এখন জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলার সময়  

For Sharing

সাম্প্রতিক রিপোর্টে এমনই ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে যে ভারত সহ বিশ্বের বহু জায়গাই প্রবল তাপ-প্রবাহের আওতায় চলে আসবে। ভারতে, রাজস্থানের চুরুতে তাপমাত্রা ইতোমধ্যেই ৫০ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছাড়িয়ে গিয়েছে।  তাপ-প্রবাহ থেকে কিছুটা রেহাই পাওয়া গেলেও বহু জায়গায় প্রবল তাপমাত্রা পরিলক্ষিত হবে। ভারতের কিছু অংশে তাপ-প্রবাহ খুব একটা নতুন বিষয় না হলেও এর প্রাবল্য ও এর সময়কাল সাম্প্রতিক বছরগুলিতে পরিবর্তিত হয়েছে যা আদতে জলবায়ু পরিবর্তনেরই প্রভাব।

অস্ট্রেলিয়ার জলবায়ু পুনরুদ্ধার সম্পর্কিত জাতীয় কেন্দ্র  বা ন্যাশানাল সেন্টার ফর ক্লাইমেট রেসটোরেশনের সাম্প্রতিক বিশ্লেষণে এক ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। তাদের বিশ্লেষণে জানানো হয়েছে যে মনুষ্য সৃষ্ট জলবায়ু পরিবর্তন ভূ-খন্ড থেকে ১০ লক্ষ প্রজাতিকে বিলুপ্ত করে ফেলবে। যদিও এটা একটা সতর্কতামূলক বিবৃতি, কিন্তু বিপদটি আসলে সত্যই এবং তা একেবারে আমাদের দোরগোড়ায়।

জলবায়ু পরিবর্তন হলো আবহাওয়ার নির্দিষ্ট  নমুনা বা প্যাটার্নের এক পরিবর্তন কেননা পরিবেশে কিছু গ্যাস ভূ-খন্ডের তাপমাত্রাকে তার আওতার বাইরে বেরিয়ে যেতে বাধা দেয়। ন্যাশানাল এরোনেটিক্স ও স্পেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশন বা যাকে আমরা সংক্ষেপে নাসা বলে থাকি তাদের মতে জলীয় বাষ্প, কার্বন ডাই-অক্সাইড, মিথেন, নাইট্রাস অক্সাইড এবং ক্লোরফ্লোরোকার্বন বা  CFC গ্রীণ হাউস গ্যাস তৈরিতে সহায়তা করে থাকে এবং  এই ভূখন্ডের তাপমাত্রাকে তার আওতার বাইরে বেরিয়ে যেতে বাধা দেয় এই গ্রিনহাউস গ্যাস এবং ফলস্বরূপ জলবায়ুর পরিবর্তন।

বিভিন্ন দেশের ১,৩০০ জনেরও বেশী বিজ্ঞানী সমৃদ্ধ জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক আন্তঃসরকার প্যানেল বা IPCC  জানিয়েছে যে আগামী শতকের মধ্যে  তাপমাত্রা আড়াই থেকে ১০ ডিগ্রি ফারেনহাইট বৃদ্ধি পাবে। কিছু কিছু অঞ্চলের ওপর  জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পরিবর্তিত হবে এবং এই পরিবর্তন মানিয়ে নেওয়া বা এর মোকাবিলা করা নির্ভর করবে বিভিন্ন সামাজিক ও পরিবেশ সংক্রান্ত ব্যবস্থাপনার ওপর।

IPCC জানিয়েছে যে ১৯৯০ সালের তাপমাত্রার তুলনায় বিশ্বের গড় তাপমাত্রার বৃদ্ধি যদি ১.৮ থেকে ৫.৪ ডিগ্রি ফারেনহাইট (১ থেকে ৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস) কম হয় তবে কিছু অঞ্চলে তার উপকারী প্রভাব পড়বে এবং কিছু অঞ্চলে তার ক্ষতিকর প্রভাব ফেলবে।

ভারতে ইতোমধ্যেই জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব শুরু হয়েছে। ভারত আগের থেকে উষ্ণ হয়ে উঠেছে এবং প্রায়শই অস্বাভাবিক গরম আবহাওয়ার কবলে পড়ছে বেশ বিস্তৃত অঞ্চল। এই অবস্থা আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে অনিশ্চিত বর্ষার কারণে, ফলস্বরূপ গম চাষ  ও খাদ্য শস্য উৎপাদন কমে যাচ্ছে এবং এর ফলে খাদ্য নিরাপত্তাহীনতা ও জীবনহানির আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। হিসাবে দেখানো হয়েছে যে শীতকালের তাপমাত্রা ০.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস বৃদ্ধি হলে ভারতের গম উৎপাদন প্রতি হেক্টরে ০.৪৫ টন কমে যায়। ভারতে প্রতি হেক্টরে গড় উৎপাদন ২.৬ টন।

সমুদ্রের জলস্তর বৃদ্ধির ফলে উপকূলীয় অঞ্চলের ভূমিক্ষয় হচ্ছে এবং একই সঙ্গে বন্যা পরিস্থিতি দেখা দিচ্ছে। এই কারণে গাঙ্গেয় বদ্বীপ ও ব্রহ্মপুত্র বদ্বীপ গুলির ওপরেও ব্যাপক প্রভাব পড়ছে। সমুদ্রের জলস্তর বৃদ্ধি  ভারতের লাক্ষাদ্বীপ ও প্রতিবেশী মালয়েশিয়ার ওপরেও প্রতিকূল প্রভাব ফেলছে।

জলবায়ু পরিবর্তন আজ আমাদের সামনে সবথেকে জটিল বিষয়। এতে বিজ্ঞান, অর্থনীতি, সমাজনীতি, রাজনীতি এবং নৈতিক প্রশ্ন জড়িয়ে রয়েছে এবং এটি সমগ্র বিশ্বের এক সমস্যা যা স্থানীয়ভাবে অনুভূত হয় এবং আগত দশকগুলি ধরে এই সমস্যা চলে আসবে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব আমরা কীভাবে মেটাতে পারবো তা নির্ভর করছে নির্গত গ্যাসের ওপর ও তা নিয়ন্ত্রণে আমরা কীভাবে সাড়া দিই তার ওপর। এর জন্য রয়েছে এক দ্বিমুখী কৌশল- গ্যাস নির্গমনের মাত্রা কমানো ও একই সঙ্গে পরিবেশ থেকে তাপ বেরিয়ে যাওয়ার বাধা প্রদানকারী গ্রিনহাউস গ্যাসের মাত্রা স্থিতিশীল করা এবং বর্তমান পরিবর্তিত জলবায়ুর সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া।

ভারত জলবায়ু পরিবর্তন ও বিশ্ব উষ্ণায়নের মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক প্রয়াসের প্রতি অঙ্গীকারবদ্ধ। প্যারিসে আয়োজিত ২০১৫ সালের জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক রাষ্ট্র সঙ্ঘ শীর্ষ সম্মেলন সমস্ত দেশকে এক অভিন্ন কারণে এই প্রয়াসে এগিয়ে আসার আহ্বান জানায়। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ও ফরাসী রাষ্ট্রপতি এমানুয়েল মাকরঁ প্যারিস শীর্ষ সম্মেলনে আন্তর্জাতিক সৌর জোট গঠনের প্রয়াস নিয়েছিলেন। জীবাশ্ম জ্বালানীর বিকল্প হিসেবে সৌর শক্তিকে কাজে লাগানোর বিষয়েই ছিল তাঁদের প্রয়াস কেননা জীবাশ্ম জ্বালানী হলো জলবায়ু  পরিবর্তনের অন্যতম প্রধান কারণ।

জলবায়ু পরিবর্তন হল  বাস্তব এবং বিষয়টি এমন এক স্তরে এসে গিয়েছে যে রাষ্ট্র ও জনগণকে এর মোকাবিলায় পদক্ষেপ নিতেই হবে-  আমাদের বেছে নিতে হবে যে আমরা অভূতপূর্ব পদক্ষেপ গ্রহণ করব নাকি আমরা মেনে নেব যে দেরি তো হয়েই গিয়েছে তাই এখন এর পরিণতি সহ্য করাই ভবিতব্য! স্বল্প মেয়াদী অর্থনৈতিক স্বার্থে পরিবেশ ও মানুষের অস্তিত্বকে নিয়ে ছিনিমিনি খেলতে নিশ্চয় দেওয়া যায় না।

[মূল রচনা- এন ভদ্রন নায়ার]