ইমরান খান সরকারের এক বছর – উদযাপন ও বিক্ষোভ

For Sharing

পাকিস্তানে ইমরান খান সরকারের গত সপ্তাহে এক বছর সম্পূর্ণ হল। সরকার এই উপলক্ষ্যটি উদযাপন করলেও বিরোধীরা সমস্ত পাকিস্তান জুড়ে বিক্ষোভ চালায় এবং তারা ২৫শে জুলাই দিনটিকে পাকিস্তানের ইতিহাসে এক কালো দিন বলে বর্ণনা করে। সমস্ত বিরোধী দল PML(N), PPP, JeI একসঙ্গে লাহোর, করাচি, কোয়েট্টা এবং বাকি জায়গাতেও এই বিক্ষোভ সংগঠিত করে। এই সব রাজনৈতিক দলের নেতা মারিয়াম নওয়াজ, বিলাওয়াল ভুট্টো জারদারি এবং মৌলানা ফজলুর রহমান অভিযোগ এনে বলেন যে সরকার বিরোধীদের ভয় দেখাচ্ছে, সংবাদ-মাধ্যমের কন্ঠরোধ করেছে, দেশকে অর্থনৈতিকভাবে বিপর্যস্ত করে তুলেছে এবং দেশকে দেউলিয়ার পথে এগিয়ে দিয়েছে, প্রাদেশিক আবেগকে তীব্র করে তুলছে ও মার্কিন আদেশের অধীনে কাজ করছে। কিন্তু সবথেকে বড় হুমকিটা দিয়েছেন মৌলানা ফজলুর রহমান। তিনি  অগাস্ট মাসের মধ্যে ইমরান খানকে পদত্যাগ করার চূড়ান্ত সময় দিয়েছেন, অন্যথায় সমগ্র দেশ ইলামাবাদের দিকে এগিয়ে যাবে সরকারকে সমর্পনে বাধ্য করতে।

নওয়াজ শরীফ সরকারকেও  গদিচ্যুত করতে ইমরান খান এধরণেরই মিছিল ও অভিযোগ এনেছিলেন। তাঁর বিক্ষোভ মিছিল পরিণত হয়েছিল  ইসলামাবাদে এক লংমার্চে এবং ইসলামাবাদে চার মাস ধরে ধর্ণায় বসেছিল সেই বিক্ষোভ সমাবেশ যা ইসলামাবাদকে বস্তুত অচল করে দিয়েছিল। বিরোধী দলগুলি এখন ইমরান খান সরকারের বিরুদ্ধে তাই করতে চাইছে।

ইমরান খান সরকার পাকিস্তানে ক্ষমতায় এসেছিল এক নতুন পাকিস্তান গড়ার যেখানে যুব সম্প্রদায়ের জন্য তৈরি করা হবে কর্মসংস্থান, অর্থনীতিকে করা হবে চাঙ্গা এবং উন্নততর প্রশাসন প্রদানের অঙ্গীকার নিয়ে। কিন্তু বাস্তবে,  অর্থনীতি এক চরম সংকটের সম্মুখীন, মানুষ কর্মসংস্থান হারাচ্ছে এবং মূল্যবৃদ্ধি হয়েছে আকাশছোঁয়া। হাস্যকর বিষয় হল প্রধানমন্ত্রী এখন রুটি ও নানের  মূল্য ঠিক করার জন্য  আদেশনামা জারি করছেন, যেন অন্য সব অত্যাবশ্যক পণ্যের দাম কোনো বিষয়ই নয়। একই সঙ্গে  প্রধানমন্ত্রী বিরোধীদের বিরুদ্ধে জাতীয় দায়িত্ব বিষয়ক ব্যুরোকে ব্যবহার করছেন ফলস্বরূপ তিন প্রাক্তন নেতা নওয়াজ শরীফ,  আসিফ আলি জারদারি এবং শাহিদ খাকান আব্বাসি দুর্নীতির অভিযোগে কারাবাস করছেন। উল্লেখ্য,  শ্রী জারদারি সেদেশের প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি।

বিরোধীরা ইমরান খানকে এক পুতুল প্রধানমন্ত্রী বলে অভিযোগ করেছেন যার লাগাম রয়েছে তাকে  ক্ষমতায় আনা সামরিক বাহিনীর হাতে। ইমরান খানকে বিরোধীরা ‘বাছাই’ প্রধানমন্ত্রী বলে আসছেন। সরকার, সেনা প্রধান জেনারেল কামার জাভেদ বাজওয়াকে সম্প্রতি অর্থনৈতিক উন্নয়ন পর্ষদের সদস্য করেছে যা প্রমান করে যে সেদেশে অসামরিক সরকারের ওপর সামরিক বাহিনীর প্রভাব রয়েছে। সেদেশের ইতিহাসে এই প্রথমবার মার্কিন রাষ্ট্রপতি ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে আলোচনায় যাওয়ার সময় প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে যান সেনা প্রধান।

পাকিস্তান পরিচালনে সামরিক বাহিনীর হাত থাকার বিষয়টি এই ঘটনা থেকেই স্পষ্ট হয়ে যায়। স্মরণ করা যেতে পারে যে এক বছর আগে সরকারে দায়িত্বভার গ্রহণ করার অব্যবহিত পরেই পাকিস্তানী বংশোদ্ভূত মার্কিন অর্থনীতিবিদ আতিফ মিয়াকে অর্থনৈতিক উন্নয়ন পর্ষদে রাখার যে প্রস্তাব ইমরান খান দিয়েছিলেন তা সামরিক বাহিনী ও কট্টরবাদীদের চাপে প্রত্যাহার করে নিতে বাধ্য হন। তখন থেকেই পাকিস্তানী সেনা বাহিনীকে আর ফিরে তাকাতে হয় নি। ইমরান খানকে জেনারেলদের চালিত সরকারের অসামরিক মুখ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। বিরোধীদের মোকাবিলা করতে ইমরান খানেরও প্রয়োজন সেনা বাহিনীর কেননা তার নিজের পাকিস্তান তেহেরিক-ই-ইন্সাফ পার্টিও সেই দেশে বেশি দিনের দল নয়।

সংবাদ মাধ্যমের ওপর নিয়ন্ত্রণ এতটাই যে ২৫শে জুলাই যখন সরকারের এক বছর পূর্তি অনুষ্ঠান উদযাপনের সম্প্রচার চালানো হচ্ছে সেই সময় তাদের  বিরোধী  দলগুলির মিছিল ও বিক্ষোভের বিষয় সম্প্রচার করতে দেওয়া হয় নি। সংবাদ মাধ্যম বিরোধীতা করলেও তাদের কর্মীদের ওপর হুমকি দেওয়া হচ্ছে। ইমরান খান ভুলে যাচ্ছেন যে এই সংবাদ মাধ্যমই দীর্ঘ সময় ধরে একজন বিরোধী নেতা হিসেবে তাঁর কর্মসূচীর সম্প্রচার করে এসেছিল যা আদতে তাঁকে ২০১৮র নির্বাচনে জয় পেতে সাহায্য করেছিল। ইদানীং, শোনা যাচ্ছে সংবাদ–মাধ্যম দমনের অঙ্গ হিসেবে মিডিয়া আদালত গঠনও করা হবে।

এই প্রেক্ষাপটে, আইনের শাসনের মাধ্যমে এক নতুন পাকিস্তান গড়ে তোলার অঙ্গীকার ইমরান খানের নাগালের বাইরে চলে গিয়েছে। সরকার ও বিরোধী দলগুলির মধ্যে আগত দিনে আরও সংঘাত দেখা যেতে পারে।

[মূল রচনা- অশোক হান্ডু]