প্রধানমন্ত্রী মোদীর শপথ গ্রহণ ভারত-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে ভারতের ভূমিকার সংকেতবাহী

For Sharing

প্রযুক্তি ও আর্থিক বিভিন্ন ক্ষেত্রে সহযোগিতার লক্ষ্যে বঙ্গোপসাগরীয় দেশগুলির জোট- বিমস্টেক (BIMSTEC), সাংহাই সহযোগিতা সংগঠন বা SCO এবং ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলের দেশগুলির নেতাদের  প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর দ্বিতীয় দফায়  প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেওয়ার অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ  আসলে ভারত-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে  ভারতের একটি প্রধান শক্তিধর দেশ হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করার ইচ্ছেকেই প্রকাশ করে।

প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর এই শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানে বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি আব্দুল হামিদ উপস্থিত ছিলেন। ভারতের সঙ্গে ঢাকার বর্তমান অসাধারণ সম্পর্কের স্বীকৃতিস্বরূপ তাঁর সঙ্গে একটি প্রতিনিধি দলও ভারতে এসেছে। বিমস্টেক-এর অন্য সদস্য দেশগুলিও এই উপলক্ষ্যে ভারতে তাদের শীর্ষ স্থানীয় নেতাদের পাঠিয়েছে; এবং অধিকাংশ সফরকারী নেতাই শ্রী মোদীর সঙ্গে ঘরোয়া আলোচনা করবেন। এই সব আলোচনায় দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে পর্যালোচনাও হয়।

নেপালের প্রধানমন্ত্রী কে পি শর্মা ‘ওলি’ এবং ভুটানের প্রধানমন্ত্রী লোটে শেরিং এবং শ্রীলঙ্কার রাষ্ট্রপতি মৈত্রিপালা সিরিসেনাও এই অনুষ্ঠানের উপস্থিত ছিলেন। গত বছরে শ্রীলঙ্কার রাজনৈতিক সংকট এবং ইস্টার রবিবারে শ্রীলঙ্কায় সন্ত্রাসবাদী হামলা নতুন দিল্লীর কাছে এক উদ্বেগের বিষয়। শ্রী মোদীর সঙ্গে শ্রী সিরিসেনার বৈঠকে নিরাপত্তা অংশীদারিত্ব সহ বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়। ২০১৫ সাল থেকে শ্রীলঙ্কার রাষ্ট্রপতি হিসেবে নির্বাচিত হওয়ার পর থেকে শ্রী সিরিসেনা ভারতের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে ভালো সম্পর্ক বজায় রেখে চলেছেন এবং তিনি প্রায়শই ভারত সফরে এসেছেন। শ্রীলঙ্কায় রাষ্ট্রপতি নির্বাচন হবে আগামী জানুয়ারি মাসে। মিয়ান্মারের রাষ্ট্রপতি উইন মিয়িন্টও প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর শপথ অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন এবং প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে তাঁর ঘরোয়া আলোচনাও হয়েছে।

এই একই দিনে থাইল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রীরও শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠান ছিল এবং একারণেই তিনি  এই অনুষ্ঠানে এক বিশেষ দূতকে নতুন দিল্লী পাঠান। আগামী নভেম্বর মাসে ভারত-আসিয়ান এবং পূর্ব এশিয়া শীর্ষ সম্মেলনে অংশ নিতে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী থাইল্যান্ডে যেতে পারেন। সার্কের কাজকে সুচারুভাবে  করতে না দেওয়ায় মোদী সরকারের কাছে বিমস্টেক এখন অগ্রাধিকার। শ্রী মোদী  ২০১৬র অক্টোবর মাসে গোয়ায়  BRICS শীর্ষ সম্মেলনের পাশাপাশি  BRICS-এর সঙ্গে বিমস্টেক আউটরীচ ও বিমস্টেকের  এক ঘরোয়া বৈঠকের আয়োজন করেছিলেন। ২০১৭ সাল থেকে বিমস্টেক জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টারা ঐ অঞ্চলে  বিভিন্ন দেশে অপরাধ ও সন্ত্রাস মোকাবিলার লক্ষ্যে নিয়মিত বৈঠক করে আসছে। দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় আঞ্চলিক যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে তোলার লক্ষ্যে বিমস্টেক মোটর ভেহিক্‌ল চুক্তি এক বড় ও উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনা।

সীমান্ত পারের সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পাকিস্তান অস্বীকার করায় সার্কের কার্যকারীতা কমে যাওয়ায় মোদী সরকার বিমস্টেক সদস্য দেশগুলির সঙ্গে জেনেবুঝেই সম্পর্ক মজবুত করেছে। বিমস্টেক ভারতকে চীনের আধিপত্যের  মধ্যেও  ভারতের উপস্থিতির এক চিহ্ন হিসেবে বঙ্গোপসাগরীয় অঞ্চলের এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চলের দেশগুলির সঙ্গে ভারতের পূবমুখী নীতির অঙ্গ হিসেবে যোগাযোগ বাড়ানোর এক সুযোগ এনে দিয়েছে। বঙ্গোপসাগরীয় অঞ্চলে  চীনের আধিপত্য বাড়াতে থাকলেও বিমস্টেক ভারতের কাছে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ এবং প্রায়শই এই অঞ্চলকে ভারতের প্রভাবিত অঞ্চল হিসেবে বিবেচনা করা হয়ে থাকে। বঙ্গোপসাগর হল মালাক্কা প্রণালীতে যাওয়ার সংযোগ পথ যা আদতে চীনের একটি প্রধান বাণিজ্যিক পথ এবং ভারত ও ভুটান ছাড়া বাকি বিমস্টেক দেশগুলিতে  চীন বেশ কয়েকটি প্রকল্প রূপায়ন করছে। এছাড়াও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ২৫ শতাংশ হয় বঙ্গোপসাগরের মাধ্যমেই এবং এখানে রয়েছে ব্যাপক পরিমানে প্রাকৃতিক সম্পদ, বিশেষ করে প্রাকৃতিক গ্যাসের ভান্ডার যা ভবিষ্যতের বিদ্যুৎ শক্তির প্রয়োজনীয়তা পূরণ করতে পারে। বিমস্টেক সদস্য দেশগুলির সঙ্গে ভারতের মজবুত সম্পর্ক এই অঞ্চলে চীনের থেকে ভারতকেই এগিয়ে রেখেছে।

একই সঙ্গে সাংহাই সহযোগিতা সংগঠন বা (SCO)র বর্তমান সভাপতি রাষ্ট্র কিরগিজস্তানের এক প্রয়াস মধ্য এশিয়া এবং বর্ধিত ইউরেশিয়া অঞ্চলে যেখানে চীনের ব্যাপক আধিপত্য রয়েছে সেখানেও ভারতের উপস্থিতি বাড়ানোর ইঙ্গিত দিয়েছে। মধ্য এশিয়ার দেশগুলির ইচ্ছা রয়েছে যে ভারত ঐ অঞ্চলে তাদের ভূমিকা  আরও বাড়িয়ে তুলুক, যা তাদের আরও বেশি কৌশলগত বিকল্প সামনে এনে দেবে বলে তারা মনে করে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর  এই মাসের শেষের দিকে বিশকেকে সাংহাই সহযোগিতা সংগঠনের বৈঠকের পাশাপাশি মধ্য এশিয়ার দেশগুলির নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করার সম্ভাবনাও রয়েছে।

মরিশাসের প্রধানমন্ত্রী প্রবীণ জগন্নাথ শ্রী মোদীর এই শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানে উপস্থিত থেকে মরিশাস যে পশ্চিম ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে ভারতের এক ঘনিষ্ঠ সহযোগী তার ইঙ্গিত প্রদান করেন এবং তাঁর উপস্থিতি সামুদ্রিক সম্পদের সর্বাধিক ব্যবহারকে এগিয়ে নিয়ে যেতে ঐ অঞ্চলে সুরক্ষা প্রদানে নতুন দিল্লীর ইচ্ছাকেও তুলে ধরে।

[মূল রচনা- দীপাঞ্জন রায় চৌধুরী]