ওসাকা G-20 শিখর সম্মেলন

For Sharing

জাপানের ওসাকায় সম্প্রতি G-20 শিখর সম্মেলন অনুষ্ঠিত হল। উল্লেখ করা যেতে পারে, বিশ্বের মোট পণ্য ও পরিষেবা উৎপাদনের ৮০ শতাংশের মত অবদান এই G-20  গোষ্ঠীভুক্ত দেশগুলির। G-20 শিখর সম্মেলন হল বিশ্ব অর্থব্যবস্থার প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনার একটি প্রথম সারির আলোচনা মঞ্চ। এবারের এই সম্মেলনের আলোচ্য সূচির অন্যতম প্রধান বিষয় ছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে ক্রমবর্ধমান বাণিজ্য লড়াইয়ের প্রেক্ষিতে  বহুপাক্ষিক বাণিজ্য ব্যবস্থাপনায় আস্থা ফিরিয়ে আনার পন্থাপদ্ধতি নিয়ে আলোচনা। সম্মেলনে অংশ নিলেন উন্নত ও উন্নতিশীল দেশগুলির শীর্ষ রাজনৈতিক নেতাগণ। সম্মেলনে ভারতের প্রতিনিধিত্ব করলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি।

সম্মেলনের সমাপ্তিতে ওসাকা ঘোষণাপত্র নামে গৃহীত প্রস্তাবে বিশ্বে একটি অবাধ, ন্যায্য, স্বচ্ছ ও স্থিতিশীল বাণিজ্য ও বিনিয়োগ পরিবেশ সুনিশ্চিত করার লক্ষ্য অর্জনের প্রতি জোর দেওয়া হয়। অংশগ্রহণকারী নেতৃবৃন্দ বিশ্বের সর্ববৃহৎ বহুপাক্ষিক বাণিজ্য মঞ্চ- বিশ্ব বাণিজ্য সংগঠন-WTO’র সংস্কার সাধনের প্রয়োজনের বিষয়টি উল্লেখ করেন। WTO’র  আপিল শাখায় নতুন সদস্য নিয়োগে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের  ক্রমাগত বাধা দানের কারণে  এই বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার বিবাদ নিষ্পত্তি ব্যবস্থাপনা দুর্বল হয়ে যাচ্ছে বলে  ওসাকা ঘোষণাপত্রে উদ্বেগ ব্যক্ত করা হয়।

এবারের G-20 শিখর সম্মেলনের আয়োজক দেশ হিসেবে জাপান এই সম্মেলনের আলোচ্য বিষয়সূচি নির্ধারণে এক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা গ্রহণ করে। জাপানের প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবে সম্পূর্ণ আস্থার পরিবেশে তথ্যের অবাধ প্রবাহ  বিষয়ক ওসাকা ট্র্যাক নামে একটি  নতুন  ব্যবস্থাপনার সূচনা  করলেন।  অধিকাংশ নেতা এই ব্যবস্থাপনাকে স্বাগত জানালেও ভারত একে সর্বান্তকরণে সমর্থন করে নি। নতুন দিল্লির বক্তব্য, বিভিন্ন দেশের মধ্যে তথ্যের অবাধ প্রবাহ উৎপাদনশীলতা ও উদ্ভাবনী কাজকর্মে ইতিবাচক অবদান যোগালেও তথ্যের গোপনীয়তা, এর  সংরক্ষণ, নিরাপত্তা ও মেধাসত্ব প্রভৃতির সামনে নানা চ্যালেঞ্জ রয়েছে।

ওসাকা সম্মেলনের সামনে আর একটি বিবাদমূলক বিষয় ছিল জলবায়ু  পরিবর্তন প্রসঙ্গ। মার্কিন রাষ্ট্রপতি ডোনাল্ড ট্রাম্প তাঁর ভাষণে প্যারিস জলবায়ু চুক্তির বিষয়টির উত্থাপন এড়িয়ে গেলেন। তবে ফরাসী রাষ্ট্রপতি ইমানুয়েল ম্যাকঁরো সহ বেশ কয়েকজন নেতার উদ্যোগে ওসাকা ঘোষণাপত্রে প্যারিস চুক্তির পুরোপুরি রূপায়ণে স্বাক্ষরকারী দেশগুলির পক্ষ থেকে অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করা হল। অপরদিকে আর একটি পৃথক বিবৃতিতে ডোনাল্ড ট্রাম্প প্যারিস চুক্তিকে মার্কিন শ্রমিক ও করদাতাদের স্বার্থ পরিপন্থী হিসেবে উল্লেখ করলেন।

সম্মেলনে অর্থনৈতিক দক্ষতা বৃদ্ধি, আর্থিক উন্নয়নের সঙ্গে সঙ্গে পরিবেশগত ও সামাজিক ভারসাম্য বজায় রাখা, নারী সমাজের আর্থিক ক্ষমতায়ন, দক্ষ পরিকাঠামোগত ও প্রাকৃতিক বিপর্যয় মোকাবিলা ব্যবস্থাপনা বিকাশের প্রয়োজনের ওপর নেতৃবৃন্দ  জোর দেন।

ওসাকা সম্মেলনে টাকার কালোবাজারি ও সন্ত্রাসবাদে অর্থ সহায়তার মত বিপদের মোকাবিলায় আর্থিক কর্মপরিকল্পনা বিষয়ক টাস্ক ফোর্স-FATF’এর বিধিনিয়মগুলির  দ্রুত প্রয়োগের লক্ষ্যে ব্যবস্থা গ্রহণের ওপর নেতাগণ জোর দেন।  এ ছাড়াও আন্তর্জাতিক স্তরে দুর্নীতি দমনের লক্ষ্যে দুর্নীতির দায়ে অভিযুক্ত পলাতক ব্যক্তির অন্য কোনও দেশে নিরাপদ আশ্রয় গ্রহণ রোধ ও অবৈধভাবে অর্জিত সম্পত্তি উদ্ধারে নেতাগণ পারস্পরিক সহযোগিতায়  অঙ্গিকার ব্যক্ত করলেন।

বিশ্ব অর্থব্যবস্থার সামনে প্রধান প্রধান চ্যালেঞ্জের মোকাবিলার লক্ষ্যে একটি আলোচনা মঞ্চ হিসেবে এই G-20 শিখর সম্মেলনের পাশাপাশি  নেতাগণ একাধিক দ্বিপাক্ষিক ও ত্রিপাক্ষিক বৈঠকে মিলিত হলেন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে তীব্র বাণিজ্য লড়াইয়ের প্রশমনে দুটি দেশের মধ্যে বহু প্রতীক্ষিত বৈঠক হল। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও জাপান সহ বেশ কয়েকটি দেশের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে ভারতের কৌশলগত ও অর্থনৈতিক স্বার্থ, প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা সহ একাধিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আলোচনা করলেন। এছাড়াও তিনি ভারত প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে জাপান, আমেরিকা ও ভারতের মধ্যে ত্রিপাক্ষিক সহযোগিতা প্রসঙ্গ নিয়ে কথা বললেন। শ্রী মোদি রাশিয়া, ভারত ও চীনের মধ্যে বৈঠকে বহুপাক্ষিক সহযোগিতা প্রসঙ্গ এবং ব্রিক্স দেশগোষ্ঠীর বৈঠকে সন্ত্রাসবাদ দমন প্রসঙ্গ নিয়ে আলোচনা করলেন। সম্মেলনের শেষে প্রধানমন্ত্রী আন্তর্জাতিক অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে বিপর্যয় মোকাবিলা পরিকাঠামোর বিকাশে G-20 নেতৃবৃন্দের কাছে আহ্বান জানালেন। G-20’র পরবর্তী শিখর সম্মেলন অনুষ্ঠিত হবে ভারতে ২০২২ সালে।  (মূল রচনাঃ- ডঃ তিতলি বসু)