জাভেদ জারিফের নতুন দিল্লি সফর

For Sharing

ইরানের বিদেশ মন্ত্রী জাবেদ জারিফ নতুন দিল্লি সফর করে গেলেন এমন একটা সময়ে যখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইরানের মধ্যে উত্তেজনার পারদ ক্রমশ উর্ধমুখি।  এই সফর ইরানী বৈদেশিক নীতিতে ভারতের অবস্থানের তাৎপর্য বহন করে। শ্রী জারিফ ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করেন এবং দুটি দেশের মধ্যে পারস্পরিক স্বার্থ সংলিষ্ট বিভিন্ন দ্বিপাক্ষিক বিষয় নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন। এই বৈঠকে উভয় নেতা আফগানিস্তান সহ বিভিন্ন আঞ্চলিক প্রশ্নে মত বিনিময়ের সুযোগ পান।

ইরাণের সঙ্গে ভারতের সভ্যতার সম্পর্ক যুগ প্রাচীন, এই দুটি দেশের পারস্পরিক সম্পর্ক  সম্প্রতি জ্বালানী এবং যোগাযোগের ক্ষেত্রে অংশীদারিত্ব বৃদ্ধির জন্য আরো গভীর হয়েছে। ভারতের জ্বালানী নিরাপত্তার ক্ষেত্রে ইরানের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। দীর্ঘ দিন থেকে তারা ভারতের বৃহত্তম তেল সরবরাহকারী। এমনকি, ইরানের বিরুদ্ধে বর্তমান মার্কিন নিষেধাজ্ঞা সত্বেও ভারত ইরান থেকে তাদের তেল আমদানি অব্যাহত রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।  পরমাণু চুক্তির আগে মার্কিন নিষেধাজ্ঞার শেষ পর্যায়ে ভারত একই দৃষ্টিভঙ্গী অনুসরণ করে। তখন তারা পেমেন্ট প্রক্রিয়ায় কঠোর বিধিনিষেধ সত্বেও ইরানী অশোধিত তেল আমদানি চালিয়ে যায়। তেহেরান ভারতের এই সমর্থনের স্বীকৃতি দেয় এবং সেই প্রেক্ষিতেই শ্রী জারিফের বর্তমান সফরকে দেখতে হবে।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গেও ভারতের কৌশলগত সম্পর্ক বর্তমান। ১৯৭৯এর ইস্লামিক বিপ্লবের সময় অর্থাৎ গত প্রায় চার দশক থেকে ইরানের সঙ্গে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক সন্তোষজনক নয়। সম্প্রতি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ভারতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রতিরক্ষা সংগ্রহের উৎস হয়ে উঠেছে। তাছাড়া, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ভারতের বহুমুখি সম্পর্ক রয়েছে এবং বিভিন্ন ভারতীয় সংস্থার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ঘনিষ্ট বাণিজ্যিক সম্পর্ক বর্তমান। এই রকম একটি পরিস্থিতিতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইরানের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক এই দেশকে একটি গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় এনে দাঁড় করিয়েছে। ইতিবাচকভাবে দেখলে এই অবস্থান থেকে নতুন দিল্লি চাইলে দুটি দেশের মধ্যে বর্তমান উত্তেজনা প্রশমনের বিষয়ে মধ্যস্ততা করতে পারে।

যদিও ভারত স্থায়ী ৫+১ দেশগোষ্ঠী এবং ইরানের মধ্যে সম্মত যৌথ সর্বাত্মক কর্ম পরিকল্পনার কোনো পক্ষ নয়, তবে নতুন দিল্লি এই পরমাণু চুক্তিকে স্বাগত জানিয়েছে। ভারত মনে করে ইরানী পরমাণু বিতর্ক ঘিরে বর্তমানে যে জটিলতা চলছে তা কাটিয়ে ওঠার জন্য এই পরমাণু চুক্তিকে ভারত কার্যকর বলে মনে করে। ভারত স্বীকার করে যে ইরান নিয়মিতভাবে এই চুক্তির শর্তাবলী পালন করে আসছে, অথচ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এক তরফাভাবে এই চুক্তি থেকে প্রত্যাহার করে নিয়েছে। ভারত এমন একটা অবস্থায় দাঁড়িয়ে যেখানে তাদের নতুন পরিস্থিতির সঙ্গে নতুন করে সামঞ্জস্য বিধান করতে হবে।

মার্কিন যুক্তরাষ্টের এক তরফা প্রত্যাহার এবং রাষ্ট্রপতি ডোলাল্ড ট্রাম্পের ইরান বিরোধী অবস্থান যার মধ্যে রয়েছে পারস্য উপসাগরে সেনা মোতায়েন, এই সব মিলিয়ে এই অঞ্চলে এক জটিল পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। কোনো পক্ষের হিসেবে সামান্য গড় মিল হলেই উত্তেজনা আরো বৃদ্ধি পাবে এবং তার প্রভাব কিন্তু এই অঞ্চল ছাড়িয়ে অন্যত্র ছড়িয়ে পড়বে। বস্তুত পক্ষে উপসাগরীয় অঞ্চল ভারতের প্রতিবেশি এলাকায় অবস্থিত এবং এই অঞ্চলে এই ধরণের দ্বন্দ্বের পরিস্থিতি কোনোভাবেই কাম্য নয়।

বর্তমান দৃশ্যপটে ইরানী বিদেশ মন্ত্রীর নতুন দিল্লি সফরকে  ইরানের প্রতি ভারতের সমর্থনকে তেহেরানের স্বীকৃতির নিরিখে দেখতে হবে এবং মার্কিন নিষেধাজ্ঞার মধ্যেও ভারতে ইরানী তেল সরবরাহ অব্যাহত রাখতে তেহেরান প্রয়াস চালিয়ে যাচ্ছে। জাভেদ জারিফের সফরের মাধ্যমে ইরান ভারতের প্রতি সংকেত দিচ্ছে যাতে ইরান ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে উত্তেজনা প্রশমনের ক্ষেত্রে নতুন দিল্লী কার্যকর ভূমিকা পালন করতে পারে। এটি মনে রাখতে হবে যে দুটি দেশের সঙ্গেই ভারতের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বর্তমান। (মূল রচনাঃ আসিফ শুজা)