তুরস্ক-ভারতের সম্পর্কে গভীরতা

For Sharing

ভারত ও তুরস্কের সম্পর্কে সম্প্রতি সুনির্দিষ্ট অগ্রগতি হয়েছে। দুটি দেশের উচ্চ পর্যায়ে পর পর দুটি বৈঠক হয়ে গেল। তুরস্ক নতুন সহযোগী ভারত এবং চিরাচরিত অংশীদার পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করার লক্ষ্যে কাজ করছে। আংকারা তাদের রাষ্ট্রপতির উপদেষ্টা ডঃ ইব্রাহিম কালিনকে নতুন দিল্লী পাঠায়, লক্ষ্য হল সন্ত্রাস দমন এবং মৌলবাদের বিরুদ্ধে সহযোগিতা বাড়ানো এছাড়া, তাদের অংশীদারিত্বে অর্থনৈতিক উন্নতির বিষয়ে পদক্ষেপ গ্রহণ।

ভারত সীমান্তপারের সন্ত্রাসবাদের মোকাবিলায় তুরস্কের সহায়তা চেয়ছে। ইব্রাহিম কালিনের ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত ডোভালের সঙ্গে সাক্ষাতের সময় শ্রীলংকায় সাম্প্রতিক জঙ্গী হানা নিয়েও কথাবার্তা হয়।

উভয় দেশ দক্ষিণ এশিয়া এবং পশ্চিম এশিয়া সহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক এবং আঞ্চলিক বিষয়ে কথাবার্তা বলে। দুটি দেশই সকল ধরণের সন্ত্রাসবাদ নির্মূল এবং জঙ্গী কার্যকলাপের ষড়যন্ত্রকারীদের বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করানোর প্রয়োজনের বিষয়ে মত বিনিময় করে। দু দেশের আধিকারিকরা সভ্যতা এবং সাংস্কৃতিক যোগসুত্রের প্রতি গুরুত্ব দেন।

ডঃ কালিনের সফরের গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল শীর্ষ স্থানীয় ইস্লামিক পন্ডিত এবং বুদ্ধিজীবীদের সঙ্গে বৈঠক কারণ নতুন দিল্লী এবং আংকারা উভয়েই মৌলবাদের বিরুদ্ধে সহযোগিতায় আগ্রহী। বৈঠকের লক্ষ্য ছিল ভারতীয় সংস্কৃতি এবং বহুত্ববাদ এবং ইস্লামিক পরম্পরার উন্নত উপলব্ধি।

ডঃ কালিনের ভারত সফরের কয়েকদিন পর তুরস্কের সহকারী বিদেশ মন্ত্রী সেদাত ওনাল তিন দিনের নতুন সফরে আসেন। তিনি পররাষ্ট্র মন্ত্রকের পাশ্চাত্য বিষয়ক সচিব এ শর্মার সঙ্গে আলোচনা করেন এবং বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বৃদ্ধি সহ বিভিন্ন দ্বিপাক্ষিক বিষয় নিয়ে কথাবার্তা বলেন। উভয় পক্ষ নিজেদের অঞ্চলে বর্তমান পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে এবং বিভিন্ন বহু পাক্ষিক বিষয়ে মত বিনিময় করে।

পাকিস্তানী চ্যালেঞ্জের মোকাবিলায় তুরস্কের সমর্থন খুব জরুরী কারণ আংকারা চিরাচরিতভাবে ইস্লামাবাদের অংশীদার। তবে তুরস্কের সভাপতি রেসেপ তায়িপ এরডোগান দক্ষিণ আফ্রিকায় তুরস্কের ব্যাপক উপস্থিতির পক্ষপাতী।

২০১৭ সালে শ্রী এরডোগানের ভারত সফর ভারতের প্রধান মন্ত্রীর সঙ্গে ব্যক্তিগত সম্পর্কের উন্নতি ঘটায়। কয়েক বছর আগে রাষ্ট্রপতি এরডোগানকে অপসারণের লক্ষ্যে যে অভ্যুত্থানের প্রয়াস চালানো হয়   কয়েক ঘন্টার মধ্যে তার বিরুদ্ধে বিশ্বের বৃহত্তম গণতন্ত্র ভারত সরকারের হস্তক্ষেপের ফলে তিনি অত্যন্ত প্রভাবিত হন।

পাকিস্থানের আন্তসীমান্ত সন্ত্রাসবাদী কার্যকলাপের বিরুদ্ধে ভারত পশ্চিম এশিয়া-সৌদি আরব, ইরান এবং তুরস্কের সঙ্গে সক্রিয়ভাবে যুক্ত রয়েছে।

পর্যটন, স্মার্ট সিটি, নির্মাণ, পরিকাঠামো, তথ্য প্রযুক্তি ক্ষেত্রে বিনিয়োগের সম্ভাবনাও দুটি দেশ খতিয়ে দেখে। ২০১৭ সালে তুরস্কের রাষ্ট্রপতির ভারত সফরের পর দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যের পরিমাণ বেড়ে হয়েছে ৮.৬ বিলিয়ন ডলার। ২০২০ পর্যন্ত এই লক্ষ্যমাত্রা ধার্য করা হয়েছে ১০ বিলিয়ন ডলার। তুরস্কের গ্রাহক পণ্য এফ এম সি জি ভারতের বাজারে প্রবেশ করছে।

ভারত-তুরস্ক বাণিজ্য গত দেড় দশকে উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। তুরস্কে ভারতীয় রপ্তানী পণ্যের মধ্যে রয়েছে তেল এবং জ্বালানী, হাতে তৈরি ফিলামেন্ট ও স্ট্যাপল ফাইবার এবং সরঞ্জাম, জৈব রাসায়নিক পণ্য ইত্যাদি। ভারতে তুরস্কের রপ্তানী পণ্যের মধ্যে রয়েছে পোস্তদানা, যন্ত্রপাতি, কারিগরি সরঞ্জাম, লোহা এবং ইস্পাত, মুল্যবান পাথর এবং ধাতব পদার্থ ইত্যাদি।

ভারত ও তুরস্কের মধ্যে ঐতিহাসিক যোগসূত্র রয়েছে। প্রথম কূটনৈতিক  মিশন স্থাপিত হয় ১৪৮১-৮২ সালে  অটোম্যান সুলতান এবং এই মহাদেশের শাসকদের মধ্যে। মৌলানা জালালুদ্দিন রুমির সুফি দর্শনের প্রভাব ভারতীয় উপমহাদেশে পাওয়া যায় তার চিরাচরিত সুফিবাদ এবং ভক্তি আন্দোলনের মধ্য দিয়ে। আরো সম্প্রতি ভারত ও তুরস্কের মধ্যে ঐতিহাসিক সম্পর্কের প্রতিফলন ঘটে ১৯১২র বলকান যুদ্ধ এবং ১৯১৯-১৯২৪এর খিলাফত আন্দোলনের সময় বিশিষ্ট ভারতীয় স্বাধীনতা সংগ্রামী ডঃ এম এ আনসারির নেতৃত্বে মেডিক্যাল মিশনে। ভারত ১৯২০র তুরস্কের স্বাধীনতা যুদ্ধ এবং তুরস্ক সাধারণতন্ত্র গঠনের প্রতি সমর্থন জানায়। মহাত্মা গান্ধী নিজে প্রথম বিশ্ব যুদ্ধে তুরস্কের সঙ্গে যে অন্যায় হয় তার বিরুদ্ধে সরব হয়েছিলেন। (মূল রচনাঃ দীপাঞ্জন রায় চৌধুরী)