ভারত-রুশ কৌশলগত অংশীদারিত্ব

For Sharing

ভারত ও রাশিয়ার মধ্যে ২০তম বার্ষিক শিখর বৈঠক বিশ্ব শৃংখলার  পরিবর্তনশীল গতিশীলতায় সময়ের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ বিশেষ কৌশলগত অংশীদারিত্বের এই উজ্জ্বল নিদর্শন।

ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি সুদূর প্রাচ্যে ভ্লাদিভস্তকে পঞ্চম পূর্বাঞ্চলীয় অর্থনৈতিক মঞ্চে যোগ দিতে দুদিনের সফরে গিয়ে রাশিয়ার রাষ্ট্রপতি ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গেও বৈঠকে মিলিত হন।

অর্থনৈতিক মঞ্চে ভারত তাদের সুদূর প্রাচ্যে কাজ করার নীতি প্রকাশ করে, একে তাদের অর্থনৈতিক কূটনীতিরই অব্যাহত রূপ হিসেবে দেখা যেতে পারে। সহায় সম্পদ সম্বৃদ্ধ এই অঞ্চলের উন্নয়নের জন্য প্রধানমন্ত্রী ১ বিলিয়ন ডলার ঋণ দেবার কথা ঘোষণা করেন। এই নীতির ফলে নতুন দিল্লী এই অঞ্চলে অধিক বিনিয়োগ এবং সহযোগিতা করতে সক্ষম হবে। ভারত হীরে, কয়লা এবং সোনার খনিতে বিনিয়োগ করছে।

দুটি দেশের সম্পর্ককে প্রকৃতিগতভাবে পারস্পরিক স্বার্থ সংশ্লিষ্ট বলে বিবেচনা করা হয় এবং দুটি দেশের মধ্যে সম্ভাব্য সকল ক্ষেত্রে সহযোগিতা বর্তমান।  এছাড়া সভ্যতাগত দিক থেকে অভিন্ন মূল্যবোধ, সময়ের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ বন্ধুত্ব, পারস্পরিক বোঝাপড়া, বিশ্বাস, অভিন্ন স্বার্থ এবং উন্নয়ন ও অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির মৌলিক বিষয়গুলিতে দৃষ্টিভঙ্গীগত  অভিন্নতা আন্তর্জাতিক এবং আঞ্চলিক পর্যায়ে ভারত ও রাশিয়াকে ঘনিষ্ট হতে সহায়তা করেছে। দুই নেতার মধ্যে আলোচনার সময় সাংহাই সহযোগিতার প্রতি আলোকপাত করা হয়।

বার্ষিক শিখর বৈঠকে উভয় নেতা বাণিজ্য, প্রতিরক্ষা, মহাকাশ, জ্বালানী এবং সামুদ্রিক সংযোগের মত ক্ষেত্রগুলিতে দ্বিপাক্ষিক সহযোগিতার নতুন দিগন্তের প্রতি দৃষ্টিপাত করেন।

অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে রাষ্ট্রপতি পুতিন বার্ষিক ১৭ শতাংশ বাণিজ্য বৃদ্ধিতে সন্তোষ প্রকাশ করেন। ২০১৮তে এই পরিমাণ ১১ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। দুই নেতা অর্থনৈতিক এবং বাণিজ্যিক সহযোগিতার মজবুত ভীতকে আরো সুদৃঢ করার প্রতি অগ্রাধিকার দেন। মেক ইন্ডিয়া কর্মসূচিতে রুশ সহযোগিতা বৃদ্ধি এবং রাশিয়ায় বিনিয়োগ প্রকল্পে ভারতীয়দের অংশ গ্রহণের বিষয়েও আলোচনা করা হয়।

জ্বালানী ক্ষেত্রে বর্তমান সহযোগিতার প্রশংসা করে ভারত ও রাশিয়া ভূতাত্বিক অনুসন্ধান এবং ভারত ও রাশিয়ায় তেল ও গ্যাস ক্ষেত্রে যৌথ উদ্যোগে সহযোগিতা বৃদ্ধির অঙ্গীকার করে। তারা রাশিয়া থেকে ভারতে দীর্ঘ মেয়াদী ভিত্তিতে জ্বালানী সরবরাহ অব্যাহত রাখার  বিষয়ে একমত হয়। এর মধ্যে রয়েছে আর্কটিক অঞ্চলে উত্তর সমুদ্র পথে জ্বালনী সরবরাহ। ভারত আর্টকিট অঞ্চলে রাশিয়ার সঙ্গে সহযোগিতা বৃদ্ধিতে আগ্রহী। দু’ পক্ষ ২০১৯-২৪এর জন্য হাইড্রকার্বন ক্ষেত্রে সহযোগিতার এক রুপরেখায় স্বাক্ষর করেছে। আগামী পাঁচ বছরে জ্বালানী ক্ষেত্র নতুন উচ্চতায় পৌঁছবে বলে আশা করা যায়। পরমাণু ক্ষেত্রে, আগামী ২০ বছরে রাশিয়ার তৈরি আরো ১২টি বিদ্যুৎ ইউনিট নির্মিত হবে।

আন্তর্জাতিক উত্তর-দক্ষিণ পরিবহন করিডোর আই এন এস টি সি নিয়েও আলোচনা হয়েছে। পরিবহন প্রক্রিয়ায় ডিজিটাল প্রযুক্তি এবং উপগ্রহ নেভিগেশন সহ বৈদ্যুতিন ক্ষেত্রের প্রতি জোর দেওয়া হয়েছে। চেন্নাই এবং ভ্লাদিভস্তকের মধ্যে একটি নতুন সংযোগ পথ চালু করা হয়েছে যার ফলে অর্থনৈতিক এবং বাণিজ্যিক বিনিয়োগ বৃদ্ধি পাবে বলে মনে করা হচ্ছে।

প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে প্রযুক্তি হস্তান্তরের আওতায় রাশিয়ার সামরিক সরঞ্জামের জন্য ভারত যন্ত্রাংশ উৎপাদন শুরু করবে এবং যৌথ উদ্যোগ স্থাপন করবে।

মহাকাশ ক্ষেত্রে ভারত মনুষ্যবাহী গগনযান মিশনের জন্য ভারতীয় নভোশ্চরদের রাশিয়ায় প্রশিক্ষণের কথা ঘোষণা করেছে।

সাংস্কৃতিক ক্ষেত্র এবং জনগণের মধ্যে যোগাযোগ বৃদ্ধির জন্য মহাত্মা গান্ধীর ১৫০তম জন্ম বার্ষিকী উপলক্ষ্যে রাশিয়ায় একটি স্মারক ডাকটিকিট জারী করা হয়।

সামগ্রিকভাবে বার্ষিক শিখর বৈঠক এবং পঞ্চম পূর্বাঞ্চলীয় অর্থনৈতিক ফোরাম বিপূলভাবে সফল হয়েছে এবং  সুদূর প্রাচ্যে কাজ করার নতুন নীতি চালু করা সহ সমস্ত ক্ষেত্রে নতুন বিকাশের সম্ভাবনার পথ প্রশস্ত হয়েছে। (মূল রচনাঃ ড. ইন্দ্রাণী তালুকদার)