মার্কিন-তালিবান আলোচনা ও ভারতের ভূমিকা

For Sharing

কাতারের রাজধানী দোহায় অষ্টম মার্কিন-তালিবান আলোচনা দুই পক্ষের মধ্যে একটি শান্তি চুক্তির সম্ভাবনা জাগিয়ে সম্পন্ন হল; যা এক অত্যন্ত  ইতিবাচক ঘটনা হিসেবেই গণ্য হল। ওই চুক্তি সম্পাদিত হলে আফগানিস্তান থেকে একটি নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে মার্কিন ও NATO বাহিনীর সেনা প্রত্যাহারের প্রক্রিয়া শুরু হবে। পরিবর্তে তালিবানরা  আল-কায়দা ও ISIS’এর মত  জঙ্গি গোষ্ঠীকে  আফগানিস্তানে সন্ত্রাসবাদী তৎপরতায় মদত দেওয়া থেকে বিরত থাকবে। সম্ভাব্য চুক্তির আর একটি সংস্থান অনুযায়ী, তালিবানরা আফগান সরকারের সঙ্গে ক্ষমতা ভাগাভাগির ভিত্তিতে সে দেশের সরকার পরিচালনায় অংশগ্রহণ করবে,যার ফলে এই যুদ্ধ বিধ্বস্ত দেশে শান্তি, স্থিতিশীলতা ও সমৃদ্ধির পথ সুগম হবে।

উল্লেখ করা যেতে পারে, তালিবানরা, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনা শুরু করার উদ্দেশ্যেই ২০১১ সালে দোহায় তাদের একটি কার্যালয় স্থাপন করে। তার পর থেকে দু পক্ষের মধ্যে কয়েক দফার আলাপ আলোচনা হয়েছে, তবে তাতে ইতিবাচক কোনও ফল পাওয়া যায় নি। এর পর ২০১৪ সালে মার্কিন ও NATO বাহিনী আফগানিস্তানে তাদের জঙ্গি দমন অভিযানের মূল দায়িত্ব সে দেশেরই সেনার ওপর ন্যস্ত করার সিদ্ধান্ত নেওয়ায় দু পক্ষের মধ্যে আলোচনার সম্ভাবনা আবার জেগে ওঠে। আফগানিস্তানের  পঞ্চাশ শতাংশেরও বেশি ভূখণ্ডের ওপর তালিবানদের নিয়ন্ত্রণ থাকায়, ওই দেশের শাসন ব্যবস্থায় তালিবানদের সঙ্গে ক্ষমতা ভাগাভাগি করে নেওয়া ছাড়া স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয় বলে সকল পক্ষের মধ্যেই দৃঢ় ধারণা জন্মায়। ইতিমধ্যে মার্কিন রাষ্ট্রপতি ডোনাল্ড ট্রাম্প আফগানিস্তান থেকে তাঁর দেশের সেনা প্রত্যাহারের প্রতিশ্রুতি দেন;এবং এই প্রক্রিয়া যথাশীঘ্র বাস্তবায়িত করতে আফগান সরকার ও তালিবানদের সঙ্গে কথা বলতে রাষ্ট্রপতি ট্রাম্প জালমে খলিলজাদকে বিশেষ মার্কিন দূত হিসেবে সে দেশে পাঠান।

প্রকৃত অর্থে আফগান শান্তি প্রক্রিয়ায় সরাসরি মার্কিন-তালিবান আলোচনা ছাড়াও ওই অঞ্চলের বেশ কিছু দেশ ভূমিকা পালন করছে। চীন তালিবানদের সঙ্গে বেশ কয়েক দফার আলোচনা করেছে;ও পাকিস্তানও এতে অংশ নিয়েছে। এ ছাড়াও একাধিক ত্রিপাক্ষিক আলোচনা ব্যবস্থাপনা রয়েছে, যেমন পাকিস্তান-আফগানিস্তান-মার্কিন আলোচনা; চীন-পাকিস্তান-আফগানিস্তান আলোচনা; মস্কো-ওয়াশিংটন-পেইচিং আলোচনা ও রাশিয়া-চীন-ভারত আলোচনা। আর রয়েছে ‘হার্ট-অফ এশিয়া’ নামে পরিচিত ইস্‌তানবুল আলোচনা প্রক্রিয়া। লক্ষ্য করার বিষয় হল-আফগান শান্তি প্রক্রিয়ায় সংশ্লিষ্ট সকল দেশই সক্রিয় ভূমিকা নিতে আগ্রহী, যার ফলে স্বভাবতই এই শান্তি প্রক্রিয়ার অগ্রগতি বারে বারে বিঘ্নিত হচ্ছে; পরিস্থিতিতে জটিলতা দেখা দিচ্ছে।

মার্কিন-তালিবান আলোচনার অভিমুখ ধীরে ধীরে একটি শান্তি চুক্তির সম্ভাবনা জাগিয়ে তুললেও ভবিষ্যতের আফগানিস্তান ও সে দেশের সরকার কেমন হবে, সে ব্যাপারে উদ্বেগ থেকেই যাচ্ছে। জার্মানি ও কাতারের উদ্যোগে আয়োজিত আফগানিস্তানের রাজনৈতিক নেতা ও সে দেশের সুশীল সমাজের মধ্যে আলোচনায় তালিবানরাও অংশ নেয়। ওই আলোচনায় তারা দেশে জঙ্গিদের প্রশ্রয় না দিতে  ও অসামরিক মানুষদের লক্ষ্যবস্তু না করতে আশ্বাস দেয়। ওপর দিকে আবার তালিবানদেরই মুখ্য মধ্যস্থতাকারী শের মহম্মদ আব্বাস স্টানিকজাই তাদের পক্ষ থেকে যুদ্ধ অব্যাহত রাখা হবে বলে হুমকি দিয়েছেন। ফলে পরিস্থিতি  ঠিক কোন্‌দিকে মোড় নেবে, সে ব্যাপারে ধোঁয়াশা থেকেই গেছে।

এদিকে সংঘর্ষ দীর্ণ আফগানিস্তানের অর্থনৈতিক পুনর্গঠনে ভারত এ পর্যন্ত প্রায় তিনশো কোটি ডলারের মত বিনিয়োগ করেছে। বর্তমানে  ভারত হল আফগানিস্তানে পঞ্চম সর্ববৃহৎ আর্থিক সহায়তাদানকারি দেশ। স্বাভাবিক কারণেই সে দেশের বর্তমান ঘটনাক্রমের ভবিষ্যৎ গতিপ্রকৃতির দিকে ভারত গভীরভাবে লক্ষ্য রাখছে। আফগানিস্তানের নিরাপত্তা পরিস্থিতিতে অবনতি ঘটলে দেশটিতে আবার সোভিয়েত সেনা প্রত্যাহার পরবর্তী গৃহ যুদ্ধের মত পরিস্থিতি দেখা দিতে পারে বলে নতুন দিল্লির আশংকা রয়েছে। সে কারণেই আফগানিস্তানের  রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নির্ধারণে সে দেশের সরকারের পরিচালনাতেই, সে দেশের জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণের ভিত্তিতেই  শান্তি আলোচনা এগিয়ে নিয়ে যাবার প্রয়োজনের প্রতি ভারত সব সময়েই গুরুত্ব দিয়ে আসছে। (মূল রচনাঃ-ডঃ স্মৃতি পটনায়েক)