দোহায় আফগান আলোচনা

For Sharing

কাতারের দোহায় সম্প্রতি সম্পন্ন আফগানিস্তান বিষয়ক আলোচনার পর সংঘাত দীর্ণ আফগানিস্তানে শান্তি ফিরে আসার একটা ক্ষীণ সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে  বলেই বিশেষজ্ঞ মহল অনুমান করছে। আফগান রাজনৈতিক নেতা ও তালিবান প্রতিনিধিদের মধ্যে দু দিনের দোহা আলোচনায় আফগানিস্তানে ১৮ বছরের বেশি সময় ধরে চলে আসা সংঘর্ষ নিরসনের লক্ষ্যে একটি রূপরেখা রচনা করা হতে পারে বলে সম্মেলন শেষে জারি করা বিবৃতিতে  আভাস পাওয়া গেছে।

আফগানিস্তানের সাধারণ মানুষের জীবন, জীবিকা ও মর্যাদা রক্ষা ছাড়াও অসামরিক মানুষের প্রাণহানি যথাসম্ভব কম করতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে ওই বিবৃতিতে জানানো হয়েছে।  জার্মানি ও কাতারের উদ্যোগে প্রায় ৭০ জন আফগান রাজনৈতিক নেতা, সুশীল সমাজের প্রতিনিধি ও মহিলা প্রতিনিধিদের সঙ্গে তালিবান প্রতিনিধিদের ওই আলোচনার আয়োজন করা হয়। উল্লেখ করা যেতে পারে, ওই আলোচনায় আফগানিস্তানের আশরাফ গণি সরকারকে পুরোপুরি বাইরে রাখা হয়; কারন তালিবানরা ওই সরকারকে অবৈধ বলেই মনে করে। আর সে জন্যই তারা   আফগান সরকারের সঙ্গে এখনও পর্যন্ত সরাসরি কথা বলতে রাজী নয় নি।

শান্তি প্রক্রিয়ার গতি প্রকৃতি নির্ধারণের ক্ষেত্রে পরস্পর বিরোধী রাজনীতির খেলা চলছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আফগানিস্তান থেকে যত শীঘ্র সম্ভব তার সেনা  প্রত্যাহারের  কথা ভাবছে; এবং  সঙ্গে সঙ্গে আফগান শান্তি প্রক্রিয়া তরান্বিত করতে চাইছে। সে কারণেই মার্কিন রাষ্ট্রপতি ডোনাল্ড ট্রাম্প ওই আলোচনার  জন্য গত বছরের সেপ্টেম্বর মাসে জালমে খলিলজাদকে কাবুলে বিশেষ দূত করে পাঠান। খালিলজাদ তালিবান আধিকারিকদের সঙ্গে দোহায় ইতিমধ্যেই সাত দফায় বৈঠক করেছেন, যে বৈঠকে চারটি প্রধান বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়, যেমন মার্কিন সেনা প্রত্যাহার, সন্ত্রাস দমন, আফগান ও তালিবানদের মধ্যে আলোচনা ও সংঘর্ষ বিরতি চুক্তি।  কাবুল সরকারের ওপরেই শান্তি আলোচনার ভবিষ্যৎ  নির্ভর করছে, এই মর্মে   খালিলজাদের বিবৃতি অর্ধ সত্য বলেই আন্তর্জাতিক মহলের ধারণা, কারণ  আফগাননিস্তানের প্রাক্তন গোয়েন্দা প্রধান  আমরুল্লা সালেহ বলেছেন,  পাকিস্তান সরকারের দুরভিসন্ধিমূলক আচরণ শান্তি আলোচনায় বার বার বিঘ্ন ঘটিয়েছে।

বিশেষজ্ঞগণের ধারণা, আফগানিস্তান থেকে যতশীঘ্র সম্ভব সেনা প্রত্যাহার করতে ওয়াশিংটনের ঘোষণা আফগান শান্তি আলোচনার গতি প্রকৃতি   নির্ধারণে তালিবানদের ভূমিকা আরও বাড়িয়েছে। প্রকৃতঅর্থে তালিবানরা পাকিস্তানের প্রতিনিধি হিসেবেই ওই আলোচনায় ইসলামাবাদের স্বার্থকে এগিয়ে নিয়ে যেতে চাইছে।

দোহায় আফগান প্রতিনিধি ও তালিবানদের মধ্যে সাম্প্রতিক আলোচনায় গৃহীত একটি প্রস্তাব অনুযায়ী, আফগান নিরাপত্তা বাহিনী ও অসামরিক মানুষের বিরুদ্ধে তালিবানদের তৎপরতাকে জিহাদ হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে, যার বিরুদ্ধে আফগানিস্তানের আইন সভার সদস্যগণ তীব্র আপত্তি জানিয়েছেন। তাঁদের বক্তব্য ১৯৮৯ সালে আফগানিস্তান থেকে সোভিয়েত সেনা প্রত্যাহারের পরেই জিহাদ বলে যা অভিহিত করা হয় তার অবসান ঘটে।

এই সব ঘটনার প্রেক্ষিতে শান্তি প্রক্রিয়ার ভবিষ্যতে এখনও বহু প্রতিবন্ধকতা রয়ে গেছে বলেই মনে করা হচ্ছে। তবে তা সত্বেও সাম্প্রতিক দোহা আলোচনায় আফগানিস্তানে শান্তি ফিরিয়ে আনার লক্ষ্যে একটা আন্তরিক প্রচেষ্টা গ্রহণের আভাস পাওয়া গেছে; যাকে কেন্দ্র করে সকল মহলের কাছে  সংঘর্ষ অবসানের প্রত্যাশা জেগেছে।

আফগানিস্তানের প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি হামিদ কারজাই এই শান্তি আলোচনার ফলাফলকে স্বাগত জানিয়েছেন। তিনি বলেছেন, দ্বিতীয় কোন দেশকে জড়িত না করে আফগানিস্তানেরই সকল মহলের মধ্যে শান্তি আলোচনার মাধ্যমে দেশে শান্তি ফিরিয়ে আনা সম্ভব হবে। গত মাসে সাঙ্ঘাই সহযোগিতা সংগঠন SCO সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিও একটি  শান্তিপূর্ণ, স্থিতিশীল ও সমৃদ্ধ আফগানিস্তানের পক্ষে জোরালো সওয়াল করেছেন। নতুন দিল্লি বারবার বলে আসছে, আফগানিস্তানের নেতৃত্বে ও  নিয়ন্ত্রণেই  শান্তি ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নিতে হবে।

ইতিহাস সাক্ষী আছে, বহু দিন ধরেই আফগানিস্তান বিভিন্ন দেশের পরস্পর বিরোধী স্বার্থের বলি হয়েছে। আফগানিস্তানের রাজনৈতিক নেতাদের একাংশের ধারণা, ঐ দেশ থেকে মার্কিন ও ন্যাটো সেনার তড়িঘড়ি প্রত্যাহার  ঐ দেশে নিজ স্বার্থ সিদ্ধি করার ক্ষেত্রে পাকিস্তানকে উৎসাহ জোগাবে, তালিবানদের তৎপরতা ও জিহাদি কাজকর্ম বৃদ্ধির ক্ষেত্র প্রস্তুত করবে, যার প্রতিকূল প্রভাব পড়বে ভারতের ওপর। (মূল রচনাঃ-সুনীল গাটাড়ে)