পারস্য উপসাগর অঞ্চল কি সংঘাতের অভিমুখে?

For Sharing

সম্প্রতি একদিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও তার আঞ্চলিক সহযোগী দেশসমূহের সঙ্গে ইরানের যে বাদানুবাদ চলছে, তার ফলে পারস্য উপসাগর অঞ্চলে উত্তেজনা বৃদ্ধি পেয়েছে। তেহেরানের সঙ্গে ওয়াশিংটনের সংঘাত অবশ্য দীর্ঘদিনের এবং জটিল।  তবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ২০১৮’র মে মাসে যুগ্ম সর্বাত্মক কর্মপরিকল্পনা – JCPoA বা ইরান পরমাণু চুক্তি থেকে সরে আসায় এই সংঘাত বৃদ্ধি পায়। এই সময় রাষ্ট্রপতি ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের বিরুদ্ধে সংশ্লিষ্ট অঞ্চলে অস্থিরতা সৃষ্টি এবং চুক্তি স্বাক্ষর করা সত্বেও পরমাণু অস্ত্র ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপনাস্ত্র তৈরির অভিযোগ করেন। এই প্রেক্ষিতে ট্রাম্প প্রশাসন ঐ চুক্তির বিষয়ে পুণর্বিবেচনার জন্য ইরানের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে বহুপাক্ষিক অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞাও আরোপ করে। তবে তেহেরান ঐ চুক্তি নিয়ে পুণরায় আলোচনায় বসতে নারাজ। এ বছরের ৮ই মে ঐ চুক্তির বর্ষপুর্তীতে ইরান মার্কিন নিষেধাজ্ঞার দরুণ দেশের অর্থনীতির ওপর ক্রমবর্ধমান চাপ হ্রাস করতে রাশিয়া, চীন ও ইউরোপীয় দেশগুলির সহায়তা চেয়েছে।

সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন পক্ষের মধ্যে এই ক্রমবর্ধমান বাক যুদ্ধের ওপর আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় গুরুত্ব দিচ্ছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র পারস্য উপসাগরে যুদ্ধ জাহাজ USS আর্লিংটন ও প্যাট্রিয়ট মোতায়েন করার কথা ঘোষণা করেছে। এর জবাবে এক বিবৃতিতে তেহেরান জানিয়েছে, যুদ্ধ শুরু হলে মার্কিন যুদ্ধ জাহাজগুলি তাদের লক্ষ্য হবে। এদিকে সম্মিলিত আরব আমীরশাহীর ফুজিয়ারা উপকূলে সৌদি অয়েল ট্যাঙ্কারের ওপর সাম্প্রতিক অন্তর্ঘাতের ঘটনা সংশ্লিষ্ট অঞ্চলে এই সব দেশগুলির স্বার্থে আঘাত হানার প্রচেষ্টা বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। সৌদি আরবের দুটি তেল উৎপাদন কেন্দ্রের ওপর ড্রোন হামলা উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলির আশঙ্কা আরো বাড়িয়েছে।

সৌদি আরবের বিদেশ প্রতিমন্ত্রী আদেল-অল-জুবের বলেছেন, সৌদি আরব যুদ্ধের বিরুদ্ধে হলেও ইরানের যেকোনো ধরণের পদক্ষেপের বিরুদ্ধে জবাব দিতে প্রস্তুত। ইরান, সৌদি আরবের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নিতে পারে এই আশঙ্কার প্রেক্ষিতে সৌদি রাজা সলমান এই সামগ্রিক পরিস্থিতি পর্যালোচনার লক্ষ্যে আগামী ৩০শে মে মক্কায় আরব ও উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলির সঙ্গে জরুরি বৈঠক আহ্বান করেছেন।

রিয়াধ ও তেহেরানের মধ্যে ক্রমাগত যুদ্ধের হুমকির প্রেক্ষিতে সংঘাত বা পূর্ণ যুদ্ধের আশঙ্কা – কোনোটাই অমূলক নয়। শুধুমাত্র সংশ্লিষ্ট অঞ্চলের জন্যই তা ধ্বংসাত্মক হবে না, সমগ্র বিশ্বের ওপরেই এর প্রতিকূল প্রভাব পড়বে। বিশেষ করে শক্তি নিরাপত্তার জন্য তেল আমদানির ওপর নির্ভরশীল এশিয় রাষ্ট্রগুলি এর ফলে প্রভাবিত হবে।

ভারত, সৌদি আরবের তেল উৎপাদন কেন্দ্র লক্ষ্য ক’রে ড্রোন হামলার কড়া নিন্দা করেছে এবং সমস্ত রকম সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে পুণরায় দৃঢ়সংকল্প হওয়ার ওপর গুরুত্ব দিয়েছে। পারস্য উপসাগরের বিষয়ে নতুন দিল্লির অবস্থান স্পষ্ট। ভারত উপসাগরীয় অঞ্চলে বিবাদের মীমাংসায় যুদ্ধ নয় আলোচনার ওপর গুরুত্ব দিয়েছে। উল্লেখ্য, সংশ্লিষ্ট অঞ্চলে ভারতের দৃঢ় স্বার্থ রয়েছে এবং প্রত্যেকটি উপসাগরীয় রাষ্ট্রের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক রয়েছে। শুধুমাত্র শক্তি নিরাপত্তার প্রেক্ষিতেই নয়, উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলিতে সাড়ে ৮ মিলিয়নেরও বেশী ভারতীয় নাগরিক বসবাস করেন। এ ক্ষেত্রে যেকোনো ধরণের সংঘাত দেখা দিলে তার যথেষ্ঠ প্রতিকূল প্রভাব ভারতের স্বার্থের ওপর পড়বে।

এই পরিস্থিতিতে সংশ্লিষ্ট অঞ্চলে এই বাক যুদ্ধ যা ক্রমশঃ সংঘাতের দিকে যাচ্ছে, তার মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে কূটনৈতিক উদ্যোগ গ্রহণ করেতে হবে। এর কারণ, উপসাগরীয় অঞ্চলে যুদ্ধ হলে তা আরো বৃহৎ আঞ্চলিক তথা বিশ্ব সংঘাতে পরিণত হতে পারে।

(মূল রচনাঃ মহম্মদ মুদাসসির কামার)