উত্তর কোরিয়ার ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষায় উত্তেজনা বৃদ্ধি

For Sharing

কোরিয় উপদ্বীপে স্থায়ী শান্তি স্থাপনের ক্ষেত্রে আর একবার অন্তরায় সৃষ্টি ক’রে উত্তর কোরিয়া গতসপ্তাহে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ করে। দুই কোরিয়ার মধ্যবর্তী শান্তি অঞ্চলে উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং উন এবং মার্কিন রাষ্ট্রপতি ডোনাল্ড ট্রাম্পের বৈঠকের এক মাসের মধ্যে এই পরীক্ষা করা হয়। উভয় নেতা তাদের বৈঠকে বকেয়া প্রশ্নগুলির সর্বাত্মক মিমাংসার লক্ষ্যে কাজ করার অঙ্গীকার করেন।

উত্তর কোরিয়ার পূর্ব উপকূলে অবস্থিত ওয়ানসান থেকে এই ক্ষেপণাস্ত্রগুলি উৎক্ষেপণ করা হয়। উত্তর কোরিয়া এবং দক্ষিণ কোরিয়ার সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলি জানিয়েছে যে এই ক্ষেপণাস্ত্রগুলি রণকৌশলসংক্রান্ত। এগুলি অধিক ভ্রাম্যমান, লুকোনো সহজ এবং খুঁজে বার করা খুব কঠিন। স্পষ্টতই এর নিরাপত্তার প্রভাব যতটা কোরিয়া উপদ্বীপের ওপর পড়বে ততটা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ওপর পড়বে না।

ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণের পর এক বিবৃতিতে কিম জং উন বলেছেন যে এই উৎক্ষেপণের লক্ষ্য হল উত্তর কোরিয়ার ওপর সম্ভাব্য কোনো নিরাপত্তাজনিত আশংকা প্রতিহত করা। এই প্ররোচনামূলক কাজের জন্য দক্ষিণ কোরিয়াকে দায়ী করেন তিনি। দক্ষিণ কোরিয়া আগামী মাসে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বার্ষিক যৌথ সামরিক মহড়া চালাবে। অনেক বছর ধরে এই মহড়া চালানো হচ্ছে। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, কিম জং উন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বা রাষ্ট্রপতি ট্রাম্পের কথা উল্লেখ করেন নি। এ থেকে বোঝা যায় যে উত্তর কোরিয় প্রশাসন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে উত্তেজনা বৃদ্ধি করতে চায় না, আবার একই সঙ্গে তারা তাদের ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি পরিত্যাগও করবে না।

উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক সক্ষমতা বৃদ্ধি করার দীর্ঘ মেয়াদী কারণ হল তাদের টিকে থাকার প্রশ্ন, তবে সাম্প্রতিক পরীক্ষার সঙ্গে মার্কিন-দক্ষিণ কোরিয়ার আসন্ন বার্ষিক যৌথ সামরিক মহড়াও যুক্ত। তাছাড়া দক্ষিণ কোরিয়ার ৪০ এফ-৩৫এ জেট সংগ্রহের বিষয়টিও উত্তর কোরিয়াকে এই ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষায় প্ররোচিত করে থাকতে পারে।

দক্ষিণ কোরিয়ার রাষ্ট্রপতি মুন জায়-ইন  এই পরীক্ষার নিন্দা ক’রে উত্তর কোরিয়ার বিরুদ্ধে রাষ্ট্রসংঘ প্রস্তাব লঙ্ঘণের অভিযোগ করেছেন। এই প্রস্তাবে উত্তর কোরিয়ার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রযুক্তি বিকশিত করা এবং নির্মাণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। পিয়ংইয়ং এর নিন্দা করে সোল বলেছে দক্ষিণ কোরিয়ার নিরাপত্তার ওপর এর কোনো প্রভাব পড়বে না।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এই ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণের বিষয়ে  হাল্কা প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছে। মার্কিন সরকারের বিবৃতিতে দেখা যায় স্বল্প পাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষার ক্ষেত্রে তারা তেমন কঠোর সমালোচনা করে না তবে উত্তর কোরিয়ার দূর পাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষার সময় তারা তীব্রভাবে প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে থাকে। উত্তর কোরিয়ার কার্যকলাপের ফলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা কতটা প্রভাবিত তার ওপর নির্ভর করে মার্কিন প্রতিক্রিয়া।

মে মাসের পরীক্ষার ক্ষেত্রেও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং দক্ষিণ কোরিয়া তেমন জোড়ালো প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে নি। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপনকে উত্তর কোরিয়ার সমঝোতা কৌশল বলে মনে করে। তবে এই ধরণের কার্যকলাপ যদি অব্যাহত থাকে তবে তা কোরিয় উপদ্বীপের নিরাপত্তা এবং শান্তি বিঘ্নিত করতে পারে।

২০১৯এর ফেব্রুয়ারী মাসে হ্যানয়ে ট্রাম্প এবং কিমের বিফল আলোচনা সত্বেও উভয় নেতা জুনে আবার মিলিত হন। তবে এই আলোচনায়ও তেমন কোনো উন্নতি হয় নি। হ্যানয় শিখর সম্মেলনের পর থেকে উত্তর কোরিয়া এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে কার্যকরী স্তরে আলোচনা বন্ধ রয়েছে। সমালোচকরা মনে করেন, উত্তর কোরিয়ার বিষয়ে ট্রাম্পের দৃষ্টিভঙ্গী ফলপ্রসূ হয় নি এবং উত্তর কোরিয়া এখনও তাদের সামরিক ক্ষমতা বাড়িয়ে চলেছে। অপর গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল চীনের সঙ্গে উত্তর কোরিয়ার ঘনিষ্টতা।

পেইচিং এর অনুপস্থিতি শান্তি প্রক্রিয়ায় স্থায়ী প্রভাব ফেলবে না। এই সমস্যার স্থায়ী সমাধানের জন্য ছ’দলীয় আলোচনা পুনরুজ্জীবিত করতে হবে। তবে এই মূহুর্তে চীন-মার্কিন মতপার্থক্য উত্তর কোরিয়াকে পরমাণু ক্ষমতা বৃদ্ধিতে বিরত করতে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করবে। এমন পরিস্থিতিতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যেতে হবে যাতে পরবর্তি পরীক্ষা থেকে তাদের  আটকানো যায়।

ভারত চায় এক স্থিতিশীল নিরাপদ এবং উত্তেজনা মুক্ত কোরিয় উপদ্বীপ। সমস্ত সংশ্লিষ্ট পক্ষকে এই লক্ষ্য অর্জনের দিশায় কাজ করতে হবে। (মুল রচনাঃ ড. রাহুল মিশ্র)