বিষণ্ণ শতবর্ষ

For Sharing

গ্যেটের ‘ফাউস্ট’ অপেরার মাধ্যমে দেখানো হবে। কলকাতার চৌরঙ্গী এলাকার নতুন সেই থিয়েটার হলের নাম অপেরা হাউস। অপেরার পর দোর্দন্ডপ্রতাপ কংগ্রেস নেতা সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলেন সাউথ আফ্রিকা থেকে ফেরা একটি ছোটখাটো চেহারার মানুষ। সুরেন ব্যানার্জির বক্তৃতা বিখ্যাত। তাঁর একটি লেকচারের আয়োজন হয়েছিল ওই অপেরা হাউসে।  সেই শ্যামলা অঙ্গের লোকটি একা একা শুনতে গিয়েছিলেন। বক্তৃতা তো বটেই। অপেরা হাউসের সুরুচিসম্পন্ন ইন্টেরিয়র অসামান্য লাগলো তাঁর। তিনি মুগ্ধ।  কিন্তু একটা প্রশ্ন তাঁকে বেশ চিন্তায় ফেললো এরকম সুদৃশ্য এক অডিটোরিয়ামে এলিট সোসাইটির মানুষদের সামনে দেশের গ্রামের কৃষকদের সমস্যা নিয়ে জ্বালাময়ী বক্তৃতা দিলেন বক্তারা। তাও আবার ইংরাজিতে। গ্রামের গরীব কৃষকদের এতে কী লাভ হবে?  লোকটি মৃদু স্বরে একজনকে জিজ্ঞাসাও করলেন, আচ্ছা এখানে স্বদেশি ভাষায় স্পিচ দেওয়া হয় কোথায়? তাচ্ছিল্যসহকারে তাঁর দিকে তাকিয়ে সেই ভদ্রলোক এগিয়ে গেলেন। এই ছোটখাটো লোকটির নাম মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধী। ১৯২২ সালে সেই অপেরা হাউস কিনে নিলেন গ্লোব সিনেমা কোম্পানি। নতুন নাম হল গ্লোব। প্রথম সিনেমার নাম ছিল আ স্পোর্টিং ডাবল।  বিশ্বের প্রথম সবাক সিনেমা অ মেলোডি অফ লাভ প্রথম গোটা ভারতের মধ্যে রিলিজ করে এই গ্লোবেই। আরও আশ্চর্য ঘটনা হল সেসবের  বহুকাল পর এই গ্লোব সিনেমায় প্রথম মুক্তি পেল রিচার্ড অ্যাটেনবরোর একটি সিনেমা। নাম গান্ধী। সেই গান্ধী, যিনি নিজে একদিন এই অডিটোরিয়ামেই সম্পূর্ণ অজানা আগন্তুক হিসাবে ভয়ে ভয়ে সংকোচে ঢুকেছিলেন!

১৯১৯ সালের বিল্বমঙ্গল, ১৯২০ সালের মহাভারত, ১৯২১ সালের বালিকা বধূ, ১৯২২ সালের বিষবৃক্ষ, ১৯২৩ সালের মানভঞ্জন….এরকম প্রথম নির্বাক বাংলা সিনেমা থেকে শুরু করে  বায়োস্কোপের পরীক্ষা নিরীক্ষার গবেষণাগারের নাম ছিল কর্ণওয়ালিশ সিনেমা হল।  হঠাৎ দেখা গেল কর্ণওয়ালিশ নামের কোনও হল আর নেই। এত ভালো একটা সিনেমাহল বন্ধ হয়ে গেল নাকি? ১৯৩৫ সালের ২ নভেম্বর কলকাতাবাসী দেখতে পেল এক নতুন সিনেমাহলের নাম।  সেখানে রিলিজ করছে নতুন সিনেমা। বিদ্যাসুন্দর। কোথায় রিলিজ হবে? উত্তরা নামের একটি সিনেমায়। জানা গেল সেটাই তো সেই কর্ণওয়ালিশ! নতুন নামকরণ। সেই উত্তরা। যেখানে দুটি আনইম্প্রেসিভ আড়ষ্ট অভিনয়ের তরুণ তরুণীর দেখা হয়েছিল। দেখা হওয়ার জায়গার নাম অন্নপূর্ণা বোর্ডিং হাউস। সেই উত্তরা, যে এই অচেনা তরুণ তরুণীকে ঢোকার জায়গা দিয়েছিল ১৯৫৩ সালের ২০শে ফেব্রুয়ারি বাঙালি হৃদয়ে। তাঁদের কেউ চিনতো না তখন। সিনেমার নাম  ছিল সাড়ে চুয়াত্তর!

‘স্ক্রিন কর্পোরেশন লিমিটেডের ৭৬/এ নম্বর কর্নওয়ালিশ স্ট্রিটে নূতন ছায়াচিত্রগৃহের নাম দিলাম রূপবাণী। শ্রী রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। ১২ জুলাই, ১৯৩২।’  রূপবাণী নামক একটি কবিতা লিখে সেই বছরের ১৯ ডিসেম্বর সেই নয়া প্রেক্ষাগৃহে এসে বুকলেটে লিখে দিলেন রূপবাণীর প্রতি কবির আশীর্বাদ, সার্থক হউক। তার ঠিক সাতদিন আগে ১২ ডিসেম্বর রূপবাণীতে প্রথম সিনেমা রিলিজ হয়েছিল। সিনেমার নাম ‘বেঙ্গল ১৯৮৩।’ পরিচালক ও প্রধান অভিনেতার নাম কী ছিল? প্রমথেশচন্দ্র বড়ুয়া! তার আগেই নিউ থিয়েটার্স কলকাতায় নিজেদের একটি চিত্রগৃহ চালু করে দিয়েছে। তার নাম চিত্রা।  কে উদ্বোধন করেছিলেন? সুভাষচন্দ্র বসু। প্রথম সিনেমা অলীকবাবু।

তবে পথিকৃতের কথা বলা হল না। কলকাতায় সিনেমা বিপ্লবের প্রধান পুরুষ এক পার্সি যুবক। জামশেদজী ফ্রেমজী ম্যাডান। ১৯০২ সাল থেকে তিনি বায়োস্কোপের বিশেষ শো শুরু করেন ময়দানে তাঁবু খাটিয়ে। ১৯১৭ সালের মার্চ মাসে কলকাতার রাস্তায় বিজ্ঞাপন দেখা গেল নিউ টেন্ট ময়দানে এলফিনস্টন বায়োস্কোপ। সত্যবাদী রাজা হরিশচন্দ্র। প্রধান চরিত্র? মিস সাভেরিয়া! ম্যাডানের সবথেকে বেশি নজর ছিল দর্শকদের স্বাচ্ছন্দ্য আর সুরুচিতে। তিনি চৌরঙ্গীতেই একটি বন্ধ হয়ে যাওয়া থিয়েটার হলের পুনর্জীবন দান করেন। নতুন হলের নাম ভ্যারাইটি অফ পিকচার প্যালেস। পরবর্তীকালে নাম দেওয়া হল এলিট। ১৯২৭ সালে ওয়ার্নার ব্রাদার্স একসঙ্গে দুটি সিনেমাহল তৈরি করলেন কলকাতার অভিজাততম পাড়ায়। নিউ এম্পায়ার ও লাইটহাইস। হ্যামলেট কোথায় দেখতে যেতে হত? লাইটহাউস। লরেন্স অফ অলিভিয়া কোথায় দেখতে যেতে হত? নিউ এম্পায়ার।  কোন সিনেমাহলের স্থাপত্য এতই সুন্দর যে তার স্টাইলে গহনা তৈরি হত একসময়? মেট্রো।

মিনার বিজলী. ছবিঘর নির্মাণ করেন একই ব্যক্তি। হরিপদ পাল। শিয়ালদহ ও কলেজস্ট্রিট ঘিরে সিনেমা গড়ে ওঠে জগৎ,অরুণা,পূরবী,  তসবীরমহল, প্রাচী, গ্রেস,।  চৌরঙ্গী অঞ্চলের সিনেমাহলগুলির নাম বদলের সাক্ষী থেকেছে বাঙালি। করেনথিয়াম বদলে গিয়ে হল অপেরা। কাছেই ম্যাডানই তৈরি করলেন নিউ সিনেমা। এলফিনস্টন পিকচার প্যালেস টু নাম দিলেন একটি আধুনিক প্রেক্ষাগৃহের। যার পরে নাম হল টাইগার।

ভারতীয় সিনেমার রাজধানী যে কলকাতা ছিল তা বলার অপেক্ষাই রাখে না। কিন্তু খোদ দেশের রাজধানীই যখন সরে এসেছে দিল্লিতে, সুতরাং তার সঙ্গেই যে এক টুকরো অসংখ্য সংস্কৃতিপ্রিয় মানুষও চলে যাবেন বলাই বাহুল্য। নতুন রাজধানীতে গোটা দেশ থেকে ভারতবাসী এসে হাজির হলেন। সেভাবেই ক্রমে দিল্লি ত্রিশের দশকে রবিবারের ছুটিতে প্রশ্ন করল উর্দু শায়েরি শুনতে যাবো কোথায়? মীর্জা গালিবের মুলুকে শায়েরির বাতাস কোথায় পাওয়া যাবে? পাওয়া গেল কনট প্লেসে। রাশিয়ান ব্যালে এসেছে শহরে?  কীভাবে দেখবো? কেন? কনট প্লেসে যেতে হবে। সহজ উত্তর। পৃথ্বীরাজ কাপুরের আলম আরা সিনেমা দেখার খুব ইচ্ছে। দিল্লি সোজা চলে যেত কনট প্লেসে। হ্যাঁ। দিল্লির ধর্মতলার নাম কনট প্লেস একথা আজ সবাই জানে। কলকাতার চৌরঙ্গী পাড়ার সঙ্গে সংস্কৃতি পালনের সাদৃশ্য ভারী আশ্চর্যের। কলকাতার ধাঁচেই দিল্লির এই পাড়াতেও একে একে গড়ে উঠেছিল রিগাল, রিভোলি, ওডিওন আর প্লাজা। হিন্দি নাটক থেকে জার্মান সিম্ফনি। পৃথ্বীরাজ কাপুর থেকে কে এল সায়গলরা ভেসে বেড়াতেন কখনও স্ক্রিনে কখনও মঞ্চে। একই স্থান, ভিন্ন উপস্থাপনা।

ভারতীয় সিনেমার শতবর্ষ আজ এই বছর।  যতটা সোনালী স্মৃতি এই নস্টালজিয়ার গৌরব, ততটাই মনখারাপ নিয়ে এসেছে সময়ের এক নিষ্ঠুর যবনিকা। সেই যবনিকার নাম সিঙ্গল স্ক্রিন সিনেমার বিদায়। যে ইতিহাসের তালিকা আর কাহিনীগুলির উল্লেখ শুনলাম তার সিংহভাগের পর্দা আর চিরতরে বন্ধ হয়েছে। আরও অনেক মনখারাপের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে একের পর এক  নতুন দীর্ঘশ্বাস! কখনও কলকাতা থেকে খবর এসেছে এলিট বন্ধ হল, কখনও শেষ দৃশ্য প্রদর্শিত হল দিল্লির রিগ্যালে। বাসের জানালা থেকে আর কেউ ল্যাম্পপোস্টে লাগানো পোস্টার দেখে না। স্মৃতির সিনেমা। মনখারাপের শতবর্ষ!

(রচনা – সমৃদ্ধ দত্ত)