রুশ-ভারত-চীন ত্রিপাক্ষিক বৈঠক

For Sharing

প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি জাপানের ওসাকায় জি-২০ সম্মেলনের অবসরে রাষ্ট্রপতি শি জিনপিং এবং রাষ্ট্রপতি ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে ত্রিপাক্ষিক বৈঠক করেন। এই রাশিয়া, ভারত, চীন ( আর আই সি) বৈঠকে ভারতের গুরুত্ব বোঝা যায়। রাশিয়ার বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা এবং চীনের বিরুদ্ধে শুল্ক আরোপের মাধ্যমে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তাদের ওপর চাপ সৃষ্টির চেষ্টা করছে। জরুরী বিষয় হল সকলকে  ঐক্যবদ্ধ রাখার জন্য বর্তমান আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা  অব্যাহত রাখলে দীর্ঘ মেয়াদী স্বার্থ রক্ষায় সহায়ক হবে।

২০০৩ সাল থেকে আর আই সি দেশগুলির বিদেশ মন্ত্রীদের মধ্যে সম্পর্ক গড়ে উঠেছে এবং আর আই সি সরকার/রাষ্ট্র প্রধানদের  বৈঠক হয় ২০১৬ সালে। সেই সময় সেন্ট পিটার্সবার্গ, রাশিয়ায় জি- ৮ সম্মেলনের পর চীনের রাষ্ট্রপতি হু জিনতাও, রুশ রাষ্ট্রপতি ভ্লাদিমির পুতিন এবং তদানিন্তন ভারতীয় প্রধান মন্ত্রী ড.মনমোহন সিং বৈঠকে মিলিত হন।

প্রধানমন্ত্রী মোদি, রাষ্ট্রপতি শি এবং রাষ্ট্রপতি পুতিনের মধ্যে বর্তমান আলোচনা   ২০১৮সালের নভেম্বরে তাদের মধ্যে যে বৈঠক হয় সেই আলোচনাকে পরবর্তি স্তরে উন্নীত করলো। এই তিন নেতা ২০১৯এর সেপ্টেম্বরে  ভাদিভস্তক (রাশিয়া)এ পূর্বাঞ্চলীয় অর্থনৈতিক মঞ্চের বৈঠকের সময় আবার মিলিত হবেন বলে স্থির হয়েছে।  এই বৈঠকে উল্লেখ করা হয় যে ক্রমবর্ধমান সংরক্ষণবাদ এবং একপাক্ষিকতার দরুণ আর আই সি দেশগুলির ঐক্যবদ্ধ হওয়ার যথেষ্ঠ গুরুত্ব রয়েছে। কারণ এ সবের ফলে বিশ্ব অর্থনীতির গতি স্লথ হয়েছে এবং উদীয়মান বাজার ও বিকাশশীল দেশগুলির ওপর তার নেতীবাচক প্রভাব পড়েছে।

এছাড়া এই সব বৈঠক এই তিনটি শক্তিধর দেশের নেতারা নিজেদের মধ্যে উন্নত বোঝাপড়া গড়ে তুলতে সক্ষম হচ্ছে এবং নেতৃত্বের সর্বোচ্চ স্তরে আস্থা বৃদ্ধি পাচ্ছে। এই ধরণের বৈঠক অভিন্ন স্বার্থ সংশ্লিষ্ট সমস্ত বিষয়ে পরামর্শের মাধ্যমে কৌশলগত যোগাযোগ মজবুত করার সুযোগ সৃষ্টি করে।

ওসাকা ত্রিপাক্ষিক বৈঠকে যে সব বিষয়ে আলোচনা হয় তার মধ্যে রয়েছে আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদ, তিনটি দেশের মধ্যে ক্রমাবনত বাণিজ্যিক সম্পর্ক, আন্তর্জাতিক ঘটনাবলী এবং জলবায়ু পরিবর্তন। এই বৈঠকে শ্রী মোদি সন্ত্রাসবাদের বিষয়ে একটি আন্তর্জাতিক সম্মেলন আয়োজনে শ্রী শি এবং শ্রী পুতিনের সহায়তা চেয়েছেন। স্মরণ করা যেতে পারে যে সন্ত্রাসবাদী কার্যকলাপের মোকাবিলায় একাধিক বহুপাক্ষিক চুক্তি থাকলেও  সন্ত্রাসবাদের সংজ্ঞা নির্ণায়ক তেমন কোনো চুক্তি নেই। সাংহাই সহযোগিতা সংগঠন’এস সি ওর মাধ্যমে সন্ত্রাসবাদের চ্যালেঞ্জের মোকাবিলা করার চেষ্টা করা হয়েছে এবং আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে একাধিক পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। ভারত আশা করে আর্থিক কর্মী গোষ্ঠী এফ এ টি এফ সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলায় পাকিস্তান পর্যাপ্ত ব্যবস্থা যাতে গ্রহণ করে তা দেখবে। এফ এ টি এফ সম্প্রতি উল্লেখ করে যে পাকিস্তানে তৎপর গোষ্ঠীগুলির আর্থিক মদতে আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদ বৃদ্ধি পেয়েছে।

চীনের বক্তব্য হল, এই বৈঠকের ফলে ইরেশিয়ার গুরুত্ব বাড়াবে এবং একই সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের উন্নতি হবে। চীনের সহকারী বিদেশমন্ত্রী ঝাং জুন বলেন, ভারত এবং রাশিয়ার সঙ্গে চীনের সম্পর্কের উন্নতি হচ্ছে এবং তিনটি দেশের নেতারা নিজেদের মধ্যে মত বিনিময় অব্যাহত রেখেছে। গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক বিষয়ে সহযোগিতা মজবুত করা আবশ্যক যাতে বহুপাক্ষিকতাকে উচ্চ ধারণ করে এবং সংরক্ষণবাদের বিরোধিতা করে আন্তর্জাতিক শান্তি বজায় রাখা যায়।

রাশিয়ার মত হল, যখন চীন রাশিয়া থেকে এগিয়ে গেছে এবং অবিন্যস্ত বিশ্ব শৃংখলায়  ভারত ভারসাম্য সৃষ্টির পথে এগোচ্ছে সেই সময় আর আই সি বিশ্ব রাজনীতিতে তাদের প্রভাব বিস্তারে সহায়তা করবে। এক্ষেত্রে পরিস্কার বার্তা হল রাশিয়া এবং চীন চায় ভারত আন্তর্জাতিক ভৌগলিক-রাজনীতি এবং ভৌগলিক-অর্থনীতির  ক্ষেত্রে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে স্বাধীনভাবে কাজ করুক।

সব শেষ বলা যায়, মনে রাখতে হবে যে জাপান, আমেরিকা এবং ভারতের ত্রিপাক্ষিক বৈঠকের সময়েই আর আই সি বৈঠক হচ্ছে। সেটিও ওসাকাতেই অনুষ্ঠিত হয়। এই ধরণের ত্রিপাক্ষিক বৈঠক বর্তমান উত্তাল বিশ্ব রাজনীতির গতিপথ নির্ণয়ে ভারতের গৃহীত নীতি কৌশলের অংগ বলেই মনে হচ্ছে। (মূল রচনাঃ ড.রাজদীপ পাকানাতি)