি মসজিদগুলিতে এই ধরণের হামলার সম্ভাবনা রয়েছে।  তাছাড়া, দাতা দরবার মসজিদ বিভিন্ন সঙ্গীত ও নৃত্য উৎসবের আয়োজনের জন্যও বিখ্যাত। চরমপন্থী গোষ্ঠীগুলি এই ধরণের উৎসবকে ইসলাম ধর্ম বিরোধী বলে মনে করে।

দাতা দরবারে যে এই প্রথম এই ধরণের হামলা চালানো হয়েছে তা নয়। এর আগেও ২০১০ সালে এই মসজিদে জোড়া বিস্ফোরণে প্রায় ৫০ নিহত এবং ২০০ জন আহত হয়েছেন।

পাকিস্তানের জন্য এই ধরণের হামলা উদ্বেগের বিষয় কারণ সন্ত্রাসবাদী গোষ্ঠীগুলি পাকিস্তানের যুব সম্প্রদায়কে এই হামলার কাজে ব্যবহার করছে। প্রাদেশিক আধিকারিকরা জানিয়েছেন যে, দাতা দরবার মসজিদে ১৫ বছরের এক তরুণকে এই হামলার কাজে ব্যবহার করা হয়েছে। এতে প্রমাণিত হচ্ছে, পাকিস্তানে চরমপন্থী গোষ্ঠীগুলি এখনও সক্রিয় এবং এই ঘটনার ফলে  সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলা কৌশলের অঙ্গ হিসেবে  হিজবুল আহরার গোষ্ঠীকে নির্মূল করার পাকিস্তানের দাবীকে এক প্রশ্নচিহ্নের সামনে দাড় করিয়ে দিল।

উল্লেখ্য, পাকিস্তানের পাঞ্জাব প্রদেশে গত দু’বছর বড় ধরণের  কোন সন্ত্রাসবাদী আক্রমণের ঘটনা ঘটে নি। দাতা দরবার মসজিদ  আক্রমণের ঘটনা ইমরান খান সরকারকে মনে করিয়ে দিল যে সন্ত্রাসবাদী গোষ্ঠী সে দেশে এখনও সক্রিয় এবং তারা  যে কোন মুহূর্তে আঘাত হানতে পারে। মাসুদ আজাহারকে বিশ্ব সন্ত্রাসবাদী তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা,  অর্থনৈতিক  অ্যাকশন টাস্ক ফোর্স FATE’র কালো তালিকাভুক্ত না হবার জন্য পাকিস্তান সন্ত্রাসবাদী  সংগঠনগুলিকে বন্ধ করার কথা ঘোষণার  প্রেক্ষাপটে দাতা দরবার হামলা পাকিস্তানের জন্য এক বড় ধাক্কা। এই হামলার ঘটনা  ইসলামাবাদকে সতর্ক করে দিল যে অবিলম্বে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ জরুরী। (মূল রচনাঃ  ডঃ জয়নাব আখতার)