সশস্ত্র বাহিনীর আধুনিকীকরণ

For Sharing

ভারতের প্রতিবেশী দেশে গত এক দশক ধরে ধারাবাহিকভাবে বিদেশী মদতপুষ্ট সন্ত্রাসবাদী কাজকর্ম যেভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে তার প্রেক্ষিতে ভারতের সশস্ত্র বাহিনীর সক্ষমতা বাড়ানোর আশু প্রয়োজন রয়েছে। এই কাজ এত সহজ নয় কেননা ভারতকে তার নাগরিকদের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের বিষয়টিও দেখতে হবে। কিন্তু একটি রাষ্ট্রের সার্বিক উন্নয়ন সম্পূর্ণ সুরক্ষা ব্যতিরেকে অর্জন করা সম্ভব নয়। এই প্রেক্ষিতে, চলতি অর্থ বছরে প্রতিরক্ষা খাতে ৪.৩১ ট্রিলিয়ন টাকা বরাদ্দকে স্বাগত জানাতেই হয়। যদিও এই অর্থ বরাদ্দ দেশের মোট অভ্যন্তরীণ উৎপাদনের কেবলমাত্র ২.০৪ শতাংশ। প্রতিরক্ষা সরঞ্জামের ওপর  মূল শুল্ক থেকে আমদানি শুল্ক ছাড়ের সিদ্ধান্ত প্রমাণ করে যে প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রের আধুনিকীকরণকে সরকার সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিচ্ছে।

ভারতীয় সেনা বাহিনীর আধুনিকীকরণ স্পষ্টভাবে এক দীর্ঘমেয়াদী পরিপ্রেক্ষিত প্রকল্পের ভিত্তিতে  ভাবা হয়েছিল যা ২০২৭ সালের মধ্যে সম্পূর্ণ করা হবে। দেশে তৈরি প্রকল্পগুলি থেকে উৎপাদিত সামগ্রির ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে যাতে দেশে  প্রতিরক্ষা সামগ্রির উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানো সম্ভব হয়। সরকারের আগাম দৃষ্টিভঙ্গীর কারণে সময়সীমা অনুপালনের বিষয়ে সদর্থক উপায়ে প্রয়াস নেওয়া হচ্ছে। প্রতিরক্ষা উৎপাদন ক্ষেত্রে প্রথম সারির বেসরকারি কোম্পানিগুলিকেও অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে। সরকার  কৌশলগত অংশীদারিত্ব মডেল সামনে এনেছে যা ভারতীয় বেসরকারি ক্ষেত্রের কোম্পানীগুলিকে প্রতিরক্ষা উৎপাদন সংক্রান্ত বিদেশী কোম্পানীগুলির সঙ্গে ভারতে যৌথভাবে যুদ্ধ বিমান, হেলিকপ্টার, সাবমেরিন ও যুদ্ধ ট্যাঙ্ক তৈরির সুযোগ দিয়েছে। সশস্ত্র বাহিনীর যুদ্ধের সক্ষমতা বাড়াতে সরকার বেশ কয়েকটি সুদুর প্রসারী সংস্কার হাতে নিয়েছে। এই পদক্ষেপগুলিকে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে যার মধ্যে রয়েছে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম সেনাবাহিনীতে সেনার সংখ্যা কমানো ও পাশাপাশি তাদের উন্নততর ও অত্যাধুনিক যুদ্ধাস্ত্রে  সজ্জিত করা।

অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রকল্প F-INSAS (ভবিষ্যৎ পদাতিক সেনা এক ব্যবস্থাপনার মত)  হাতে নেওয়া হয়েছে সেনা জওয়ানদের অত্যাধুনিক সমরাস্ত্র ও লড়াই করার বিষয়ে আরও সক্ষম করে তুলতে। এই প্রকল্প ২০২০ সালের মধ্যে শেষ করার পরিকল্পনা রয়েছে। গত বছরে সেনাবাহিনী ক্রয় করেছিল M777হাউইটজার এবং K9বজ্র। রাশিয়ার সঙ্গে সম্প্রতি   464 T-90 ট্যাঙ্ক ক্রয়ের জন্য ১৩,৫০০ কোটি টাকার চুক্তি স্বাক্ষরিত হয় যার ফলে T-90 ট্যাঙ্কের সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়ে হবে প্রায় ২০০০। এর সঙ্গে রয়েছে T-72 এবং T-55s ট্যাঙ্ক।

ভারতীয় বিমান বাহিনীর জন্য রাফায়েল যুদ্ধ বিমান তাদের দেবে আকাশ পথে  এক ব্যাপক আত্মবিশ্বাস এবং এর ফলে শত্রুপক্ষ ভারতীয় আকাশে হস্তক্ষেপ করতে পারবে না। এই বিমানগুলি পারমাণবিক অস্ত্র বহনে সক্ষম এবং এগুলি আকাশ থেকে আকাশে এবং আকাশ থেকে স্থলে আক্রমণ হানতে সক্ষম। প্রথম রাফায়েল যুদ্ধ বিমান আগামী মাসে অর্থাৎ সেপ্টেম্বর মাসে ভারতীয় বিমান বাহিনীর কাছে চলে আসবে। এর সূচী অনুযায়ী এবং ৩৬টি রাফায়েল যুদ্ধ বিমানই আগামী দুই বছরের মধ্যে সরবরাহ করা হবে। এছাড়া আধুনিকীকরণের প্রয়োজন রয়েছে এমন পুরোনো বিমান গুলিকে প্রতিস্থাপিত করতে সুখোই-M30 এবং তেজসের নতুন বিমান চলে আসবে শীঘ্রই।  এছাড়াও, আজকের দিনে ভারতীয় বিমান বাহিনীর প্রধান যুদ্ধ বিমান MIG-21 বাইসনকেও উল্লেখযোগ্যভাবে আধুনিক করে তোলা হয়েছে যা পুরাতন MIG-21-এর তুলনায় অনেক বেশি আধুনিক।

ভারতীয় বিমান বাহিনীর বর্তমানে অনেক বেশি আধুনিকীকরণ হয়েছে এবং এর সক্ষমতাও স্পষ্ট প্রতিভাত হয় তাদের সাম্প্রতিক পাক অধীকৃত কাশ্মীরের কিছু অঞ্চলের সন্ত্রাসবাদী শিবিরে দুটি সফল সার্জিকাল স্ট্রাইকে। এছাড়াও লেজার ডেজিগনেটর পড (LDP)- যা আদতে লেজার সেন্সরের মাধ্যমে কাঙ্খিত লক্ষ্যবস্তুতে আধাত হানার ব্যবস্থাপনা, সমস্ত যুদ্ধ বিমানেই স্থাপন করা হয়েছে এবং এর ফলে বিমান হানার সক্ষমতা অনেক বেশি সঠিক ও উন্নত হয়েছে। কার্গিল যুদ্ধের সময় কেবল মিরাজ 2000 যুদ্ধ বিমানেই এই ব্যবস্থাপনা ছিল, এবং এখন জাগুয়ার, আধুনিক করা MIG-27 এবং সুখোই-30 তেও এই ব্যবস্থাপনা রয়েছে।  UAV, আকাশেই জ্বালানী ভরার ব্যবস্থাপনা যুক্ত বিমান এবং- Evacsর ( এরোমেডিকাল স্থানান্তরণ ব্যবস্থাপনা) অন্তর্ভুক্তি প্রমান করে যে ভারতীয় বিমান বাহিনী অনেক দুর এগিয়ে গিয়েছে।

সমুদ্র ক্ষেত্রেও ভারত ভালো করেই জানে এই সময়ের উদ্ভূত চ্যালেঞ্জগুলির মোকাবিলায় কার্যকরী সক্ষমতা বাড়াতে ও সমুদ্র পথের সুরক্ষা বাড়াতে পরিকাঠামো  উন্নতির প্রয়োজন রয়েছে। বর্তমানে ভারতের বাণিজ্যর ৯০ শতাংশ যা মূল্যের পেক্ষিতে ৭৭ শতাংশ তা সমুদ্রপথেই হয়ে থাকে। এছাড়া, বিরোধী প্রতিবেশীদের নৌ-বাহিনীর আধুনিকীকরণও চলছে দ্রুত গতিতে যা ভারতের জন্য অবশ্যই উদ্বেগের বিষয়। সরকার ছয়টি সাবমেরিন এবং নির্মানাধীন ৩২টি জাহাজ ছাড়াও ৫৬ টি নতুন জাহাজের অন্তর্ভুক্তির অনুমোদন দিয়েছে।

ভারতের আর্থিক ও প্রযুক্তিগত ক্ষেত্রে খ্যাতি বৃদ্ধি পাওয়ায় বিশ্বের মধ্যে ভারত এক বিশেষ স্থান দখল করেছে এবং এর ফলে একই সময়ে বিভিন্ন  প্রতিকূল পরিস্থিতির মোকাবিলায় অত্যাধুনিক সমরাস্ত্র ও সরঞ্জাম সহ সামরিক ক্ষমতাও ভারতকে বাড়িয়ে তুলতে হবে।

[মূল রচনা- উত্তম কুমার বিশ্বাস]