সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে পাকিস্তানের পদক্ষেপ  

For Sharing

পাকিস্তান ১৯৯৭’এর সন্ত্রাস বিরোধী আইনের ভিত্তিতে লস্কর-এ  তৈবা -LeT এবং হাফিজ সইদ সহ সহযোগী সংগঠন জামাত-উদ-দাওয়া –JuD’র একাধিক সদস্যর বিরুদ্ধে সন্ত্রাসবাদী সংগঠনকে আর্থিক মদতদানের অভিযোগে অন্ততঃ ২৩টি এফআইআর দায়ের করেছে। সইদের প্রধান সহযোগী আবদুল রহমান মাক্কির বিরুদ্ধেও অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে JuD তথা দাতব্য প্রতিষ্ঠান ফালাহ-ই-ইনসানিয়ত ফাউন্ডেশন – FIF’এর মতো সংস্থাকে সন্ত্রাসবাদী সংগঠনের জন্য আর্থিক মদতদানে ব্যবহার করার   অভিযোগ আনা হয়েছে। পাঞ্জাব সরকারের সন্ত্রাস দমন বিভাগের বিস্তারিত তদন্তের ভিত্তিতে ঐ অভিযোগগুলি দায়ের করা হয়। ঐ সংস্থা ছাড়াও আরো ৫টি ট্রাস্টের মাধ্যমে সন্ত্রাসবাদীদের অর্থ যোগান দেওয়া হত বলে তদন্তে জানা গিয়েছে। ঐ সংস্থাগুলি দান করার নামে সংগৃহীত অর্থে বিপুল পরিমাণ সম্পত্তি আহরণ করে বলেও জানানো হয়েছে।

হাফিজ সইদ ২০০৮’এ মুম্বাই সন্ত্রাসবাদী হামলার মূল চক্রী। এই হামলায় ১৬৪ জন নিহত হন। এছাড়াও ভারতে একাধিক সন্ত্রাসবাদী হামলার পরিকল্পনার মূল ষড়যন্ত্রী হাফিজ।

পাকিস্তানের এই পদক্ষেপ তাৎপর্যপূর্ণ; তবে এ ক্ষেত্রে কয়েকটি প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে। হাফিজ সৈইদ ও তার তথাকথিত দতব্য সংস্থাগুলি অন্ততঃ তিন দশকেরও বেশী সময় ধরে এই ধরণের কাজ করে চলেছে। সুতরাং বিষয়টি এখন স্বীকার করার আলাদা তাৎপর্য কি? এই বিষয়টি অন্বেষণে এত দীর্ঘ সময় লাগাবার পর পাকিস্তান প্রকৃতপক্ষে বিস্তারিত তদন্তে কতটা আগ্রহী? যদি ধরে নেওয়া হয় যে এই পদক্ষেপের উদ্দেশ্য সঠিক, তবে পাকিস্তান সরকারের পদক্ষেপ নিতে এত দীর্ঘ সময় লাগল কেন?

এর উত্তর স্পষ্ট। পাকিস্তান সব সময়ই তাদের ভূমিতে বেড়ে ওঠা এই  সংগঠনগুলিকে অন্যান্য দেশের বিরুদ্ধে হামলার জন্য কৌশলগত সম্পদ হিসাবে ব্যবহার করে এসেছে। এমনকি পাকিস্তানের প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি জেনারেল পরভেজ মুশারফও একথা জানিয়েছেন যে, পাকিস্তান সন্ত্রাসবাদীদের দেশের মূল্যবান সম্পদ হিসেবে তৈরি করেছে। তারা কাশ্মীর ও ভারতের অন্যান্য অঞ্চলে হামলার উদ্দেশ্যে এই সন্ত্রাসবাদী সংগঠনগুলিকে ব্যবহার করে আসছে। ইসলামাবাদ তাদের দুষ্কর্ম ঢাকা দেওয়ার জন্যই এগুলি না জানার ভান করেছে। এই সংগঠনগুলির বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করতে এত দীর্ঘ সময় লাগার কারণও এর থেকেই বোঝা যায়।

মূল কথা হল, পাকিস্তান দেশের ভিতরে এবং বাইরে উভয় ক্ষেত্রেই কঠিন পরিস্থিতির সম্মুখীন। আন্তর্জাতিক চাপের পাশাপাশি দেশের অভ্যন্তরে প্রবল অর্থনৈতিক সংকটের প্রেক্ষিতে সরকারের পক্ষে দৈনন্দিন ব্যয় নির্বাহ কঠিন হয়ে পড়েছে। প্রয়োজনীয় পণ্যসামগ্রীর  মূল্য আকাশ ছুঁয়েছে, জনগণের রোষও বাড়ছে। অন্যদিকে সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে দৃঢ় পদক্ষেপ না নিলে কোনরকম আন্তর্জাতিক সমর্থন পাওয়া যাবে না তাও পাকিস্তানের কাছে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। সম্প্রতি জাপানের ওসাকায় অনুষ্ঠিত জি-টোয়েন্টি বৈঠকে এই স্পষ্ট বার্তা পাকিস্তানকে দেওয়া হয়েছে।

সন্ত্রাসে অর্থ যোগানেরর বিষয়ে নজরদারির লক্ষ্যে আর্থিক ব্যবস্থা গ্রহণকারী আন্তর্জাতিক সংস্থা – FATF পাকিস্তানকে তাদের ধূসর তালিকাভূক্ত করেছে এবং সতর্ক করে দিয়ে জানিয়েছে, পাকিস্তান সন্ত্রাসে মদতদান বন্ধে কার্যকরী পদক্ষেপ না নিলে আরো কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। FATF গত ২১শে জুন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অরল্যান্ডোতে এক বৈঠকে এই কথা জানিয়েছে।

পাকিস্তান সরকার এর আগেও সন্ত্রাসবাদী ও তাদের সংগঠনদের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ গ্রহণে তাদের আগ্রহের ছবি বিশ্বের সামনে তুলে ধরতে চেয়েছে। তবে বাস্তবে কোনোবারই তা কোনো কার্যকর পদক্ষেপ ছিল না। বিশ্বের সামনে একটি ভ্রান্ত ধারণা তুলে ধরাই ছিল তার উদ্দেশ্য। তবে এবারে একটি আশার কথা হল, পাকিস্তান সরকার ও সেনাবাহিনী মিলিতভাবে এই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে। ফলে সন্ত্রাসবাদী সংগঠনগুলির বিরুদ্ধে কার্যকরী ব্যবস্থা গ্রহণে সেনাবাহিনীর হস্তক্ষেপের আশঙ্কা কম। তবে তা কতটা বাস্তবায়িত হবে সেটাই দেখার বিষয়। বিশ্বের আশা, পাকিস্তান নিজ স্বার্থ তথা বিশ্বশান্তির স্বার্থে সন্ত্রাসবাদীদের বিরুদ্ধে সর্বতোভাবে এবং  আন্তরিকভাবে প্রয়াস গ্রহণ করবে।

এদিকে নতুন দিল্লি হাফিজ সইদের বিরুদ্ধে পাকিস্তানের এই তথাকথিত কৃত্রিম প্রয়াসকে খারিজ করে দিয়েছে। এটি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে বিভ্রান্ত করার লক্ষ্যে করা হয়েছে বলে ভারত মনে করে। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রক জানিয়েছে, পাকিস্তানের ভূমি থেকে সক্রিয় সন্ত্রাসবাদী এবং তাদের সংগঠনগুলির বিরুদ্ধে পাকিস্তান বাস্তবে কতটা বিশ্বাসযোগ্য, অপরিবর্তনীয় এবং যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ করবে তার ওপরেই সমগ্র প্রক্রিয়ায় পাকিস্তানের সদিচ্ছার বিষয়টি নির্ভর করছে।

(মূল রচনাঃ অশোক হান্ডু)