জি-২০ অর্থমন্ত্রী এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নরদের সম্মেলন

For Sharing

 

 জি-২০ দেশগোষ্ঠীর অর্থমন্ত্রী এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নরদের দুদিনের সম্মেলন জাপানের ফুকুওকায় অনুষ্ঠিত হয়ে গেল। বর্তমান অর্থনৈতিক সংকটের প্রেক্ষাপটে এই সম্মেলন। বৈঠকে জি-২০ সদস্য দেশগুলির বাণিজ্য এবং শুল্ক সংক্রান্ত বিভিন্ন উদ্বেগের বিষয় নিয়েই কেবল আলোচনা হয় নি; এমাসে ওসাকায় জি-২০ দেশগুলির যে শিখর সম্মেলন হবে তার প্রস্তুতি নিয়েও বিস্তারিত কথাবার্তা হয়েছে। দুটি বৃহৎ অর্থনৈতিক দেশ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং চীনের গৃহীত সংরক্ষণবাদের নীতি পুনর্বিবেচনার পথও এই বৈঠকের ফলে সুগম হবে। এছাড়া, ফেসবুক এবং গুগলের মত ডিজিটাল কোম্পানী এবং বহুজাতিক প্রযুক্তি সংস্থাগুলির নতুন কর ব্যাবস্থার পথও এই বৈঠক সুগম করে দিয়েছে। সারা বিশ্বে টাকার কালোবাজারী, ব্যাংক জালিয়াতি এবং আর্থিক অপরাধের মত যে সব ঘটনা ঘটছে তার প্রতিও সম্মেলনে আলোকপাত করা হয়।

চলতি মার্কিন-চীন বাণিজ্যিক লড়াইএর প্রেক্ষিতে জি-২০ অর্থমন্ত্রীদের ফুকুওকা বৈঠক খুবই তাৎপর্যপূর্ণ। এই লড়াইয়ের ফলে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যেরই কেবল ক্ষতি হচ্ছে না; সার্বিকভাবে বিশ্ব বাণিজ্যের ক্ষেত্রেও এর প্রতিকূল প্রভাব পড়ছে। উল্লেখ করা যেতে পারে যে চীনের সঙ্গে ৩৭৯ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের বাণিজ্য ঘাটতির মোকাবিলায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র চীনা আমদানীর ওপর অতিরিক্ত ২৫ শতাংশ হারে মোট ২৫০ বিলিয়ন ডলার মূল্যের কর আরোপ করেছে। পালটা ব্যবস্থা হিসেবে চীনও মার্কিন আমদানীর ওপর ১১০ বিলিয়ন ডলার মূল্যের কর বসিয়েছে। ফলে বিশ্ব বাণিজ্য হ্রাস পেয়েছে। আন্তর্জাতিক অর্থ তহবিল ইতিমধ্যেই ২০১৯ সালের জন্য তাদের আন্তর্জাতিক বিকাশের পূর্বাভাস আগের ৩.৬ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৩.৩ করেছে। বস্তুতপক্ষে, আসন্ন জি-২০ ওসাকা শিখর সম্মেলনে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও চীনকে দ্বিপাক্ষিক আলোচনার মাধ্যমে এই সমস্যাগুলির সমাধান করতে হবে। তবে, ফুকুওকা সম্মেলনে অংশগ্রহণকারী মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্টিভেন নুচিন মার্কিন-চীন বাণিজ্য বিরোধ নিয়ে চিন্তিত নন। বরং তিনি অভিমত ব্যক্ত করেন যে যদি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও চীন তাদের বাণিজ্যিক সমস্যা মিটিয়ে নিতে না পারে তবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র চীনের আমদানী পণ্যের ওপর আরো ৩০০ বিলিয়ন ডলার মূল্যের কর আরোপ করবে।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র মনে করে যে চীনের ওপর বিধিনিষেধের ফলে বিভিন্ন চীনা বিনিয়োগ এবং উৎপাদন সংস্থা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সহ অন্যান্য দেশে পাড়ি দেবে ফলে বিশ্ব অর্থনীতির বিকাশ হার বৃদ্ধি পাবে। মার্কিন অর্থমন্ত্রীর বক্তব্যকে বিভিন্ন ইওরোপীয় দেশের অর্থনৈতিক মন্দা পরিস্থিতির নিরিখে দেখা যেতে পারে। এই দেশগুলির অনেকেই নতুন নতুন বিনিয়োগের অন্বেষণ করছে। তবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং চীনের পর বিশ্বের তৃতীয় অর্থনীতি জাপান কিন্তু চীন-মার্কিন বাণিজ্য সংঘর্ষে উদ্বিগ্ন। উল্লেখ করা যেতে পারে তারা  এই প্রথম জি-২০ শিখর সম্মেলনের আয়োজন করছে। জাপানের অর্থমন্ত্রী তারো আসো মনে করেন চীন ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের গৃহীত সংরক্ষণবাদের নীতির ফলে জাপানের অর্থনৈতিক বিকাশের গতিও মন্থর হয়ে পড়েছে।

জি-২০ অর্থমন্ত্রীদের সম্মেলনে ভারত দ্বিপাক্ষিক অর্থনৈতিক সহযোগিতার আওতায় কর ফাঁকির মোকাবিলায় নতুন বিশ্ব শৃংখলা সৃষ্টির প্রতি আলোকপাত করছে এবং নতুন আন্তর্জাতি কর প্রণালীর প্রতি মনোসংযোগ করছে। ভারতের নব নিযুক্ত অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারমণ ফুকুওকা সম্মেলনে যোগদানের আগে ইতিমধ্যেই তাঁর আলোচ্য বিষয়ের কথা জানিয়ে দিয়েছেন।

ভারত মনে করে এই সব ব্যবস্থা ব্যতিরেকে সদস্য দেশগুলির রাজস্ব সম্ভাবনার ওপর প্রতিকূল প্রভাব পড়বে। প্রযুক্তিগত বহুপাক্ষিক সংস্থাগুলি ব্যাপকভাবে কর ফাঁকি দিচ্ছে, এর হিসেব করা অসুবিধা সাপেক্ষ। মনে রাখতে হবে যে মার্কিন-চীন বাণিজ্য সংঘাতের ফলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ভারতের বাণিজ্য সম্ভাবনাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

জি-২০ দেশগোষ্ঠী বিশ্বের মোট জনসংখ্যার দুই-তৃতীয়াংশের প্রতিনিধিত্ব করে এবং বিশ্ব বাণিজ্যের ৮৫ শতাংশ তাদের অধীন। ফুকুওকা সম্মেলনের সঙ্গে বিশ্বের প্রায় ৫০টি দেশের বাণিজ্য মন্ত্রীদের আর একটি সম্মেলন হচ্ছে। ফুকুওকায় জি-২০ অর্থমন্ত্রীরা আসন্ন ওসাকা শিখর সম্মেলনে সর্বসম্মত সমাধানের লক্ষ্যে একটি নতুন মঞ্চ গড়ে তোলার চেষ্টা করে। (মূল রচনাঃ মনোহর মনোজ)