মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের ক্রমবর্ধমান বিবাদ

For Sharing

ইরাণের রাষ্ট্রপতি হাসান রুহানি ঘোষণা করেছেন যে ইরান যৌথ সর্বাত্মক কর্মসূচী বা  JCPOA-এর আওতায় তাদের কিছু অঙ্গীকার থেকে সরে আসছে। মার্কিন রাষ্ট্রপতি ডোনাল্ড ট্রাম্পের  নেতৃত্বে মধ্য প্রাচ্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক সেনা মোতায়েনের প্রতিক্রিয়ায় তিনি এই ঘোষণাটি করেন। ডোনাল্ড ট্রাম্প মার্কিন রাষ্ট্রপতি  পদে নির্বাচিত হওয়ার পরে ইরানের সঙ্গে পরমাণু চুক্তিটি প্রত্যাহার করে নেন। JCPOA থেকে সরে আসার পরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ক্রমাগত ইরাণের বিরুদ্ধে এমন সব সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে যা এই দুই দেশের মধ্যে বিবাদকে বাড়িয়েছে।

রাষ্ট্রপতি ট্রাম্পের  নতুন ইরান নীতির আওতায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইরানের প্রতি অত্যন্ত আপোষহীন দৃষ্টিভঙ্গী গ্রহণ করেছে। JCPOA রূপায়নের জন্য ইরানের  ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করে নেওয়া হলেও এই নতুন নীতির আওতায় ট্রাম্প সরকার ইরানের ওপর নতুন করে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। এর পরে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ইরানের রিভল্যুশনারি গার্ড কর্পস বা IRGCকে সম্পূর্ণরূপে ‘সন্ত্রাসবাদী’ হিসেবে তালিকাভুক্ত করে। এই প্রথম মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র একটি বিদেশী সরকারের একটি সম্পূর্ণ বিভাগকে ‘সন্ত্রাসবাদী’ হিসেবে তালিকাভুক্ত করে। এছাড়াও, গতমাসে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইরান থেকে তেল আমদানির জন্য ভারত, চীন ও দক্ষিণ কোরিয়ার মতো দেশকে ছাড় দিতে অস্বীকার করেছে যা শ্রী ট্রাম্পের পূর্বসূরী বারাক ওবামার অনুসৃত পথ থেকে  সরে আসা বলেই প্রতিভাত হচ্ছে।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এই সব পদক্ষেপ ইতিমধ্যেই ইরাণ ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে একটি বিবাদাস্পদ পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছে এবং সাম্প্রতিক মার্কিন গোয়েন্দা মূল্যায়নে জানানো হয়েছে যে  মধ্য প্রাচ্যে ইরান মার্কিন স্বার্থের বিরুদ্ধাচরণ করার পরিকল্পনা করেছে। এর ভিত্তিতেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র মধ্যে প্রাচ্যে নৌ-বাহিনীর আব্রাহাম লিঙ্কনকে মোতায়েন করাকে যৌক্তিক বলে মনে করেছিল। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এই পদক্ষেপের  প্রতিক্রিয়ায় ইরানের রাষ্ট্রপতি হাসান রুহানির নেতৃত্বে সেদেশের সুপ্রীম ন্যাশানাল সিকিউরিটি কাউন্সিল সিদ্ধান্ত নিয়েছিল যে এই সিদ্ধান্তের ফলে ইরান JCPOA থেকে নিজেদের সরিয়ে নিচ্ছে তা নয় বরং তারা বর্তমান পরিস্থিতির প্রেক্ষিতে তাদের অঙ্গীকার থেকে সাময়িকভাবে সরে আসছে। ইরানের এই সিদ্ধান্তের মধ্যে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ এবং ইরান দ্বারা স্ব-আরোপিত মধ্যস্থতাকারী সময়সীমা ৬০ দিন করাও রয়েছে।

ইতিমধ্যে পরমাণু চুক্তির অন্য পক্ষগুলি এই পরমাণু চুক্তি থেকে সরে আসার ও ইরানের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা আরোপের মার্কিন সিদ্ধান্তকে দুর্ভাগ্যজনক বলে আখ্যা দিয়েছে। এই চুক্তির অন্যতম প্রধান পক্ষ ইউরোপীয় সঙ্ঘ এই চুক্তিকে বাঁচিয়ে রাখতে সর্বোতোভাবে প্রয়াস চালালেও তাতে সফল হতে পারে নি। বর্তমান বিবাদাস্পদ পরিস্থিতি যদি চলতেই থাকে এবং ইরান সে সিদ্ধান্ত নিয়েছে তাতে যদি তারা অনড় থাকে তবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তাদের পরবর্তী পদক্ষেপে এই বিষয়টিকে রাষ্ট্র সঙ্ঘ নিরাপত্তা পরিষদে পেশ করবে এবং এর ফলে দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনা আরও বাড়বে। এই সময় যখন ইউরোপীয় সঙ্ঘ সহ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের  এই বিবাদ-বিতন্ডায় অবতীর্ণ দুই দেশ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানকে আলোচনার টেবিলে বসানোর এবং বর্তমান অচলাবস্থা কাটানোর এক শান্তিপূর্ণ সমাধান সূত্র খুঁজে বের করার জন্য কঠোর পরিশ্রম করা উচিত।

বেশ কয়েকটি বিবাদের কারণে মধ্য প্রাচ্য ইতিমধ্যেই এক অস্থির পরিস্থিতিতে রয়েছে এবং ইরান ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে আরও দ্বন্দ্ব বা বিবাদ শুধুমাত্র ঐ অঞ্চলের নয়, সমগ্র বিশ্বের জন্য এক ভয়ঙ্কর বিষয় হয়ে উঠবে। ভারত সবসময় জানিয়ে  এসেছে যে তারা কোনো একটি দেশের কথা নয়, রাষ্ট্রসঙ্ঘের সিদ্ধান্ত মেনে চলবে। ভারত দুই দেশের মধ্যে এই দ্বন্দ্বের এক পারস্পরিক গ্রহণযোগ্য শান্তিপূর্ণ সমাধানের আহ্বান জানিয়েছে। ইরানের ওপর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা আরোপ ভারতের জ্বালানি নিরাপত্তাকেও প্রভাবিত করবে কেননা ভারতকে তেল সরবরাহকারী দেশগুলির মধ্যে ইরান অন্যতম।  ভারত, ইরান ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র উভয় দেশেরই বন্ধু, ফলে তার দুই বন্ধু রাষ্ট্রের দ্বন্দ্ব অবশ্যই ভারতের কাছে কাঙ্খিত নয়।

[মূল রচনা- ডক্টর আসিফ শুজা]