ভারত –কিরগিজস্তান সম্পর্ক আরও মজবুত হতে চলেছে

For Sharing

কিরগিজস্তানের রাষ্ট্রপতি সুরনবে শারিপভিচ জীনবেখভ ৩০ মে, ২০১৯ নতুন দিল্লীতে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন।  এই শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানে BRICS সদস্য দেশ এবং মরিশাসের প্রধানমন্ত্রী ছাড়া তাঁকেও এই অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল।

উল্লেখ্য, সাংহাই সহযোগিতা সংগঠনের বর্তমান সভাপতিত্ব করছে কিরগিজস্তান এবং মধ্য এশিয়ায় কিরগিজস্তান ভারতের এক গুরুত্বপূর্ণ সহযোগী দেশ। কিরগিজ রাষ্ট্রপতি জীনবেখভ ভারতের প্রধানমন্ত্রীকে উষ্ণ অভিনন্দন জানান এবং তাঁকে এবছরের ১৩-১৫ জুন সাংহাই সহযোগিতা সংগঠনের শীর্ষ বৈঠকে ও দ্বিপাক্ষিক আলোচনার জন্যও আমন্ত্রণ জানান।

কিরগিজস্তান ও ভারতের  মধ্যে বন্ধুত্বের কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী গত কয়েকবছরে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক যেভাবে মজবুত করা হয়েছে তাতে সন্তোষ ব্যক্ত করেন। শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকার জন্য জীনবেখভকে ধন্যবাদ জানান ও সেদেশে আমন্ত্রণ জানানোর জন্য কৃতজ্ঞতাও জানান। তিনি জানান এই সফরের  জন্য তিনি অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছেন।

ঐতিহাসিকভাবে মধ্য এশিয়ার সঙ্গে, বিশেষ করে কিরগিজস্তান সহ প্রাচীন রেশম পথ বা সিল্ক রুটের সঙ্গে জড়িত দেশগুলির সঙ্গে ভারতের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। সোভিয়েত শাসনকালে ভারত ও তদানীন্তন কিরগিজ প্রজাতন্ত্রের মধ্যে  রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে সীমিত যোগাযোগ ছিল। প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধী ১৯৮৫ সালে বিশকেক ইসিক–কুল-হ্রদ সফর করছিলেন। ১৯৯১ সালের ৩১শে আগস্ট কিরগিজস্তানের স্বাধীনতার পর থেকে, ১৯৯২ সালের ১৮ই মার্চ কিরগিজস্তানের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন করেছিল। ১৯৯৪ সালের ২৩শে মে সেখানে ভারতের রেসিডেন্ট মিশনও স্থাপন করা হয়।

কিরগিজ প্রজাতন্ত্রের সঙ্গে ভারতের রাজনৈতিক সম্পর্ক বরাবরই উষ্ণ ও বন্ধুত্বপূর্ণ। রাষ্ট্র সঙ্ঘ নিরাপত্তা পরিষদে স্থায়ী সদস্যপদের জন্য ভারতের দাবিকে তারা  সমর্থন করে। সাংহাই সহযোগিতা সংগঠনেও ভারতের পূর্ণ সদস্যপদ প্রদানে বিশকেক সমর্থন জানিয়েছিল। দুই দেশই সন্ত্রাসবাদ, চরমপন্থা এবং মাদক চোরাচালানের বিষয়ে অভিন্ন উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। ১৯৯২ সালে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপনের পর থেকে দুই দেশের  মধ্যে সংস্কৃতি, বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা, অসামরিক বিমান চলাচল, বিনিয়োগ তুলে ধরে ও তার সুরক্ষা, দ্বৈত কর এড়ানো, কনস্যুলার কনভেনশন প্রভৃতি সহ বেশ কয়েকটি চুক্তি করেছে।

২০১২ সালের ১০ থেকে ১৩ই জুন বিশকেকে আয়োজিত প্রথম ভারত-মধ্য এশিয়া ট্র্যাক-২ আলোচনায় অংশ নিয়ে তদানীন্তন পররাষ্ট্র মন্ত্রী ভারতের মধ্য এশিয়ার সঙ্গে সংযোগ স্থাপনের নীতি ঘোষণা করেছিলেন। টেলি-মেডিশিন ও টেলি-শিক্ষা তুলে ধরতে ভারত মধ্য এশিয়ায়  ই-নেটওয়ার্ক স্থাপন করেছে।

২০১৩ সালের সেপ্টেম্বর মাসে ভারতের তদানীন্তন পররাষ্ট্র মন্ত্রী সাংহাই সহযোগিতা সংগঠনের শীর্ষ সম্মেলনে অংশ নিতে কিরগিজস্তান  সফর করেছিলেন। এই শীর্ষ সম্মেলনের পাশাপাশি ভারতের মন্ত্রী ইরানের রাষ্ট্রপতি হাসান রৌহানি, মঙ্গোলিয়ার রাষ্ট্রপতি এলবেগদ্রজ এবং সাংহাই সহযোগিতা সংগঠনের মহাসচিব মাজেন্তসেভের সঙ্গেও দ্বিপাক্ষিক বৈঠক করেন।

প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ২০১৫ সালের জুলাই মাসে কিরগিজস্তান সফর করেছিলেন। ২০ বছর পরে ভারতের কোনো প্রধানমন্ত্রী সেই সময় কিরগিজস্তান সফরে গিয়েছিলেন। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী সেই সময় তদানীন্তন কিরগিজ রাষ্ট্রপতি আলমাজবেক আতাম্বায়েভ, অধ্যক্ষ আসিলবেক জীনবেখভ এবং প্রধানমন্ত্রী টেমির সারিয়েভের  সঙ্গে বৈঠক করেছিলেন। এই সফরকালে প্রধান মন্ত্রী সেদেশের ভিক্ট্রি স্কোয়ারে পুষ্পার্ঘ অর্পন করেছিলেন এবং ফিল্ড হাসপাতালের জন্য মেডিক্যাল সরঞ্জাম উপহার দিয়েছিলেন এবং সফর করেছিলেন কিরগিজ-ভারত মাউন্টেন বায়ো-মেডিক্যাল রিসার্চ সেন্টার, উদ্বোধন করেছিলেন কিরগিজস্তানের হাসপাতালগুলির সঙ্গে ভারতের সুপার স্পেশালিটি হাসপাতালের টেলি-মেডিসিন সংযোগের এবং সেখানে উন্মোচন করেছিলেন মহাত্মা গান্ধীর মূর্তি। প্রতিরক্ষা সহযোগিতা, সংস্কৃতি, নির্বাচন এবং প্রমিতকরণ-এর বিষয়ে চারটি সমঝোতা স্মারক পত্র/চুক্তি স্বাক্ষর করেছিলেন। ভারতের প্রধানমন্ত্রী ও কিরগিজস্তানের রাষ্ট্রপতি একটি যৌথ বিবৃতিও জারি করেছিলেন। এর পরে ২০১৬র ডিসেম্বরে কিরগিজস্তানের তদানীন্তন রাষ্ট্রপতি আলমাজবেক আতম্বায়েভ ভারত সফরে আসেন।

ভারত-কিরগিজ বাণিজ্যের পরিমাণ ২০১৬-১৭ সালে ছিল ২কোটি ৪৯ লক্ষ ৮০হাজার মার্কিন ডলার। কিরগিজস্তানে ভারতের রপ্তানির পরিমান ছিল ২কোটি ২৬ লক্ষ ৬০ হাজার মার্কিন ডলার। অন্যদিকে ভারতে কিরগিজ রপ্তানির পরিমান ছিল ২৩ লক্ষ ২০ হাজার মার্কিন ডলার। পোষাক–পরিচ্ছদ,  বস্ত্র, চর্মজ সামগ্রী, ঔষধ, রাসায়নিক দ্রব্য ও চা ভারত থেকে কিরগিজস্তানে রপ্তানি হয়ে থাকে, অন্যদিকে কিরগিজস্তান থেকে ভারতে আনা হয় খনিজ পদার্থ, ধাতব পদার্থ ও এ সংক্রান্ত অন্য সামগ্রী।

ভারতীয় কারিগরি ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা কর্মসূচীর আওতায় কারিগরি সহায়তা, বিশেষ করে মানব সম্পদ উন্নয়নের সংক্রান্ত বিষয় কিরগিজস্তানে ভারতের অন্যতম প্রধান অর্থনৈতিক সহায়তা।  

 

কিরগিজ রাষ্ট্রপতি জীনবেখভের নতুন দিল্লী সফর এবং প্রধানমন্ত্রীর আসন্ন বিশকেক সফর নিশ্চিতভাবেই দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে আরও এগিয়ে নিয়ে যাবে।
[মূল রচনা- পদম সিং]